লোকসান-দুর্নীতিতে ডুবছে বিমান

সংসদীয় কমিটির উদ্বেগ

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১২:২১

নিজস্ব প্রতিবেদক

লাভের মুখ দেখছে না বিমান, লোকসানের বোঝায় ডুবছে দেশের পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি। কেন এই অবস্থা— এ নিয়ে উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। কমিটির মতে, বিমান লোকসান গুনতে গুনতে দিনে দিনে দুর্বল সংস্থায় পরিণত হচ্ছে; এতে টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। অথচ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ বিমান ছিল লাভজনক।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিমানের ক্রয়-প্রক্রিয়া ও টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম, বিমানে কর্মরতদের কাজের চেয়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দ্রুত ধনী হওয়ার প্রতি বেশি মনযোগী থাকা এবং তাদের কাজে গাফিলতি এবং দুর্নীতির কারণে বিমান এখন একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে ১৯ ধরনের অনিয়ম ওঠে আসে বিমানের। এসব দুর্নীতি-অনিয়ম তলিয়ে দেখতে চায় সংসদীয় কমিটি।

পাশাপাশি, সংস্থাটি কেন অলাভজনক এবং অডিটে নানা আপত্তি উঠে আসায় কমিটি চাইছে বিমানের সচিব ও চেয়ারম্যানকে সভায় উপস্থিত রাখতে। সেখানে বিমানের দুরবস্থা সম্পর্কে ব্যাখ্যা জানতে চাইবে সংসদীয় কমিটি।

জানতে চাইলে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আ স ম ফিরোজ বলেন, সংসদীয় কমিটি স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করে। বছর বছর কেন একটি প্রতিষ্ঠান অলাভজনক সংস্থায় পরিণত হচ্ছে, তা জানার অধিকার রয়েছে কমিটির। তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠানটি কিছুদিন আগেও লাভজনক ছিল, এক অর্থবছর ঘুরতেই কীভাবে সেটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান হলো, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তাই সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি বিমানের সচিব ও চেয়ারম্যানকে বৈঠকে এনে লোকসানের কারণ জানতে চাইবে।

বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মহিবুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি এ মুহূর্তে আমেরিকাতে আবস্থান করছি। এখন কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে চাই না।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখজ্জামান বলেন, বিমানের ক্রয় প্রক্রিয়া থেকে টিকিট বিক্রিতে সর্বত্রই অনিয়ম-দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অনিয়মের সঙ্গে যারা জড়িত সবাইকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে, যাতে এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, এখানে দুর্নীতি করে পার পাওয়া যাবে না।

কারণ এটা একটা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেই অর্থে লাভজনক হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র। কারণ বিমানের পাশাপাশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যারা ব্যবসা করছে তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক যে মনোভাব ও সক্ষমতা রয়েছে এখানে তার ঘাটতি থাকায় লোকসান গুনতে হচ্ছে বিমানকে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বিমানের সর্বোচ্চ থেকে নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন তারা মানসিকতা পোষণ করেন মাস শেষে বেতন পাবেন, লভ্যাংশ পাবেন এবং মাস শেষে বোনাস পাবেন এই মানসিকতা নিয়ে তারা কাজ করেন।

কিন্তু তাদের লাভজনক হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে তা তারা চর্চা ও মানসিকতা পোষণ করেন না। যে কারণে বিমানের এই অবস্থা। তিনি বলেন, বিমানের পরিচালনা বোর্ড থেকে সর্বস্তরে দক্ষ ও সৎ জনবল নিয়োগ করা, যাতে বর্তমানে বিমান পরিচালনায় যে প্রতিযোগিতা চলছে সেখানে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। তাহলেই বিমান মানুষের প্রত্যাশানুযায়ী সেবা দিতে যেমন পারবে, তেমনিক দুর্নীতির কলঙ্ক থেকে নিজেদের বাঁচাতে সক্ষম হবেন বলে জানান তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ বিমান শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অলাভজনক ছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্তে ধীরে ধীরে লোকসানের হার কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসে লোকসানের দুর্নাম ঘুচিয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানের তকমা লাগায় বিমান। ওই বছরে লাভ হয় ২৩৬ কোটি টাকা, যা সংসদীয় কমিটির কাছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উত্থাপিত নথির তথ্য পর্যালোচনায় পাওয়া গেছে। এ ধারাবাহিকতা চলে পরবর্তী আরো দুই অর্থবছর অর্থাৎ (২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭)। এ দুই অর্থবছরে যথাক্রমে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করেছিল ২৩৬ ও ২৩৫ কোটি টাকা করে।

