লক্ষ্য ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো

সঞ্চয়পত্রে সংস্কার আসছে

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ০৯ জুন ২০১৯, ১০:৩৫

শাহজাহান সাজু

ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে সংস্কার আসছে সঞ্চয়পত্রে। এ লক্ষ্যে আসন্ন বাজেটেই নেওয়া হচ্ছে বিশেষ উদ্যোগ। সুদের হার অপরিবর্তিত রেখে টেনে ধরা হচ্ছে বিনিয়োগের লাগাম। স্থাপন করা হচ্ছে সঞ্চয়পত্র ক্রেতাদের তথ্য সংক্রান্ত ডেটাবেইজ। তাছাড়া ক্রেতাদের জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর নীতিমালাও হচ্ছে। তাই ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৩০ হাজার কোটি টাকা; যা চলতি বাজেটে ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের চেয়ে এবারের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা কম।

সূত্র জানায়, আগামী ১ জুলাই থেকে শুরু হচ্ছে সারা দেশে অনলাইনে লেনদেন। সঞ্চয়পত্র খাতে অপ্রদর্শিত অর্থের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা, ধনী ও করপোরেট শ্রেণির হাত থেকে সঞ্চয়পত্রকে রক্ষা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো ও অধিক সুদ পরিশোধে বাজেটের ওপর চাপ কমাতেই মূলত এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সম্প্রতি এক প্রাক-বাজেট আলোচনা সভায় বলেছেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হবে না। যাদের জন্য এটি চালু করা হয়েছে তাদের সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকবে। তবে এ খাতে কিছু সংস্কার করা হবে। কারণ কিছু অবৈধ টাকা এখানে বিনিয়োগ হচ্ছে। ফলে গত কয়েক বছর থেকে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি হচ্ছে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। সেটা কমিয়ে আনতে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা যায়, পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুধু ঢাকা শহরে চলতি মাস থেকে অনলাইনে সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, বাধ্যতামূলক করা হয়েছে ক্রেতাদের করদাতা শনাক্তকরণ নাম্বার (টিআইএন) ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি। সংযুক্ত করা হয়েছে মোবাইল ফোন নম্বর। এতে সঞ্চয়পত্র কেনাবেচায় ধীরগতি লক্ষ করা যাচ্ছে।

এদিকে অনলাইনে সঞ্চয়পত্র বিক্রি ঢাকায় শুরু করা হয়েছে। তবে নতুন পদ্ধতি পুরোনো সঞ্চয়পত্রধারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। আগামী ১ জুলাই থেকে সারা দেশে এ পদ্ধতি চালু করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ১৫ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয়ের সরকারি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ কর্মসূচি বিভাগ থেকে জারি করা এ নির্দেশনায় বলা হয়, জাতীয় সঞ্চয় স্কিম অনলাইন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে জেলা শহরে সঞ্চয়পত্র স্কিম লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের সব কার্যালয় ও শাখাকে লেনদেন শুরু করতে হবে। আগামী ১ জুন থেকে অনলাইন ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতির বাইরে সঞ্চয়পত্র বেচাকেনা না করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে ৬৮ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে; যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ বেশি। এর ফলে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে যে পরিমাণ অর্থ ধার করার লক্ষ্য ধরেছিল, তার চেয়েও ৫২ শতাংশ বেশি নিয়ে ফেলেছে ৯ মাসেই।

প্রসঙ্গত, সঞ্চয়পত্রের গ্রাহকদের কমপক্ষে প্রতি দুই মাস অন্তর সুদ দিতে হয়। এর ফলে অর্থনীতির পরিভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ঋণ বা ধার হিসেবে গণ্য করা হয়। সে হিসাবে জুলাই-মার্চ সময়ে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ৩৯ হাজার ৭৩৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। এ ঋণের বিপরীতে গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ২১ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে।

এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ এতটাই বেড়ে গেছে যে, চলতি অর্থবছরে খাতটিতে ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ বাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এতে দেখা যাচ্ছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বছরে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার থেকেও এ ব্যয় প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা বেশি। এটির লাগাম টানতেই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।

পিডিএসও/রি.মা