ধানে মণপ্রতি কৃষকের লোকসান ২৩০ টাকা

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৯, ১২:৪৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

পাকা ধানে ভরা মাঠ, ফলনও হয়েছে বাম্পার; কিন্তু ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হাসি নেই কৃষকের মুখে, চোখে বিষাদের ছাপ। কারণ জমি ও বীজ তৈরি থেকে শুরু করে ঘরে তোলা পর্যন্ত এক মণ ধানে খরচ পড়েছে অন্তত ৭৩০ টাকা। কিন্তু বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। এতে মণপ্রতি কৃষকের লোকসান গুনতে হচ্ছে ২৮০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত। তাই লাভ তো দূরে থাক, আসলও ঘরে তুলতে পারছেন না কৃষক। উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণাঞ্চল— সব জায়গায় একই অবস্থা।

কৃষকদের অভিযোগ, প্রতি বছরই কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে খাদ্য বিভাগের মাধ্যমে ধান-চাল ক্রয় করে সরকার। তবে সরকারের এই ভর্তুকির অর্থ সাধারণ কৃষকদের পকেটে না গিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী, ধান-চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের পকেটে চলে যায়। এবারও তাই ঘটছে।

কৃষকরা বলছেন, সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ১ হাজার ৪০ টাকায় প্রতি মণ ধান ক্রয় করছে। আর ৩৬ টাকা দরে ১ হাজার ৪৪০ টাকায় প্রতি মণ চাল ক্রয় করছে। কিন্তু স্থানীয় বাজারে ৪০ কেজির জায়গায় ৪৫ কেজি ধরে প্রতি মণ ধান ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি করছেন কৃষক।

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা গ্রামের আবদুল কাদের (৩৬) এবার ৮ একর জমিতে বোরোর আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো পেয়েছেন। তবে ভালো ফলন হাসি ফোটাতে পারেনি কাদেরের মুখে। তিনি বলেন, বাম্পার ফলন হলেও বাজারে ধানের দাম কম। ৮ একর জমিতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করে বোরো আবাদ করেছি। কিন্তু ধানের যে দাম, তাতে উৎপাদন খরচ ওঠে না। লাভ ঘরে তোলা যাবে না। ধান কাটাতে মজুরি দিতে হয়েছে ৩৪ হাজার টাকা। মুখে হাসি আসবে কোথা থেকে?

কাদেরের মতো আরো অনেক কৃষক আছেন, যারা ধান আবাদ করে বিপাকে পড়েছেন। লাভ তো দূরে থাক, আসলও ঘরে তুলতে পারছেন না। বাকেরগঞ্জের ডাপরকাঠি গ্রামের মানির উদ্দিন এবার এক একরে বোরো আবাদ করেছেন। তিনি বললেন, জমি চাষ, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক, সেচ, মাড়াইসহ অন্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মণ ধান ফলাতে আমাদের ৮৭৫ টাকা ৭৬ পয়সা খরচ হয়েছে। কিন্তু বাজারে প্রতি মণ ধানের দাম পাচ্ছি ৪৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। এই ক্ষতি কীভাবে পোষাব আমরা? বাজার থেকে চাল কিনতে গেলে ৫০-৬০ টাকা কেজিতে কিনতে হয়। তবু বছরের খোরাকিটা এই দিয়ে রাখি। কিন্তু এসব করে আমাদের কোমর ভেঙে যাচ্ছে।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, চলতি বছর বরিশালের ছয় জেলায় ১ লাখ ৪৬ হাজার ৮১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৭৪ হাজার ৭৬৩ টন ধান। এরই মধ্যে এ ধানের বেশির ভাগ কাটা হয়ে গেছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে বলে মনে করছেন কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা।

বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক তৌফিকুল আলম বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে প্রচুর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। সরকার প্রতি মণ ধানের মূল্য ১ হাজার ৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। কৃষক যাতে ন্যায্যমূল্য পান, সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব খাদ্য বিভাগের।

এদিকে, একই কারণে ফলন ভালো হলেও উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারমূল্য কম হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন উত্তরাঞ্চলের কৃষকও।

নীলফামারী জেলায় এবার সরকারিভাবে ২ হাজার ৬৬২ টন ধান ও ১৭ হাজার ৯৬৫ টন চাল ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু ধান ও চাল ক্রয় এখনো শুরু না হওয়ায় ফরিয়া ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করে ধান ক্রয় করছেন; এতে কৃষকরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।

নীলফামারী সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের চৌধুরীপাড়ার কৃষক আইয়ুব আলীর (৫৫) নিজের আবাদি জমি নেই। মানুষের জমি ইজারা নিয়ে আবাদ করে সংসার চালান। এবার বোরো মৌসুমে আট বিঘা জমি ইজারা নিয়ে ধান চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা জমির ইজারা বাবদ জমির মালিককে পরিশোধ করতে হয়েছে ৪ হাজার করে মোট ৩২ হাজার টাকা। ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত প্রতি বিঘায় তার খরচ হয়েছে ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।

নিজের ২২ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন বাড়াইপাড়া গ্রামের কৃষক রতন সরকার (৪৫)। নিজের জমি হওয়ায় ইজারা বাবদ অতিরিক্ত চার হাজার টাকা প্রতি বিঘায় কম খরচ হয়েছে। এর পরও তার প্রতি বিঘায় লোকসান হয়েছে প্রায় ৪ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দিন অভি বলেন, সরকারের অভ্যন্তরীণ বোরো ধান সংগ্রহ অভিযান চলবে ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। অন্য অঞ্চলের ধান আগে ওঠা শুরু করলেও এ অঞ্চলের ধান দেরিতে ওঠে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আবুল কাশেম আযাদ বলেন, বীজ, সেচ ও সারের কোনো সংকট ছিল না জেলায়। পাশাপাশি আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বাম্পার ফলন হয়েছে। দাম কম হওয়ায় কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পিডিএসও/তাজ