নিত্যপণ্যের দাম রোজার আগেই বাড়ল

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:০০ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:৩৯

হাসান ইমন
বেড়েছে চিনি, পেঁয়াজ রসুন ও সবজির দাম (প্রতীকী ছবি)

রোজা আসতে আরো ১৫-১৬ দিন বাকি। এরই মধ্যে কয়েক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। ইতোমধ্যে রোজার প্রয়োজনীয় পণ্য চিনি, পেঁয়াজ, রসুন ও বেগুনের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া এর দুই মাস আগেই কয়েক দফায় কেজিপ্রতি ৩০-৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে মুরগি, মাছ ও মাংসের। নিত্যপণ্যের এ মূল্যবৃদ্ধির জন্য পাইকাররা খুচরা ব্যবসায়ীদের এবং খুচরা বিক্রেতারা পাইকারদের দায়ী করলেও মূলত বাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং আসন্ন রমজান মাস সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের মজুদদারি বৃদ্ধির কারণেই বেশির ভাগ পণ্যের দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গত ২৭ মার্চ এক বৈঠকে এবার রমজানে পণ্যের দাম বাড়ানো হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন ব্যবসায়ীরা। তখন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, দেশে সব পণ্যেরই পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। ব্যবসায়ীদের প্রতি আস্থা রেখে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আসন্ন রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না। গত বৃহস্পতিবারও সচিবালয়ে চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের পর একই কথা বলেন মন্ত্রী। যদিও এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। তবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে সরকারকে কঠোরভাবে বাজার মনিটরিং করতে হবে বলে মনে করেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, রমজান মাসে কোনো পণ্যের দাম বাড়বে না, সরবরাহেও ঘাটতি থাকবে না। কিন্তু এরই মধ্যে দাম বাড়ছে। এখন পণ্য সরবরাহ ও পরিবহনে কোনো সমস্যা নেই। তাই সরকারের নজরদারি জোরদার করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে গত বৃহস্পতিবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাজারদর নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল, ছোলা, পেঁয়াজ ও খেজুর টিসিবির মাধ্যমে শিগগিরই বিক্রি শুরু করে দেওয়া হবে। আমাদের ধারণা যে, রমজানে পণ্যের দাম তেমন বাড়বে না। কারণ মজুদসহ সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের আছে। আমাদের কাছে যা রিপোর্ট আছে তাতে করে প্রয়োজনের তুলনায় নিত্যপণ্যের মজুদ অনেক বেশি। তবে চিনিতে হয়তো এক-দু টাকা বাড়তে পারে। কারণ চিনির উৎপাদন খরচ বেড়েছে।’

বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মনিটরিং সব ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ও বাজার মনিটর করবে। কোনো ব্যবসায়ী রমজানকে কেন্দ্র করে সুযোগ নিচ্ছে কি না, সে বিষয়টি আমরা নজরে রাখছি। সার্বিকভাবে আমরা পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি।’

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সূত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গত এক মাসে দেশি পেঁয়াজের দাম ২ টাকা বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৪ টাকা। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৯ এপ্রিল প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ২৫-৩০ টাকা ও আমদানি করা পেঁয়াজ ২৪-২৬ টাকা। এক মাস আগেও দেশি ২৪-২৮ ও আমদানি করা পেঁয়াজ ২০-২৫ টাকা দামে বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে দেশি রসুন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৭০ টাকা ও আমদানি করা ১০০-১২০ টাকা। যা দেড় মাস আগেও দেশি ৪০-৬০ ও বিদেশি রসুন ৭০-১০০ টাকা কেজি বিক্রি হয়েছে। আর আদা মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১৪০ টাকা; যা এক মাস আগে বিক্রি হয়েছে ৯০-১২০ টাকা। রোজায় প্রয়োজনীয় পণ্য চিনি। এক মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৫ টাকা বেড়ে ৫৫-৬০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।

নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার কারণ জানাতে গিয়ে কারওয়ান বাজারের পাইকারি দোকানদার হাবিবুর রহমান বলেন, গত কয়েক দিনে পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। মূলত খুচরা বিক্রেতারা রমজানের জন্য পণ্য মজুদ করতে গিয়েই এমন কেনাকাটা করছেন। তারা এখন ধারদেনা করে সাধ্যমতো পণ্য মজুদ করছেন রমজানে বাড়তি দামে বিক্রির আশায়। অনেকে আবার চড়া সুদে টাকা নিয়ে পণ্য মজুদ করছেন। রমজান উপলক্ষে কিছু মানুষের অতিরিক্ত ভোগ করার মানসিকতা তৈরি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের কারণেই মজুদদাররা বাড়তি মুনাফা লোটার সুযোগ পান।

একইভাবে দাম বাড়ার তালিকায় রয়েছে মুরগি, মাছ ও মাংসের বাজারেও। পিছিয়ে নেই সবজির বাজারও। রাজধানীর মহাখালী কাঁচাবাজার ঘুরে ও পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, গতকাল ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হয়েছে ১৬০-১৬৫ টাকা। যা গত দুই মাস আগে বাজারে ১২০-১৩০ টাকা বিক্রি হয়েছে। কক মুরগির কেজি এখন ২৮০-২৯০ টাকা, যা স্বাভাবিক দামের চেয়ে ৫০ টাকার মতো বাড়তি। দেশি মুরগির কেজি ৪৫০-৪৬০ টাকা, যা সাধারণত ৪০০ টাকার কাছাকাছি ছিল। আর গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা। অথচ দুই মাসে আগে ছিল ৪৮০ টাকা। বাজারের সবচেয়ে সস্তা পাঙ্গাশ মাছ বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা দরে, এক মাস আগেও ছিল ১২০ টাকা কেজি। একই অবস্থা সবজির বাজারেও। রোজার প্রয়োজনীয় পণ্যের মধ্যে লম্বা বেগুন গুরুত্বপূর্ণ। এক মাসের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে গতকাল বিক্রি হয়েছে ৬০। আর পেঁপে ও পটোল ছাড়া অধিকাংশ সবজি বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। বরবটি, ঢেঁড়স, কচুরলতি, করলা, গোল বেগুন, চিচিঙা, শজনে ডাঁটা বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি ৮০ টাকায়। পটোল, টমেটো বিক্রি হয়েছে ৫০ টাকায়।

পিডিএসও/হেলাল