গ্রামীণ অর্থনীতিও চাপে পড়েছে

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২০, ০৮:১১ | আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২০, ০৮:১৯

বদরুল আলম মজুমদার

করোনা মহামারির বিশ্বমন্দায় দেশের অর্থনীতি ভালো নেই। দীর্ঘদিন লকডাউন ও সরকারি ছুটি শেষে কলকারখানা ও অফিস খুললেও স্বাভাবিক হয়নি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উৎপাদন ব্যবস্থা। করোনার ভীতিতে মানুষ এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক চলাফেরায় ফিরতে পারেনি। উৎপাদন ও ব্যবসা বন্ধ থাকায় দিন দিন কর্মহীন হচ্ছে বিশাল সংখ্যক কর্মক্ষম মানুষ। আবার চাকরি না গেলেও বেসরকারি পর্যায়ে অধিকাংশ মানুষ বেতন পাচ্ছেন অর্ধেক বা তারও কম। এ অবস্থায় গত তিন চার মাসে স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দারুণভাবে। শহুরে জীবনের এমন নাকাল অবস্থায় অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন গ্রামে। দেশের অধিকাংশ বড় বড় শহর থেকে লাখ লাখ মানুষ এরই মধ্যে গ্রামের পথে হাঁটছেন। উদ্দেশ্য, জীবন-জীবিকা নির্বাহে গ্রামেই কিছু একটা করবেন।

অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হয় যাদের টাকায়, সেই প্রবাসী শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারিয়ে বাধ্য হয়েই ফিরছেন গ্রামে। আবার বৈশ্বিক মন্দায় বিদেশে অবস্থানকারী গ্রামের অর্থনীতির প্রাণ প্রবাসীর আয়ও কমেছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির অক্সিজেন খ্যাত এই খাতটিও করোনায় মন্দায় আক্রান্ত। গ্রামীণ কৃষিপণ্যর হাতবদলও কমে আসছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে গ্রামাঞ্চলে অর্থপ্রবাহ কমার পাশাপাশি বাড়ছে বেকারত্বের বোঝা। সব মিলিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। এরপরই রয়েছে প্রবাসী আয়। যার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় অর্ধেক মানুষ। প্রবাসী আয় বাড়লে এবং ফসলের ভালো উৎপাদন হলে অর্থপ্রবাহ বাড়ে। চাঙ্গা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। কিন্তু করোনায় চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রামাঞ্চলের কৃষক থেকে শুরু করে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। দীর্ঘদিন উপার্জন বন্ধ থাকায় তাদের সঞ্চিত অর্থ কমে আসছে। এছাড়া গ্রামীণ জনপদে মানুষের অর্থের প্রধান উৎস ধান ও চাল বিক্রি। এই টাকায় বেশিরভাগ চাহিদা পূরণ হয় তাদের। সেই ধান ও চাল কেনায় সরকারি কার্যক্রমে ধীরগতি বিরাজ করছে। ফলে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে গ্রামাঞ্চলে। আর যারা কৃষির পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসা করতেন তাদের হাতেও পুঁজি নেই। যার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু হলেও সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে জড়িত মানুষের অংশগ্রহণ কমে গেছে। অর্থ সরবরাহ কম থাকায় গ্রামের বাজার-গুলোতে বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। এছাড়া করোনা মহামারির কারণে প্রবাসী শ্রমিকরা কর্মসংস্থান হারিয়ে দেশে ফিরছেন অনেকে। সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে কর্মসংস্থান হারিয়ে ঘরেফেরা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।

