ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা পদ্ধতি অটোমেশন হচ্ছে

প্রকাশ : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১০ | আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ১৪:২০

গাজী শাহনেওয়াজ

ভূমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদান পদ্ধতিকে অটোমেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে ‘ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন’ প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে (২০২০-২৪ সাল) সব কার্যক্রম শেষে এটি পুরোপুরি চালু করা হবে।

প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৫২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। আইন ও বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে নিবন্ধন অধিদফতর বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের কারিগরি সহায়তায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে। এতে ১৭ ধাপে আমূল পরিবর্তন আসবে, যা ভূমি ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের অংশ। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন কার্যক্রম শুরু হলে সম্পত্তির ভাগ নিয়ে যে হানাহানি ও খুনের ঘটনা ঘটছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে। কারণ, দেশের গ্রামাঞ্চলে মারামারি, হানাহানি ও মামলা-মোকদ্দমার সূত্রপাত হয় অধিকাংশই জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধে। এ থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হতে পারে ভূমি ব্যবস্থাপনার অটোমেশন। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হবে।

এদিকে, ইতোমধ্যে অনলাইনে খতিয়ান সরবরাহ, ই-নামজারি ও ই-সেটেলমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিজিটাল ল্যান্ড ডেটা ব্যাংক ও ল্যান্ড জোনিং কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়েছে। এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। ভূমি ব্যবহারে আধুনিকায়নের জন্য ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভূমি জরিপ কার্যক্রমটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিষয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ ও ডিজিটালাইজেশন করতে সময় লেগেছে ২০-২৫ বছর। ২০২১ সালের মধ্যে দেশে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদফতরের ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে ভূমি তথ্য ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন এ সময় সম্পন্ন করা জটিল। কারণ ভূমি তথ্য ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজেশনের চূড়ান্ত ও পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার বিষয়টি একাধিক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এর অংশ হচ্ছে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প। এই প্রকল্পের প্রধান কাজ হবে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ১৭টি ধাপে সংস্কার আনা। সংস্কারগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টার এবং নেটওয়ার্ক কেন্দ্র স্থাপন, প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের জন্য ৪৯৬টি মাইক্রো ডেটা সেন্টার স্থাপন ও জেলা ডেটা সেন্টারের সঙ্গে আন্তসংযোগ স্থাপন, প্রতিটি জেলায় একটি করে ডেটা সেন্টার, এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার উন্নয়ন, নিবন্ধন অধিদফতর এবং এই সংশ্লিষ্ট সব অফিসের জন্য ভার্চ্যুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) স্থাপন, তহশিলদার; দলিল লেখক ও নকলনবিশদের প্রশিক্ষণ প্রদান, বায়োমেট্রিক হাজিরা সিস্টেম স্থাপন এবং রেকড রুম স্বয়ংক্রিয়করণ এবং পুরোনো রেকর্ডগুলো ডিজিটাইজ করা।

এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবদুল মতিন খসরু বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল করার বিষযটি বর্তমান সরকারের একটি পুরোনো অঙ্গীকার। তবে, ভূমি ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন কার্যক্রম চালু করতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী ২০২৪ সালের মধ্যে এটার সব কার্যক্রম শেষ করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন হলে সাধরণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে বলে জানান তিনি।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, দেশে ফৌজদারি মামলার ৮০ শতাংশেরও বেশি মামলার সঙ্গে জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ দায়ী। বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে মারামারি, হানাহানির পেছনের অন্যতম কারণ জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হচ্ছে জমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন।

সূত্র জানিয়েছে, এরই মধ্যে অনলাইনে জমির খতিয়ান সরবরাহ, ই-নামজারি ও ই-সেটেলমেন্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ল্যান্ড ডেটা ব্যাংক ও ল্যান্ড জোনিংয়ের কার্যক্রমও হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে তা পর্যাপ্তসংখ্যক জনসাধারণ এ সুবিধা পাচ্ছেন না। মাঠপর্যায়ের জনসাধারণের কাছে এ সুবিধা পৌঁছে দিতে হলে এ খাতের বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এ প্রসঙ্গে বলেন, এরই মধ্যে অনলাইনে জমির খতিয়ান সরবরাহ, ই-নামজারি ও ই-সেটেলমেন্ট কার্যক্রম, ডিজিটাল ল্যান্ড ডেটা ব্যাংক ও ল্যান্ড জোনিংয়ের কার্যক্রম জোরদার করতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে নতুন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে। অর্থমন্ত্রী বলেন, জমি ব্যবহার-সংক্রান্ত সেবা আধুনিকায়নের জন্য ডিজিটাল কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জমি-সংক্রান্ত সেবা সহজ করতে সারা দেশের জমি ব্যবস্থাপনা ও সেবা প্রদান পদ্ধতিকে অটোমেশনের আওতায় আনাতেই ডিজিটাল জমি ব্যবস্থাপনা সরকারের অন্যতম উদ্দেশ্য, যোগ করেন অর্থমন্ত্রী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভূমি অধিদফতরের সদর দফতর, খতিয়ান ও ম্যাপ প্রিন্টিং প্রেস, কেন্দ্রীয় রেকর্ড ব্যবস্থাপনা (ম্যাপ ও খতিয়ান) কার্যালয়ে পর্যাপ্তসংখ্যক কম্পিউটার, স্ক্যানার, ল্যাপটপ সরবরাহসহ ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। অধিদফতরের হিসাব শাখা ও লাইব্রেরি অটোমেশন করা হয়েছে। কম্পিউটারের মাধ্যমে কয়েক মিনিটের মধ্যে মৌজা ম্যাপ এবং স্ক্যান করা প্রিন্ট কপি সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে। অধিদফতরের ওয়েব পোর্টাল চালু করা হয়েছে। অধিদফতরে ওয়াই-ফাই চালু করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত ২০ হাজার মৌজার এক কোটিরও অধিক স্বত্বলিপি ডেটাবেইসে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ১ লাখ ১৫ হাজার মৌজা ম্যাপ স্ক্যানকরত পিডিএফ রূপে সার্ভারে সংরক্ষণসহ ডিজিটাল ব্যবহার চালু করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

পিডিএসও/হেলাল