বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে

প্রকাশ | ১২ জুন ২০১৯, ০৮:২৮

শাহজাহান সাজু

বেকারের সংখ্যা কমিয়ে আনতে কর্মসংস্থানমুখী বাজেটের খসড়া চূড়ান্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এজন্য এবার বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বিনিয়োগে। এরই ধারাবাহিকতায় ভ্যাট ও কর না বাড়িয়ে ব্যবসাবান্ধব বাজেট দিয়ে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করার কর্মসূচি রাখছেন তিনি। শুধু তা-ই নয়; বিনিয়োগ আকর্ষণে আবারও কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত অর্থ সাদা করার সুযোগ দিতে যাচ্ছে সরকার। ১০ শতাংশ কর দিয়ে শিল্প স্থাপনে বিনিয়োগ করে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা সাদা করা যাবে। তবে এ সুযোগ তারাই পাবেন যারা শুধু উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে বিনিয়োগ করবেন। আগামী এক বছরের জন্য এ সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তাছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানোসহ জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কর অবকাশের মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে আরো পাঁচ বছর। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী ১৩ জুন বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালের এটি প্রথম বাজেট উপস্থাপন।

জানা যায়, গত কয়েক বছর ধরে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগে খরা যাচ্ছে। তাই সরকার ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে এবারের বাজেটে পদক্ষেপ নিচ্ছে। সরকার আশা করছে, অপ্রদর্শিত অর্থ শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে দেশ থেকে অর্থ পাচার কমবে এবং উদ্যোক্তারা স্থানীয় শিল্প স্থাপনে আরো উৎসাহিত হবেন। মূলত এই প্রত্যাশা থেকেই এক বছরের জন্য এ সুযোগটি বাজেটে রাখা হচ্ছে। প্রসঙ্গত, বর্তমানে শুধু ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়ে প্রতি বর্গমিটারে নির্ধারিত অংকের টাকা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যায়। জানা যায়, বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি, অবকাঠামো, পর্যটন, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে দেওয়া কর অবকাশের মেয়াদ চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত আছে। তবে বিনিয়োগ বাড়ানোসহ জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে কর অবকাশের মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়িয়ে আগামী ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব থাকছে বাজেটে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বাড়াতে আরো বেশকিছু খাতকে নতুন করে কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যে ফার্নিচার, কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদক শিল্প, চামড়া, গৃহস্থালি কাজে ব্যবহৃত সব উপকরণ; যেমন- ব্লেন্ডার মেশিন, ওয়াশিং মেশিন, প্রেসার কুকার, রাইস কুকার ইত্যাদি প্রস্তুতকারক শিল্প কর অবকাশ সুবিধা পেতে যাচ্ছে। এই নিয়মানুযায়ী বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু থেকে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত আলোচ্য প্রতিষ্ঠান বছরে যে পরিমাণই মুনাফা করবে তার ওপর কোনো কর দিতে হবে না। তবে মেয়াদ শেষে প্রযোজ্য হারে কর দিতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী বর্তমানে বছরভিত্তিক ‘ক্রমহ্রাসমান’ হারে (বিদ্যমান যে রেট আছে তার চেয়ে কম) কর দিতে হয়। তবে আগে ঢালাওভাবে কর অবকাশ সুবিধা ছিল। এর ব্যাপক অপব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১-১২ অর্থবছরের বাজেটে এই সুবিধা কিছুটা কঠোর করে শর্তসাপেক্ষে ক্রমহ্রাসমান হারে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার।

জানা যায়, বাজেটে প্রথমবারের মতো বেকারদের জন্য ঋণ তহবিল (স্ট্যাট আপ ফান্ড) সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ তহবিল থেকে স্বল্পসুদে সহজ শর্তে ঋণ নিয়ে বেকাররা ব্যবসা কবতে পারবেন। তাছাড়া নতুন উদ্যোগের মধ্যে থাকছে প্রবাসীদের জন্য বিমা সুবিধা। কারণ অনেকে বিদেশে গিয়ে চাকরি হারাচ্ছেন, দুর্ঘটনায় পঙ্গু ও নিহত হচ্ছেন। তাছাড়া নানাভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফিরছেন। এসব ঝুঁকির কারণেই বাজেটে তাদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার প্রস্তাব থাকছে। এর পাশাপাশি কৃষকের জন্য পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হবে শস্যবিমা। প্রাথমিকভাবে বেছে নেওয়া হবে একটি জেলাকে। পরে এটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা তৃতীয়বারের মতো দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন। তাছাড়া এর আগে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে টানা দশ বছরে দেশে বড় বড় প্রকল্পে সরকারি বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বেসরকারি খাতে। এছাড়া আগামী অর্থবছরের শেষদিকে চালু হচ্ছে পদ্মা সেতু। এটি চালু হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। কর্মতৎপরতা বাড়বে পায়রা ও মোংলাবন্দরে। তাছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হলে অবকাঠামো খাতে ব্যাপক সাফল্যের দুয়ার উন্মুক্ত হয়ে যাবে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের পর শিক্ষিত, অশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত মানুষের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, প্রতিটি বাজেটেই বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের বিষয়টি থাকে। এবারও এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর কর্মসংস্থানের জন্যই তো সরকারের এত চেষ্টা; এত উদ্যোগ। পদ্মা সেতু ও কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল আগামী অর্থবছরের মধ্যেই চালু হবে। এছাড়া দশ মেগা প্রকল্পের সবই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন হলে দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরি হবে। এখন শুধু অপেক্ষার পালা। শুধু তাই নয়, সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় যারা সুবিধা ভোগ করছেন সেসব পরিবারের অন্তত একজনকে চাকরি দেওয়ার একটি কৌশল সরকারের রয়েছে। নতুন বাজেটে এসব বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। তাই আসছে বাজেট এমনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করবে। নতুন করে কারো ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে না। তবে করের আওতা বাড়ানো হবে। বাজেট হবে এক বছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু এর মধ্যে আগামী ৫ বছরের দর্শন থাকবে। ধারাবাহিকভাবে অর্জিত প্রবৃদ্ধির সুফল এদেশের মানুষ পাবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

পিডিএসও/হেলাল