অর্থ পাচার রোধে সরকার কঠোর অবস্থানে

গ্রাহক নির্বাচনে ব্যাংককে সতর্ক থাকার নির্দেশ

প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০১৯, ১২:২৪

শাহজাহান সাজু

দেশ থেকে অর্থ পাচার প্রতিরোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় অর্থ পাচার-সংক্রান্ত অপরাধের তদন্ত দ্রুত শেষ করে মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে ভুয়া এলসি খুলে পণ্য আমদানি না করেই টাকা পাচারের ঘটনা বন্ধেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। গ্রাহক নির্বাচন ও গ্রাহকের ব্যবসার ধরন নির্বাচনে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গ্রাহক নির্বাচন ও গ্রাহকের ব্যবসার ধরন সম্পর্কে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সতর্ক না হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির ২৩তম বৈঠক সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, জাতীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব আসাদুল ইসলাম, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক, অর্থ বিভাগের সচিব আবদুর রউফ তালুকদার প্রমুখ।

বৈঠকে বলা হয়, টাকা পাচারের অন্যতম একটি চ্যানেল হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। এলসি খোলার মাধ্যমে তা করা হয়। তবে অর্থ পাচার প্রতিরোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে ব্যাংকগুলো। বিশেষ করে গ্রাহক নির্বাচন ও গ্রাহকের ব্যবসার ধরন নির্বাচনে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাচার সবচেয়ে বেশি হয় ভুয়া এলসি খোলার মধ্য দিয়ে। এমনো দেখা যায়, ভুয়া এলসি খুলে পণ্য আমদানি না করেই পুরো টাকা বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে পণ্য জাহাজীকরণের ভুয়া কাগজপত্রও তৈরি করা হয়। একটি সিন্ডিকেট ব্যাংকের এলসির মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কাজ করে আসছে। তাই এসব বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তা ছাড়া ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভিত্তিতে মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায় জাতীয় সমন্বয় কমিটির সভায়। কারণ এই কৌশলে দীর্ঘদিন ধরে অর্থ পাচার হচ্ছে।

জানা যায়, পণ্যভিত্তিক বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ পাচার বন্ধ করতে চলতি জুলাই থেকে সব সমুদ্র ও স্থলবন্দরে স্ক্যানার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওই বৈঠকে। এটি স্থাপনের পর আমদানি-রফতানিকৃত পণ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। যাতে কেউ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে পণ্য বাণিজ্যের মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করতে না পারে। পাশাপাশি পণ্যের মূল্য যাচাই-বাছাইয়ে এনবিআরের তত্ত্বাবধানে পৃথক একটি আধুনিক ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীনে ‘স্পেশাল ফাংশনাল ইউনিট’ গঠন করার লক্ষ্যে বিদ্যমান আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনয়ন করা হয়েছে। এর ফলে যাত্রীসেবা ও বাণিজ্য সুবিধা বাড়বে এবং রাজস্ব ফাঁকি হ্রাস পাবে।’

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি বলেছেন, দুই পন্থায় অর্থ পাচার হয়। তার মধ্যে একটি হলো ব্যাংক ব্যবস্থা, অন্যটি আমদানি-রফতানির আড়ালে। এর বাইরে বড় আকারে অর্থ পাচার হয় না। এখন এগুলো বন্ধ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বন্দরগুলোয় স্ক্যানার মেশিন বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি ওভার প্রাইসিং আর আন্ডার প্রাইসিং রোধে পিএসআইয়ের আদলে এনবিআরে একটি সেল খোলা হবে। এতে দেশ থেকে টাকা পাচার কমে আসবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই ইউনিট ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় ঢুকে পণ্যের দাম জানবে। এরপর ইউনিট থেকে পণ্যের মূল্য সম্পর্কে রিপোর্ট দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, বৈঠকে বিদেশিকর্মীদের দেশ থেকে টাকা পাঠানোর বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে ট্রাভেল ভিসা নিয়ে অনেক বিদেশিকর্মী দেশে প্রবেশ করছে। পরবর্তী সময়ে ভিসার ধরন (ই-ভিসা) পরিবর্তন করে উচ্চ বেতনে চাকরি করছেন। তাদের কাছ থেকে যথাসময়ে আয়কর আদায় করা যাচ্ছে না। ওই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বৈঠকে এ বিষয়ে নজরদারির আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশের এজেন্সিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এছাড়া বৈঠকে জাহাজভাড়া ও পরিশোধের ক্ষেত্রে ফ্লাগ ভ্যাসেল অ্যাক্ট ও অন্য বিধি-বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি-না তা মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এনবিআরকে।

জানা যায়, দেশ থেকে কী পরিমাণ টাকা পাচার হয়, সেই হিসাব সরকারিভাবে না মিললেও যুক্তরাষ্ট্রের জিএফআইয়ের প্রতিবেদন বলছে, এর পরিমাণ বছরে অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকা। দেশ থেকে এই টাকা চলে যাচ্ছে চার প্রক্রিয়ায়। এগুলো হচ্ছে ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং, হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এর মধ্যে টাকা পাচারের সবচেয়ে সহজ নিরাপদ ও বড় মাধ্যম হচ্ছে ওভার ইনভয়েসিং। জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে চার প্রক্রিয়ায় ৫৯০ কোটি ডলার (দেশীয় মুদ্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। সর্বশেষ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দেশের চলতি বছরের (২০১৮-১৯) জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। টাকা পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম।

পিডিএসও/হেলাল