২৪ ঘাট ইজারায় ৩ সংস্থার দ্বন্দ্ব চরমে

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৯, ০৯:৪৭

গাজী শাহনেওয়াজ

দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ২৪টি ঘাট ইজারা নিয়ে সরকারি সংস্থাগুলোর দ্বন্দ্ব চরমে উঠেছে। সরকারি ঘাট ইজারার নেপথ্যে রয়েছে মোটা অংকের অর্থ লেনদেনের ঘটনা। তাই কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। দীর্ঘকালের চাপা দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। দ্বন্দ্বরত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার মধ্যে রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ), সড়ক ও যোগাযোগ বিভাগের আওতাধীন সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা ও পৌরসভা।

বিআইডব্লিউটিএ দাবি করেছে, তারা দেশের বিভিন্ন নদীবন্দরসহ প্রায় চার শতাধিক লঞ্চঘাট-ল্যান্ডিং স্টেশন উন্নয়ন করেছে। তাই ঘাট ইজারায় অন্যদের হস্তক্ষেপ এখতিয়ার-বহির্ভূত। তাদের যুক্তি, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নৌপথের নাব্য উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষণ, নৌ-সহায়ক যন্ত্রপাতি ও মাকিং সামগ্রী স্থাপনের মাধ্যমে নৌচলাচলের সহায়তা প্রদান, পাইলজেট সার্ভিস পন্টুন স্থাপনসহ জেটির নির্মাণ, লঞ্চঘাটে যাত্রী ছাউনি তৈরি ও পন্টুনের উভয় পাশে ৫০০ গজ তীরভূমি নির্মাণের কাজও করে থাকে সংস্থাটি। তাই ইজারা দেওয়া ও রাজস্ব আদায়ের এখতিয়ার তাদের। তবে অন্যপক্ষ তা মানতে নারাজ। ফলে স্টেশনের ইজারা ও শুল্ক আদায়ে নিয়ে শুরু হয়েছে তিন পক্ষের রশি টানাটানি। এ কারণে সরকার বড় অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান কমোডর মাহবুব উল ইসলাম বলেন, সারা দেশের নদী ও বন্দরের ঘাটগুলোতে ইজারা প্রদান নিয়ে সরকারের তিন সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে প্রশাসনিক জটিলতা কাটছে না। এবারের ডিসি সম্মেলনে জেলার নির্বাহীদের এ সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু ও যৌক্তিক সমাধানে আসতে চেষ্টা করা হচ্ছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে বিরোধ নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছি। এরই মধ্যে চিলমারী নদীবন্দরের লঞ্চঘাটটি বিরোধ মীমাংসা শেষে যৌথভাবে জরিপ কাজ শুরু হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র তথ্য মতে, গত কয়েক বছর ধরে কয়েকটি ল্যান্ডিং স্টেশনের ইজারা ও শুল্ক আদায় নিয়ে স্থানীয় বিভাগের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বিরোধ চলছে। এসব বিআইডব্লিউটিএ’র লঞ্চঘাট এবং স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য সংস্থা খেয়াঘাট ইজারা প্রদানের ফলে দ্বৈত প্রশাসনিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছে। ফলে মাঠ পর্যায়ে বিরোধপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান। কয়েকটি স্থানে অনাকাক্সিক্ষত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। টিএ বলছে, এসব বিরোধপূর্ণ ঘাটের কোনো স্থানেই যাত্রী সুবিধার্থে স্থানীয় সরকার কর্তৃক নির্মিত কোনো স্থাপনা নেই। তবুও অন্যারা আর্থিক বিষয়টি জড়িত থাকার কারণে নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করছে। অথচ দি পোর্ট অব অ্যাক্ট-১৯০৮ অনুসারে সরকার ১৯৬০ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ঢাকা নদীবন্দর ঘোষণা করে সীমানা নির্ধারণসহ বিআইডব্লিউটিএকে নদীবন্দরের সংরক্ষক নিযুক্ত করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৪ সালে নদী বন্দরের সীমানা বর্ধিতকরণ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাগলা-পানগাঁও ফেরিঘাটটি আগে জেলা পরিষদ, নারায়ণগঞ্জ কর্তৃক ইজারা প্রদান করা হতো। কিন্তু ২০০৪ সালে ঢাকা নদীবন্দরের সীমানা বর্ধিতকরণ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করার মাধ্যমে বিআইডব্লিউটিএ ঘাটটি নিয়ন্ত্রণে নেয়। তখন থেকে সংস্থাটি ঘাট ইজারা দেওয়া শুরু করে। এর পাশাপাশি জোর করে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ইজারা দেওয়া অব্যাহত রাখে। এ নিয়ে দ্বৈত প্রশাসনিক জটিলতা ও মামলা-পাল্টামামলা শুরু হয়। যুক্তিতর্ক ও শুনানির পর মামলার রায় বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষে আসে। সেই থেকে টানা তিন বছর এককভাবে ইজারা প্রদান করে এ সংস্থা। তবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে টিএ ইজারা প্রদানের দরপত্র আহ্বান করলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ তা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করলে পুরোনো বিরোধ নতুন করে ফিরে আসে। একইভাবে খোলামোড়া কামরাঙ্গীরচর খেয়াঘাট ঢাকা নদীবন্দরের বর্ধিত সীমানাভুক্ত হলেও জেলা পরিষদ এই ঘাটতিতে ইজারা প্রদান থেকে বিরত থাকেনি। বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক তাগিদও আমলে নেয়নি। ফলে সংস্থাটি এ ঘাটটিও ইজারা প্রদান করতে পারছে না। এমনকি সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারছে না। একই চিত্র, ঝাউচর-কামরাঙ্গীর খেয়াঘাট, বসিলা-ওয়াসপুর ও শ্যামলাসী-কলাতিয়াপাড়া ফেরিঘাটটির। বিআইডব্লিউটিএ’র অনুরোধ উপেক্ষা করে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ জোর করে ইজারা দিচ্ছে।

