কমছে না পলিথিনের ব্যবহার

প্রকাশ : ১২ মে ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১২ মে ২০১৯, ০০:২৯

গাজী শাহনেওয়াজ

পরিবেশ অধিদফতরের নানামুখী উদ্যোগ সত্ত্বেও পলিথিনের ব্যবহার কমানো সম্ভব হয়নি। বরং দিন দিন বাড়ছে এর ব্যবহার। স্বল্প বিনিয়োগে বেশি মুনাফার লোভে অসাধু ব্যবসায়ী চক্র রাজধানীর আশপাশে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য পলিথিন কারখানা। প্রতিদিন ঢাকায় ব্যবহার হচ্ছে অন্তত ২ কোটি পলিথিন। এই হিসাবে দেখা যায়, ঢাকা শহরে একেকটি পরিবার দৈনিক গড়ে চারটি পলিথিন ব্যবহার করছে। এই পলিথিন শুধু পরিবেশের জন্য ক্ষতি তা নয়, ড্রেনেজ ব্যবস্থায় মারাত্মক হুমকি।

পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের ব্যবহার, উৎপাদন ও বিপণন প্রচলিত আইনে নিষিদ্ধ। আইন থাকলেও তা কার্যকরে দেখা যায় না জোরালো উদ্যোগ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের অলিগলি, বাজার, মুদি দোকানে দেদার মিলছে পলিথিন।

২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী এনে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে বলা আছে, সরকার নির্ধারিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রথম অপরাধের দায়ে অনধিক ২ (দুই) বছরের কারাদন্ড বা অনধিক ২ (দুই) লাখ টাকা অর্থদন্ড (জরিমানা) বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ সংশোধিত ২০১০ সালের আইনের ৭(১) ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তির কারণে পরিবেশ বা প্রতিবেশের ক্ষতি হলে সেই ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণপূর্বক তা পরিশোধ করতে হবে এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ বা উভয় প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ওঠে এসেছে, ঢাকা শহরে একেকটি পরিবার গড়ে প্রতিদিন চারটি পলিথিন ব্যবহার করে। ২ কোটি মানুষের বিপরীতে ৫০ লাখ পরিবার হলে ঢাকায় প্রতিদিন পলিথিন ব্যবহারের পরিমাণ ২ কোটি পিস। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, পলিথিন ক্যানসারের মতোই একটি নীরব ঘাতক। এই পণ্যটি শত শত বছর পড়ে থাকলেও পচে না কিংবা মাটির সঙ্গে মিশে যায় না। পরিবেশদূষণ রোধ করতেই আইনের মাধ্যমে পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও আবার তার ব্যবহার বাড়তে শুরু করেছে। সরকার ও পরিবেশ অধিদফতরের উদাসীনতায় পলিথিন উৎপাদন হচ্ছে, বিপণন হচ্ছে।

আর ঢাকা মহানগর আদালতের আইনজীবী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান (শাশ্বত মনির) বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু কিনলেই পলিথিন দেওয়া হয়। যেমন, ডিম, মাছ, আলু, গুড় এগুলো কিনতে গেলে পলিথিন ব্যবহার করা হয়। পলিথিন রোধে আইন আছে, এর কঠোর প্রয়োগ করতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিন তৈরির এক হাজার ২০০ কারখানা রয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই পুরান ঢাকাকেন্দ্রিক। পুরান ঢাকার অলিগলিতে রয়েছে প্রায় ৩০০ কারখানা। কেরানীগঞ্জ, জিঞ্জিরা, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও এবং টঙ্গীতে ছোট-বড় বেশকিছু কারখানা রয়েছে। যাত্রাবাড়ী থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পর্যন্তÍ বুড়িগঙ্গার পার ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শতাধিক কারখানা। ঢাকার পলিথিন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে একাধিক প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। ঢাকা ও আশপাশের এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রামসহ জেলা শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে শত শত পলিথিন কারখানা। ঢাকা শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের ৮০ শতাংশ ড্রেন পলিথিন ব্যাগে বাধাগ্রস্ত। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। ড্রেনে আটকে থাকা পলিথিন ড্রেনেজ সিস্টেমকে অচল করে রাখে।

পরিবেশ অধিদফতরের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের এক তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত শিল্প-কারখানা, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, পাহাড়, টিলা কর্তন, ইটভাটা, জলাশয়, পুকুরভরাট ও অবৈধ পলিথিন তৈরি কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। অভিযানের আওতায় প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও ব্যক্তির সংখ্যা সারা দেশে ৩ হাজার ১০৪টি। ক্ষতিপূরণ ধার্য হয় ১২১ দশমিক ৭০ কোটি যার মধ্যে আদায় হয়েছে ৬৭ দশমিক ১১ কোটি। একইভাবে জুলাই ২০১৫ থেকে মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত নিষিদ্ধ পলিথিনের বিরুদ্ধে ১ হাজার ৮৭৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়। এ অভিযানে সারা দেশে ৪ হাজার ৩৫১টি মামলা হয়। আর জরিমানা করা হয় ৪ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা যার মধ্যে আদায় হয়েছে ৪ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা। ওই সময়ে জব্দকৃত পলিথিনের পরিমাণ ৫৫১ দশমিক ৯৫ টন।

দূষণ ছড়ানো ইট-ভাটার বিরুদ্ধে অভিযান চলে ৬১৬টি। অভিযানে মামলা হয় ১ হাজার ১৭৩টি, জরিমানা করা হয় ১১ দশমিক ১৬ কোটি টাকা, যার মধ্যে আদায় হয়েছে ১১ দশমিক ০৩ কোটি। একইভাবে পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে ১৪৫টি অভিযানে মামলা হয়েছে ১১৬টি। আর জরিমানা ৩০ দশমিক ৮০ লাখ টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে ১৮ দশমিক ৮০ লাখ টাকা। পুকুর ও জলাশয় ভরাটের কারণে ১২টি অভিযানে ১১টি মামলার সঙ্গে জরিমানা ১১ লাখ টাকা। জরিমানার টাকা আদায় হয়েছে ৭ লাখ টাকা।

এদিকে মানব স্বাস্থের জন্য ক্ষতিকর এমন জিনিস উৎপাদনে ব্যবহার কম হলে সরকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভর্তুকি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি, যেসব প্রতিষ্ঠান ক্ষতির মাত্রা বাড়াবে তাদের জরিমানার পরিমাণ বেশি হবে। দেখা গেছে, প্লাস্টিক বোতল এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যসামগ্রী ব্যবহারে পর ফেরত দিলে ব্যবহারীকে ইনসেনটিভ দেওয়া হবে, পলিথিনজনিত ত্রি-আর কার্যক্রম জোরদার করা এবং রিসাইক্লিংয়ের জন্য ভতুর্কি দেওয়া ও এয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট স্থাপনে ভর্তুকি দেবে সরকার। তবে যেসব শিল্প-প্রতিষ্ঠান নিয়মবিধি মানবে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চায় সরকার। এর মধ্যে অধিক দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাছ থেকে বেশি পরিমাণে জরিমানা এবং ট্যাক্স আদায় করা।

উল্লেখ্য, রাজধানী হাজারীবাগে শত শত ট্যানারির বর্জ্য পরিবেশ দূষণ করছিল। সরকারের তৎপরতায় তা স্থানান্তর হয়েছে। এটা সরকারের বড় সাফল্য বলছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

পিডিএসও/রি.মা