বিষেও ভেজাল!

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ১১ মে ২০১৯, ০১:০৭

জুবায়ের চৌধুরী

সুলতান আহমেদ। থাকেন কামরাঙ্গীরচরে। তার বাসায় ইঁদুর, তেলাপোকা, ছারপোকা আর পিঁপড়ার উপদ্রব। এজন্য তিনি রাজধানীর পল্টন থেকে বিষ কিনে আনেন। রাতে বাসার নির্ধারিত স্থানগুলোতে বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার পর সকালে কিছু পিঁপড়া আর কয়েকটা তেলাপোকাকে আধমরা দেখতে পান তিনি। কিন্তু ইঁদুর মরেনি একটাও। কিছুদিন পর শুধু ইঁদুর মারার জন্য এক কৌটা বিষ কিনে আনেন। ঘরে ছিটিয়ে দেওয়ার পরও কোনো ইঁদুর মরেনি। সুলতানের মতো বিষ কিনে ইঁদুর, তেলাপোকা আর পিঁপড়ার উপদ্রব থেকে মুক্তি মেলেনি অনেকেরই। কারণ খোলাবাজার থেকে কিনে আনা বিষেও ভেজাল!

এই ভেজাল কিংবা নকল বিষের বিষয়ে জানতে অনুসন্ধানে গিয়ে জানা গেছে, দেশে বিষের চাহিদা যেমন ক্রমেই বেড়েছে, তার জোগান দিতে দেশে ছোট-বড় সব মিলিয়ে গড়ে উঠেছে ২৫০টি কোম্পানি। বেশ লাভজনক বাণিজ্য হওয়ায় বিষের বাজারেও আছে শতাধিক অবৈধ কোম্পানি। দেশে কোনো বিষ তৈরি করে না কোন প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করে নিজেদের মোড়কে ভরে বাজারে ছাড়ে দেশীয় কোম্পানিগুলো। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অনিবন্ধিত কোম্পানিগুলোর বাজারজাত করা বিষের মান প্রশ্নবিদ্ধ এবং এর নেতিবাচক প্রভাবও বেশি।

কারওয়ান বাজারের একটি গলিতে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ইঁদুর, ছারপোকা, তেলাপোকাসহ বিভিন্ন পোকা মারার বিষের পসরা সাজিয়ে বসেন কয়েকজন। দোকানের কাছে গিয়ে দেখা যায়, তেলাপোকা, ছারপোকা ও ইঁদুর মারার প্রায় ৪ থেকে ৫ পদের বিষ বেচা হয় সেখানে। তবে এসব বিষের বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা নেই। একই চিত্র পুরান ঢাকার চকবাজারেও। বিষ ও সারের ডিলারদের দোকানেও অধিকাংশ পণ্যে নেই বিষ সরবরাহকারী কোম্পানির পূর্র্ণাঙ্গ ঠিকানা। তবে এসব পণ্য আসল এবং শতভাগ কাজ করে বলে দোকানিদের দাবি। কারওয়ান বাজারে বসে যারা বিষ বিক্রি করছিলেন তাদের সঙ্গে নকল বিষ নিয়ে কথা বলতে চাইলে কেউ কিছু বলতে চাননি। রাজু মিয়া নামে একজন জানালেন, বিষে ভেজাল আছে কি না সেটা জানি না। আমরা চকবাজার থেকে পাইকারি দরে কিনে আনি। তবে এসব বিষে কাজ হয়। যারা কেনেন তারা তো কোনো দিন অভিযোগ দেননি।

তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, বিষ কিনে নিয়ে প্রয়োগ করেও তেলাপোকা ও ইঁদুরের উৎপাত কমে না, বড়জোর কিছুক্ষণ অচেতন থাকে তারপর যেই সেই, আগের মতোই শুরু হয় উৎপাত। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পরিমাণমতো বিষ না পাওয়ায় মানুষ একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অন্যদিকে অপর্যাপ্ত মাত্রার বিষ পোকা নিধনে কোনো কাজেও আসে না। ফলে সেই বিষটি শরীরে সহ্য করার ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে পোকা বা প্রাণীগুলো। পরে সঠিক মাত্রার বিষ দিলেও সেসব পোকা, প্রাণীর দেহে আর কাজ করে না। প্রয়োজন হয় নতুন আরো শক্তিশালী বিষের। তাই বিষ বাণিজ্যে নজরদারি চান বিশেষজ্ঞরা।