পরবর্তী অর্থবছরে এসে বিমান পুরোনো জায়গায় ফিরে যায় অর্থাৎ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লোকসান দেখানো হয় ২০১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। হঠাৎ লোকসানের দিকে কেন ফিরে গেল বিমান এ নিয়ে রীতিমত উদ্বিগ্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান সংসদীয় কমিটি।

কারণ অনুসন্ধানে কমিটির কাছে মনে হয়েছে, আকর্ষিক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিমান চলাচলের রুট কমিয়ে আনা। বিগত দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের ২৯টি রুটে চলাচল করত বিমান। বর্তমান কিছু রুট কমিয়ে অর্ধেক এ নামিয়ে আনা হয়েছে। এখন ১৫টি রুটে বিমান প্রতিনিয়ত চলাচল করলেও লোকসান আগের মতই ভর করেছে প্রতিষ্ঠানটির ওপরে।

এদিকে বিমানের লোকসান কমাতে আবারও রুট সম্প্রসারণের কথা ভাবছে বিমান। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি ৭৮৬ মডেলের দুটি বিমান কেনা হয়েছে এবং চলতি বছরের শেষে আরো দুটি ৭৮৭ মডেলের বিমান এ বহরে যুক্ত হবে। কর্তৃপক্ষের থেকে কমিটিকে জানানো হয়, বর্তমানে ঢাকা-লন্ডন এবং ঢাকা সিঙ্গাপুর চলাচল করছে। পরবর্তী সময়ে রুট সম্প্রসারণের পর বিমানকে আরো গতিশীল করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, বিমানের যত ধরনের দুর্নীতি হয় তার মধ্যে টিকিট বিক্রিতে অনিয়ম সবচেয়ে বেশি। পরে এ অনিয়ম ঠেকাতে বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক টিকিট বিক্রির পদ্ধতি অনুসরণ করছে কর্তৃপক্ষ বলে জানা যায়।

এতে কতটুকু স্বচ্ছতা ফিরেছে টিকিট বিক্রিতে এ নিয়েও সংশয় রয়েছে কমিটির। সংসদীয় কমিটির সদস্য ও সরকারদলীয় এমপি মির্জা আজম বলেন, টিকিট বিক্রিতে বর্তমান অনলাইনভিত্তিক করা হয়েছে। কিন্তু ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রিতে যে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে এবং এ কাজের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ইমিগ্রেশনে হয়রানি ও নাজেহাল করা হয়, যা বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ ওঠে থাকে। এ বিষয়ে সংশিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার তার ক্ষোভের কথা জানান তিনি।

এদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিমানবন্দর, বিমানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা এবং বিমান সম্পর্কে সাধারণ যাত্রীদের একটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। অথচ বিমানকে বলা হয়, আকাশে শান্তির নীড়। বিমানের অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো ও কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বচ্ছতা ফেরাতে মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় সংসদীয় কমিটি।

কীভাবে বিমান লাভজনক হতে পারে এবং পাশাপাশি স্বচ্ছ ভাবমূর্তির ওপরে দাঁড়াতে পারে; এর জন্য করণীয় কি হওয়া উচিত এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য মুহিবুর রহমান বলেন, সব কিছুর সমাধান পাওয়া যাবে যদি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিমানের চেয়ারম্যানকে কমিটিতে উপস্থিত রেখে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে তাদের মাসিক কাজে অগ্রগতি পর্যালোচনা করে ভুলত্রুটি শুধরানোর জন্য একটা জবাবদিহিতার জায়গা আনা সম্ভব হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানটিতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে, যোগ করেন এই সংসদ সদস্য।

পিডিএসও/তাজ