এবারও কি হাট ইজারা সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে!

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০১৯, ১০:২৫

হাসান ইমন

কয়েক বছর ধরে সিদ্ধান্ত নিয়েও সব হাটের ইজারা দিতে পারেনি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। প্রতি বছরই বাদ পড়ছে কিছু কিছু হাটের ইজারা। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১টি, ২০১৭ সালে ৭টি ও ২০১৮ সালে ৯টি হাটের ইজারা দিতে পারেনি সংস্থাটি। প্রতি বছরই বাড়ছে বাদ পড়া হাট ইজারার সংখ্যা। ফলে প্রতি বছরই কমছে বৈধ হাটের সংখ্যা। এসবের পেছনে রাজনীতির ছত্রছায়া ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

জানা যায়, ২০১৬ সালে ১২টি অস্থায়ী পশুর হাটের দরপত্র আহ্বান করে ডিএসসিসি। এর মধ্যে তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করে ১১টি হাটের ইজারা দেয় সংস্থাটি। বাকি একটি দেলোয়ার হোসেন খেলার মাঠটি তিনবার দরপত্র আহ্বান করেও হাটটি ইজারা দিতে পারেনি। ২০১৭ সালে ১৬টি অস্থায়ী হাটের অনুমোদন দেয় ডিএসসিসি। এ ১৬টির মধ্যে ৭টি হাটের ইজারা দিতে পারেনি সংস্থাটি। এগুলো হলো ব্রাদার্স ইউনিয়ন সংলগ্ন বালুর মাঠ, কমলাপুর স্টেডিয়ামের আশপাশে খালির জায়গা, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, কাউয়ার টেক মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গা, সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন খালি জায়গাসহ আরো দুইটি হাট। আর বাকি ৯টি হাট নামমাত্র মূল্যে ইজারা দিয়েছে সংস্থাটি। এছাড়া গত বছর ১৬টি হাটের মধ্যে ৭টি হাটের ইজারা দিয়েছিল সংস্থাটি। বাকি ৯টি হাট ইজারা দিতে পারেনি। এগুলো হলো ৩২ নম্বর ওয়ার্ডেও সামসাবাদ মাঠ সংলগ্ন সিটি করপোরেশনের খালি জায়গা, কমলাপুর লিটল ফ্রেন্ডস ক্লাব সংলগ্ন বালুর মাঠ ও কমলাপুর স্টেডিয়াম সংলগ্ন বিশ্বরোডের আশপাশের খালি জায়গা, শনিরআখড়া ও দনিয়া মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউয়ার টেক মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, গোলাপবাগ মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, দাওকান্দি ইন্দুলিয়া ভাগ্যপুর নগর (মেরাদিয়া মৌজা) লোহারপুলের পূর্ব অংশ ও খোলা মাঠ সংলগ্ন আশপাশের খালি জায়গা, ডেমরা আমুলিয়া মডেল টাউন ও আশপাশের খালি জায়গা এবং আফতাবনগর ইস্টার্ন হাউজিং।

এ বছরও ডিএসসিসি ১৪টি অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে গত ১২ জুন ডিএসসিসি ১৪ হাটের টেন্ডার আহ্বান করেছে। আগামী ২৬ জুন টেন্ডারবাক্স খোলা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছরের মতো এবারও টেন্ডার ছাড়া হাট বসবে। কারণ প্রতি বছরই স্থানীয় প্রভাবশালীরা এমনভাবে অবস্থা তৈরি করে, কেউই টেন্ডার ড্রপ করতে পারে না। এছাড়া যারা ড্রপ করবে, তারা সরকারি দরের চেয়ে অনেক কম মূল্যে দেবে। তাই এবারও বাদপড়া হাট ইজারার সংখ্যা আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সবচেয়ে কম মূল্যে এসব হাট ইজারা নিতে প্রতি বছরই গড়ে ওঠে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। তাদের ভয়ে ও প্রভাবে সাধারণ ব্যবসায়ীরা টেন্ডার দাখিল করতে পারে না। এবারো এই হাটগুলো সিটি করপোরেশন থেকে খাস আদায়ের অনুমতি নেওয়ার পাঁয়তারও করছে তারা। এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে সিটি করপোরেশনর কর্মকর্তা-কমর্চারীসহ স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সঙ্গে বেশ সখ্য রয়েছে। তবে যে প্রক্রিয়াতেই হাট নেওয়া হোক না কেন সেখানে সব পক্ষকে খুশি করতে হয় বলে জানা গেছে। গত বছর খাস আদায় করা হয়েছে এমন একটি হাটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি বলেন, ইজারা না হলেও খরচ কম না। সবাইকেই খুশি করা লাগে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দরপত্র আহ্বানের পরপরই টেন্ডার জমা দেওয়ার নির্ধারিত স্থানের আশপাশে এই সিন্ডিকেটের লোকজন পাহারায় থাকে। বাইরের কেউ চাইলেও দরপত্র জমা দিতে পারে না। কেউ জমা দিলেও তা প্রত্যাহারের চাপ আসতে থাকে।

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘ দিন ধরে ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এবং সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সহায়তায় প্রভাবশালীরা একেকটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। কোনো বছরই এই সিন্ডিকেটের বাইরে পশুর হাট ইজারা হয় না। কাক্সিক্ষত দর বা ইজারাদার না পেয়ে খাস আদায়ের জন্য হাট ছেড়ে দেওয়া হয়। এই খাস আদায়ের টাকা বেশিরভাগই চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে। আর সিটি করপোরেশন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজনৈতিক প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, গত তিন বছর ধরেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী হাট ইজারা নিয়ে চলছে অনিয়ম আর দুর্নীতি। ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেই বছরের কোরবানির হাটগুলো ইজারাতে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারিনি। কারণ এই হাটগুলো থেকে নির্বাচনী ফান্ড সংগ্রহের না কি নির্দেশ ছিল দলীয়ভাবে। তাহলে এ বছর কি হয়েছে? এ বছরও যে চালান কাটার পরও আমরা শিডিউল পাচ্ছি না?

তিনি বলেন, এ বছর টেন্ডার আহ্বানের পর থেকেই আমরা চালান কেটে বসে আছি। কিন্তু ডিএসসিসির সম্পত্তি বিভাগ থেকে এখনো আমাদের শিডিউল দেওয়া হচ্ছে না। প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আসাদুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই করতে পারব না। মেয়রের সঙ্গে কথা বলুন।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, চালান কেনার পরও কারা শিডিউল পাচ্ছেন না সে খবর আমার জানা নেই। তবে আমাদের শিডিউল ছাপানোর সময় প্রিন্টগত কিছু বিপত্তি হয়েছে। সেজন্য আমরা শিডিউল সরবরাহ করতে পারছি না। এটা দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে। যারা চালান কেটেছেন তারা অবশ্যই শিডিউল পাবেন। এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

পিডিএসও/হেলাল