অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে বড় ভরসা মেগা প্রকল্প

প্রকাশ : ০৩ জুন ২০২০, ০৮:৩২ | আপডেট : ০৩ জুন ২০২০, ০৮:৪৭

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রণোদনায় যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ, রাজস্ব আদায়েও থেকে যাচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতি। এ অবস্থায় যোগাযোগ অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পে অর্থায়নে তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির মোড় ঘোরাতে বড় ভূমিকা রাখবে মেগা প্রকল্প। যদিও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলছে, বাজেটে অন্য প্রকল্পে কাটছাঁট করে মেগা প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করা হবে। করোনাভাইরাসের কারণে চীন থেকে কারখানা সরিয়ে নিচ্ছে সনি, টয়োটাসহ বিশ্বের নামিদামি ব্র্যান্ড। করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে এই সুযোগ নিতে চায় বাংলাদেশ।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছে সরকার। চলছে পদ্মা সেতু, বঙ্গবন্ধু রেলসেতু ও মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ। এসব প্রকল্পে অন্য বছর পর্যাপ্ত অর্থছাড় করলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। করোনা সংকটে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। ফলে চলমান মেগা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দে হতে পারে কাটছাঁট।

অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম রায়হান বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মেগা প্রকল্পগুলোকে খুব দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। অথবা আমরা অপেক্ষাও করতে পারি কিছু প্রকল্প পরে শেষ করা যায় কিনা। যদিও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বলছে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে অর্থায়নে সংকট হবে না।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, কাউকে কমানো হবে না; এদের অগ্রাধিকার যেমন আগেও ছিল, এখনো আছে। চাহিদার চেয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বেশি থাকায় ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র অলস পড়ে আছে। যাতে গেল অর্থবছরে ৯ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে সরকার।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দ্রুত মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা গেলে বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি গতি পাবে অর্থনীতি।

এদিকে সাতটি মেগা প্রকল্পকে গুরুত্ব দিয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) খসড়া চূড়ান্ত করছে পরিকল্পনা কমিশন। নতুন এডিপির আকার ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা ও বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৭০ হাজার ৫০১ কোটি ৭২ লাখ টাকা খরচ করা হবে। চলতি ২০১৯০-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির তুলনায় ১২ হাজার ২২৪ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে নতুন এডিপিতে। সেই হিসাবে বরাদ্দ বেড়েছে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ।

গত ১২ মে কমিশনের বর্ধিত সভায় নতুন এই এডিপির খসড়া উত্থাপন করা হয়। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সম্মেলন কক্ষে বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। সাতটি মেগা প্রকল্পে ৩৪ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে উন্নয়ন বাজেটে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপির খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। তবে আবারো বলছি, এটা খসড়া। প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্তভাবে অনুমোদন করবেন। সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই উন্নয়ন বাজেটের খসড়া অনুমোদন করা হয়েছে। নতুন এডিপিতে ৬ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আমরা সাতটি মেগা প্রকল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের চেহারা বদলে যাবে।

করোনাভাইরাসের প্রভাবে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপিতে কমছে উন্নয়ন প্রকল্প। বরাদ্দসহ অনুমোদিত প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে ১ হাজার ৫৮৮টি (স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ছাড়া)। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে এর পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৪৪টি। ফলে নতুন অর্থবছরে কমছে ১৫৬টি উন্নয়ন প্রকল্প।

উন্নয়ন বাজেটে মেগা প্রকল্পের মধ্যে সর্বোচ্চ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ১৫ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সর্বনিম্ন পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, নতুন এডিপিতে ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাবে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ প্রকল্প।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে এগিয়ে চলেছে দক্ষিণবঙ্গের স্বপ্নের প্রকল্প পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ। পায়রা বন্দর বাস্তবায়িত হলে বদলে যাবে এখানকার চিত্র। স্বল্প পরিসরে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম চালু করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। এর মধ্যে অন্যতম চ্যালেঞ্জ টার্মিনাল নির্মাণ।

টার্মিনালটি হবে ৬০০ মিটার দীর্ঘ। প্রথমে সমুদ্র পথে পাথর ও কয়লা আসবে। একটি বিশাল জাহাজের মালামাল খালাসের মতো অবকাঠামোগত সব সুবিধা থাকবে টার্মিনালে।

করোনা সংকটের মধ্যেই চলমান পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ। দেশি-বিদেশি প্রকৌশলীদের চেষ্টায় মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে সেতুর ১৯ ও ২০ নম্বর পিলারের ওপর ২৯তম স্প্যানটি স্থায়ীভাবে বসানো হয়েছে। ফলে দৃশ্যমান হয়েছে সেতুর ৪ হাজার ৩৫০ মিটার।

২৮তম স্প্যান বসানোর ২৩ দিনের মাথায় বসানো হলো ২৯তম স্প্যানটি। পদ্মা সেতুতে স্প্যান বসানো বাকি এখন ১২টি। সেতুর কাজ সামনে আরো এগিয়ে নিতে এই প্রকল্পে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

মেট্রোরেল-৬ প্রকল্পের অগ্রগতি ভালো ছিল। তবে করোনা প্রকল্পের গতিরোধ করেছে। এরপর সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন বর্ষ ২০২১ সালের বিজয় দিবসে বাংলাদেশের প্রথম উড়াল মেট্রোরেলের সম্পূর্ণ অংশ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই জন্য নতুন অর্থবছরে ৪ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা সেতুর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে পদ্মা সেতু রেল লিংক প্রকল্প। প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

রাজধানীর কমলাপুর থেকে গেন্ডারিয়া-কেরানীগঞ্জ-শ্রীনগর থেকে মাওয়ায় পদ্মা সেতু হয়ে ফরিদপুরের ভাঙা থেকে নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। জানুয়ারি ২০১৬ সালে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, শেষ হবে ২০২৪ সালের জুনে। আগের পরিকল্পনায় কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২২ সালের ৩০ জুন। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদার চীনের চায়না রেলওয়ে গ্রুপ। প্রকল্পে কাজ এগিয়ে নিতে নতুন অর্থবছরে ৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে নির্মাণাধীন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এই কেন্দ্র থেকে। ২০২৪ সালে এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। ২০১৫ সালের আগস্টে মাতারবাড়ীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা এই প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকা দেবে। বাকি টাকা দেবে সরকার। মহেশখালীর মাতারবাড়ী ও ঢালঘাটা ইউনিয়নের ১ হাজার ৪১৪ একর জমিতে হচ্ছে এই বিদ্যুৎ প্রকল্প। প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে নতুন এডিপিতে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল