ঢেলে সাজানো হচ্ছে স্থলবন্দরগুলো

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জুন ২০১৯, ১১:০৯

গাজী শাহনেওয়াজ

সীমান্ত বাণিজ্য বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের স্থলবন্দরগুলো ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সরকার চাচ্ছে বাণিজ্য সুবিধার মাধ্যমে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।

বর্তমানে স্থলবন্দরের সংখ্যা ২৩টি। এর মধ্যে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে সাতটি বন্দর। ছয়টি বন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বিওটির ভিত্তিতে। এর জন্য বেসরকারি পোর্ট অপারেটরের সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি আছে। অবশিষ্ট ১০টি বন্দরের কার্যক্রম চালু করতে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছে সরকার। বন্দরগুলোর কার্যক্রম আরো গতিশীল করতে মিশন, ভিশন ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এসব প্রক্রিয়াধীন বন্দরের আধুনিকায়নের কার্যক্রম শেষ করার কথা বলা আছে।

এছাড়া পণ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে আমদানির পাশাপাশি ক্রমান্বয়ে রফতানি বৃদ্ধি পাচ্ছে স্থলবন্দরগুলোতে। এর মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব বাড়ছে; অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে দেশ। আর বন্দরের কার্যক্রম বাড়ায় সরকারের আয়ও বেড়েছে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যপত্র পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, সমুদ্রপথে পণ্য আনা-নেওয়ার পাশাপাশি স্থলবন্দরের কার্যক্রম সম্প্রসারণে ২০০১ সালের ১৪ জুন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বন্দরগুলোর সহায়তায় স্থলপথে পণ্য আমদানি ও রফতানি সহজতর হচ্ছে। এখানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়ন, পণ্য হ্যান্ডলিং ও সংরক্ষণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। সুবিধাজনক ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে দক্ষ ও সাশ্রয়ী সেবা প্রদান করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে স্থলবন্দরগুলোর মধ্যে বেনাপোল, বুড়িমারী ও ভোমরা স্থলবন্দর পণ্য আমদানি ও রফতানিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। বন্দরগুলো ঢেলে সাজানোর অংশ হিসেবে ভোমরা বন্দরের কিছুটা সংস্কার হয়েছে। পণ্য পরিবহন সহজ করতে নির্মাণ হচ্ছে বিকল্প সড়ক (বাইপাস)। ভোমরার মতো বেনাপোল বন্দরের আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। দুই দেশের (বাংলাদেশ-ভারত) যাত্রীদের নির্বিঘেœ চলাচল ও অবকাশ সুবিধার্থে একটি আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার ও বাস টার্মিনাল নির্মাণ হয়েছে। এ বন্দর থেকে লিংক রোড নির্মাণ হয়েছে ভারতের আইপিসি পর্যন্ত। তামাবিল স্থলবন্দরের অধিকাংশ অবকাঠামো নির্মাণ শেষে শুরু হয়েছে অপারেশনাল কার্যক্রম। বিপুল অর্থ ব্যয়ে সোনাহাটা স্থলবন্দরের উন্নয়নপূর্বক শুরু হয়েছে অপারেশনাল কার্যক্রম।

এছাড়া বন্দরগুলোর আরো ক্ষেত্র বাড়াতে বেনাপোল স্থলবন্দরে কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনাল নির্মাণের জন্য ২৮ হাজার ৯৬৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা ব্যয়ে নেওয়া হয়েছে একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ বন্দরের পার্কিং ইয়ার্ড, ওপেন স্ট্যাক ইয়ার্ড ও অফিস বিল্ডিংসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এছাড়া তামাবিল ও বুড়িমারী স্থলবন্দরের সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য ৩৩ হাজার ৩৫০ লাখ টাকা এবং একটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দরগুলোর সব ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্নœ হলে এর কার্যক্রম আরো বাড়বে।

কারণ স্থলবন্দরগুলো সচল করার মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের অগ্রগতি হয়েছে। আগামীতে এ কার্যক্রম আরো বাড়বে, যা স্থলবন্দরের প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে। আশা করা হচ্ছে, ভারত, নেপাল ও ভুটানকে ট্রানজিট সুবিধা প্রদান বা বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপাল মোটরযান চুক্তির (বিবিআইএন এমভিএ) আওতায় অদূর ভবিষ্যতে স্থলপথে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বাণিজ্য বৃদ্ধির সঙ্গে সরকারি রাজস্বের পরিমাণ বহুলাংশে বাড়বে।

এদিকে গত পাঁচ বছরে স্থলবন্দরের আমদানি-রফতানি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছে ৬৮ লাখ ৬৬ হাজার ২৮৬ মেট্রিক টন এবং রফতানি করেছে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৪৩৩ টন। একইভাবে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭৭ লাখ ২৭ হাজার ৮০৪ টন ও রফতানি ১১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৮ টন। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭২ লাখ ৮২ হাজার ৮৮৪ টন ও ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৭৩ টন।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ কোটি ৪০ লাখ ৩৭ হাজার ৫৬৫ টন ও রফতানি ৮ লাখ ৩২ হাজার ৯০৪ টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ কোটি ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৬৪ টন ও ৯ লাখ ৩৫ হাজার ৪৪২ টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৯২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৯৪ টন আমদানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে ৪ লাখ ৯৯৩ টন পণ্য।

ওই পণ্য আমদানি ও রফতানির বিপরীতে আয় হয়েছে যথাক্রমে ৬১ কোটি ৩০ লাখ এবং ব্যয় হয়েছে ৫১ কোটি ৬ লাখ, ৭০ কোটি ৫২ লাখের বিপরীতে ব্যয় ৪৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ৮৩ কোটি ২০ লাখ ও ৫৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ১১১ কোটি ৫১ লাখ টাকা ও ৭৫ কোটি ২ লাখ টাকা, ১৪৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ও ৯৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট বন্দরগুলো থেকে আয় ১১৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৮৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছর ছাড়া গত চার অর্থবছরে আয়ের চেয়ে ব্যয় কম হয়েছে। এই হিসাবে বলা যায়, স্থলবন্দর থেকে প্রতি বছর সরকারের ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে। বন্দরগুলো ঢেলে সাজানোর কাজ শেষ হলে এ আয় আরো বাড়ছে। এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

পিডিএসও/রি.মা