বিষ কথাটায় সাধারণত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া হয় কিন্তু নিজেদের স্বার্থে জেনে না জেনে বিচিত্র বিষের ব্যবহারে অভ্যস্ত মানুষ। তাই কালক্রমে কেবলই বড় হয়েছে বিষের বাজার। দেশেই তা বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার। এই বাজারেও আছে অবৈধ বাণিজ্য আর ভেজালের কারবার। আছে অপব্যবহার আর সচেতনতার অভাব। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার বছর আগে থেকে বিষের ব্যবহার করে আসছে মানুষ। সে সময় সাপ, ব্যাঙ, মাকড়সা, উদ্ভিদসহ প্রাকৃতিক উপাদান থেকে বিষ সংগ্রহ করত। সেসব বিষ পোকামাকড় দূর করা, শিকার করাসহ শত্রুদের হত্যার কাজে বেশি ব্যবহার হতো।

কালক্রমে দৃশ্যপটে পরিবর্তন এসেছে। তৈরি হয়েছে বিষের বাজার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ছড়ালে, সৈনিকদের বাঁচাতে জার্মান বিজ্ঞানী পল হার্মেন মুলার ১৯৩৯ সালে ডিডিটি নামক এক ধরনের বিষ আবিষ্কার করেন। ডিডিটি ব্যবহারে সফলতা দেখলে কৃষিকাজে ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু পরিবেশ ও মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ায় ১৯৬২ সালে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। পরে সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ধান, গম, শাকসবজিসহ খাদ্যশস্যের ফলন বৃদ্ধি ও পোকামাকড় ছত্রাক দূর করতে তৈরি করা হয় নতুন নতুন বিষ। পাশাপাশি বাসাবাড়িতে ইঁদুর, তেলাপোকা, মাকড়সা, মশা ইত্যাদি নানা ধরনের পোকামাকড় নিধনে শুরু হয় বিষের প্রচলন। যার মধ্যে বাংলাদেশেই বিভিন্ন শস্যের বহুবিধ রোগ এবং ইঁদুর, তেলাপোকা মারার জন্য নিবন্ধিত আছে সাড়ে ৫ হাজার বিষ।

দেশে বছরে বিষের যে চাহিদা, তা অর্থমূল্যে আড়াই হাজার কোটি টাকার। যার পুরোটাই আমদানি করতে হয় বিভিন্ন দেশে থেকে। অন্যদিকে আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ বিষ রফতানি করে আয় করছে বিপুল অর্থ। দেশেও ক্রমাগত বড় হচ্ছে বিষ বাণিজ্য। বাড়ি ঘরে এবং চাষাবাদে পোকামাকড়সহ নানা প্রাণীর আক্রমণ ও উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য পুরনো প্রাকৃতিক উপায় যেমনÑ ফাঁদ বা ভীতির আয়োজনের পরিবর্তে দিন দিন রাসায়নিক বিষের চাহিদা বেড়েছে। বিশেষ করে ফলন বৃদ্ধি ও খাদ্যশস্য মজুদ করার গুদামে এসব বিষের ব্যবহার বেশি।

অল্প খরচে তাৎক্ষণিক ফল পাওয়ায় এসব বিষের চাহিদা বিস্তৃত হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন-ডব্লিউটিওর জরিপ অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের ১৯৯টি দেশে বাণিজ্যিক বিষের ব্যবহার হয়। ২০১৭ সালের এক আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী, বিষ রফতানিকারক প্রথম ১৫টি দেশের মধ্যে শীর্ষে চায়না, তারপর জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রতিবেশী ভারত। এসব দেশ বিষ রফতানি করে বড় অংকের রাজস্ব আয় করে। অন্যদিকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত খাদ্যশস্যে বিষের ব্যবহার ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও ২০১২ সাল থেকে তা কমছে। ২০১৭ সালের এক জরিপ বলছে, চায়নার রফতানি আয়ের ১৪ শতাংশ আসে বিষ রফতানি করে। জার্মানি ১২ এবং যুক্তরাষ্ট্রর সাড়ে ১১ শতাংশ রাজস্ব আয় করে বিষ রফতানি করে।

দেশে বিষের বাজারে বর্তমানে ২৫০ বৈধ কোম্পানি আছে। এই বাজারের চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা এভাবে ব্যাখ্যা দেনÑ প্রতিদিন ১৪ কোটি, সপ্তাহে ৫২ কোটি, মাসে ২০৯ কোটি এবং বছরে আড়াই হাজার কোটি টাকার বিষের চাহিদা। অল্প পুঁজিতে দ্বিগুণ-তিন গুণ লাভের আশায় ব্যাঙের ছাতার মতো রাতারাতি বিষ বাজারে এসেছে ভেজাল পণ্য যা বাজারের মোট বিষপণ্যের প্রায় ৩০ শতাংশ। তবে এসব বিষের প্রয়োগে যথাযথ মাত্রা ও পদ্ধতি না মানায় দিন দিন বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। অল্প পুঁজিতে বেশি লাভ তাই বিষ বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে দ্রুত। দেশের বিষ বাণিজ্য জগতে গড়ে উঠেছে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ৪শরও বেশি কোম্পানি।

পিডিএসও/রি.মা