এর বাইরেও নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন সাধারণ কৃষক। সরকার ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখলেও এর সুফল পান না তারা। দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে এক সময় হতাশ হয়ে পড়েন অধিকাংশ কৃষক। এই কারণেই করোনাকালে কৃষকের জন্য দেওয়া ভর্তুকি এবং ঋণ সহায়তা যাতে তারা সময়মতো পান তা নিশ্চিত করার কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) জরিপ বলছে, করোনার কারণে দেশের ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে অস্থায়ী কিংবা খন্ডকালীন কর্মসংস্থানের সঙ্গে নিয়োজিত নাগরিকরা এই ঝুঁকিতে পড়েছেন। তবে ২০১৬-১৭ শ্রমশক্তি জরিপের উপাত্ত পর্যালোচনা করে এ প্রাক্কলন করা হয়েছে। বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিলে কর্ম হারানোর ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকের সংখ্যা আরো বাড়বে। এসব চাকরি হারানো মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছেন। এতে গ্রামে কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে। এর আগে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের জরিপে করোনার কারণে দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ দরিদ্র হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তাই শহরের মতো গ্রামেও কর্মহীন লোকের সংখ্যা বাড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আমরা সিপিডির পক্ষ থেকে বলেছি, সরকারের ধান ও চাল কেনা কার্যক্রম উন্মুক্ত স্থানে করতে হবে। যাতে কৃষকদের শহরে এসে ধান বিক্রির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে না হয়। ধান কেনার এই প্রক্রিয়া থেকেও সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। ধান কেনার জন্য কৃষকের কাছে যেতে হবে। সেই সঙ্গে ধান না কিনলে চাল কেনা যাবে না এই ঘোষণা দিতে হবে। তাতে ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে, কৃষকও লাভবান হবেন।

এই গবেষক আরো বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড চালু হওয়ার পর সাপ্লাই চেইনে কিছুটা সমস্যা হতে পারে। আগে যে পরিমাণে মানুষ এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাদের সংখ্যা কমছে। কারণ তাদের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই। প্রস্তাবিত বাজেটে গ্রামীণ জনপদের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার একটি ঋণ তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। এই ঋণ সুবিধা কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। গ্রামে সাধারণত সিজনাল ফসল উৎপাদন হয়। তাই সঠিক সময়ে এই ঋণ সুবিধা কৃষকের কাছে না পৌঁছালে কোনো লাভ হবে না।

অর্থনীতিবিদরা বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি খাতে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গ্রামের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার ঋণ তহবিল তৈরিরও ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এসব ভর্তুকি ও ঋণের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে এই করোনা সংকটে কৃষকের দুর্দশা অনেকাংশে লাঘব হবে। এছাড়া কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা প্রবাসীদের জন্য সরকার ঘোষিত ঋণ সহায়তা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে কিছুটা গতি ফিরে আসতে পারে।

গ্রামীন অর্থনীতি চাঙ্গা করতে কিছু প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরেছেন দেশের শিল্প খাতের প্রতিনিধিত্বকারী বিসিআইয়ের সভাপতি আনোয়ারুল আলম চৌধুরী পারভেজ। সম্প্রতি বার্জেট পরবর্তী এক আলোচনায় তিনি বলেন, মন্দায় শহরের অর্থনীতি খুব জলদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তাই আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর জোর দিতে হবে। শক্তিশালী কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাই পারে দেশের অর্থনৈতিক ভিতকে শক্ত করতে। করোনা পরিস্থিতির কারণে অনেকে এখন শহর থেকে গ্রামে চলে আসছেন। এ অবস্থায় গ্রামীণ বেকারত্ব দূরীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন বেশি প্রয়োজন। সেদিকে নজর দিয়ে কৃষি ও কুটির শিল্পনির্ভর গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সক্রিয় করার লক্ষ্যে বিশেষ স্কিম নেওয়া যেতে পারে।

আর্থিক প্রণোদনাসহ করোনা স্বাস্থ্যঝুঁকির সময় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে প্রণোদনা অনেক বেশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে রক্ত সঞ্চালন করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোভিড ১৯-এর প্রভাবে বেকারত্বের হার আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গ্রামীণ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বিশেষ নজর দিতে হবে।

পিডিএসও/হেলাল