আর মিরকাদিম নদীবন্দরের কাঠপট্টি-কদমতলী-চরসন্তোষপুর আন্তঃজেলা খেয়াঘাটের ক্ষেত্রেও হুবহু ঘটনা ঘটেছে। এই খেয়াঘাটটির উত্তরপাড় মুন্সীগঞ্জ জেলায় এবং দক্ষিণপাড় নারায়ণগঞ্জ জেলার সীমানায় অবস্থিত। প্রতিদিন ইঞ্জিনচালিত নৌকার মাধ্যমে খেয়াঘাটটি দিয়ে উভয়পাড়ে কয়েক হাজার যাত্রী পারাপার হয়ে থাকেন। ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের দফতর থেকে এ ঘাটটির ইজারা দেওয়া হচ্ছে। বৈধ কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ এখানে দর্শকের ভূমিকায়। একই চিত্র চরকুমারী রিকাববাজার ইউপিসংলগ্ন আন্তঃজেলা খেয়াঘাটের।

নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরের কিশোরগঞ্জের চামড়া (চামটা) লঞ্চঘাটটি ১৯৮৮ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত বিআইডব্লিউটিএ’র নিয়ন্ত্রণে কার্যক্রম পরিচালিত হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর আরডি ২১ প্রকল্পের মাধ্যমে ওই ঘাটে বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণের জন্য একতরফা বিআইডব্লিউটিএ’র লিজ বাতিল করেন কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক। পুনরায় ঘাটটি ফেরত পেতে দেন-দরবার চালাতে থাকে সংস্থাটি। সর্বশেষ ২০১৪ সালে জেলা প্রশাসককে পত্র দিলেও চার বছরেও পত্রের জবাব পায়নি বিআইডব্লিউটিএ। ফলে অনিষ্পন্ন রয়েছে এ ঘাটের বিরোধ।

আর খুলনা নদীবন্দরের বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালিত ডাবঘাট ফেরিঘাট (নড়াইল কাছারিঘাট)। ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে ইজারা দিয়ে আসে সংস্থাটি। হঠাৎ গত ২০১০ সালে খুলনা সিটি করপোরেশন এ ঘাটের ইজারা দেওয়া শুরু করলে বিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। দুই সংস্থার দ্বন্দ্বের কারণে বর্তমানে এ ঘাটটির ইজারা বন্ধ রয়েছে। টিএ বলছে, নদীবন্দর সীমানায় সিটি করপোরেশনের এরূপ ইজারা কার্যক্রম পরিচালনা করা এখতিয়ার বহির্ভূত বিধায় তা বন্ধ করা প্রয়োজন। এছাড়া রূপসা ফেরিঘাট, কাস্টমসঘাট, জেলখানা, কালীবাড়ি ও মহেশ্বরপাশা-দৌলতপুর ফেরিঘাট। এই পাঁচটি ঘাট ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টিএর অধীন থাকাবস্থায় ১৯৯১ সালে জেলা পরিষদ খুলনা এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে ইজার প্রদানে বিজ্ঞপ্তি প্রচার করে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা প্রশাসন কর্তৃপক্ষ একসরা লঞ্চঘাটটি ইজারা দিত। কিন্তু সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হকের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিএ ২০১৪ সালে ১ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি টার্মিনাল পন্টুনসহ জেটি স্থাপন করে ইজারা দেওয়া শুরু করে। বিআইডব্লিউটিএ’র পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনও তাদের ইজারা কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে সরকারের দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে বিরোধ বাধে। এখনো অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে এ ঘাট। ফলে প্রতি বছর বড় ধরনের রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। এ ঘাট বিষয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হলে পন্টুন সরিয়ে আনার হুমকি দিয়েছে টিএ কর্তৃপক্ষ। দুই পক্ষের দ্বন্দ্বের কারণে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

শুধু ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, চাঁদপুর, খুলনা ও সাতক্ষীরা নয়, সারা দেশের নদী-ঘাটগুলোর চিত্র একই। এর মধ্যে বিভাগীয় কমিশন কার্যালয়, চট্টগ্রামের ইলিশা লঞ্চঘাট, চাঁদপুর পৌরসভার নতুনবাজার গুদারাঘাট, ৫নং ফেরিঘাট, কয়লাঘাট ও চৌধুরীঘাট, শরীয়তপুরের মঙ্গলমাঝি-মাঝিকান্দি-পূর্বনাওডোবা লঞ্চঘাট এবং গাইবান্ধার বালাসী ঘাট এ তালিকায় রয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল