বৈশাখের বাজারে বাণিজ্য ১৪ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ | ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ০৯:১৭

শাহজাহান সাজু

আসন্ন বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে জমে উঠেছে বৈশাখের বাজার। দেশব্যাপী এরই মধ্যে শুরু হয়েছে পহেলা বৈশাখকেন্দ্রিক অর্থনীতির বিশাল কর্মযজ্ঞ। দিবসটিকে কেন্দ্র করে বাজারে বেড়ে গেছে বাঙালিয়ানার পোশাক-আশাক, জুতা, প্রসাধনী, খাদ্যপণ্যসহ গৃহসামগ্রীর চাহিদা। বাঙালির সার্বজনীন প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে শোরুম ও ফ্যাশন হাউসগুলোতে ধুম পড়েছে কেনাকাটার। জাতি, ধম, বর্র্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির ক্রেতা দোকানে দোকানে খোঁজ করছেন নতুন পণ্যের। তাই পহেলা বৈশাখে প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা।

পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রাম ও শহরে বসে বিশেষ মেলা। এসব মেলায় নানা পণ্যের জোগান দিতে এখন গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোও দারুণ ব্যস্ত। এছাড়া আয়োজন থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, ব্যবসায়ীদের মধ্যে থাকে হালখাতার আয়োজন। সব মিলে বৈশাখ ঘিরে থাকে মহাকর্মযজ্ঞ।

জানা যায়, সরকারিভাবে পহেলা বৈশাখের উৎসব ভাতা দেওয়ার পর থেকেই গত কয়েক বছর ধরে সারা দেশে বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের আকার ক্রমেই বাড়ছে। এবার সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ৭৫০ কোটি টাকার বৈশাখী ভাতা তুলবেন। এর পাশাপাশি বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানেও বৈশাখী উৎসব ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৈশাখী উৎসবে এবার প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-বোনাস বাবদ তুলবেন প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক-বীমাসহ অন্যসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বৈশাখী বোনাস হিসেবে যোগ হবে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা। পোশাক খাতে বিক্রির পরিমাণ হবে ৬ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা। খাবার ও অন্যান্য কেনাকাটায় ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। এছাড়া ভোগ্যপণ্যে আরো লেনদেন হবে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য মতে, সারা দেশে বিভিন্ন পণ্যের ছোট-বড় প্রায় ২৬ লাখ দোকান রয়েছে। বৈশাখ উপলক্ষে এসব দোকানিরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। একইসঙ্গে বকেয়া আদায়ে নতুনভাবে হালখাতার আয়োজন করা হয়েছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। বৈশাখী হালখাতার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বড় অঙ্কের টাকার লেনদেন হয়। এতে টাকার চলাচল বাড়ে। অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

জানা যায়, পহেলা বৈশাখে সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হয় দেশীয় তৈরি পোশাক। এরই মধ্যে মার্কেটগুলো বৈশাখী কেনাকাটা শুরু হয়েছে। তবে বৈশাখী অর্থনীতির আকার নিয়ে কোনো গবেষণা না হলেও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, লেনদেনের সম্ভাব্য পরিমাণ হবে ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের ধারণা, বছরজুড়ে যেসব কেনাকাটা হয় তার প্রায় ১০ শতাংশ হয়ে থাকে পহেলা বৈশাখে। দুই ঈদে মিলে হয় প্রায় ৫০ শতাংশ। বাকিটা সারা বছর। বৈশাখে শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়া বেশি বিক্রি হয় বেশি। তাছাড়া মেয়েদের বাঙালিয়ানা সাজের গলার মালা, দুল ব্রেসলেট, চুড়ি ও কারুকাজের হাতব্যাগও প্রচুর বিক্রি হয় এ সময়। ছেলেদের পোশাক বিভিন্ন লুঙ্গি ও গামছারও এ সময় কদর বেড়ে যায় বাজারে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে উৎসব কেন্দ্রিক অর্থনীতির ব্যাপ্তি দিন দিন বড় হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সর্বজনীন উৎসব হিসেবে পহেলা বৈশাখের ভাতা দেওয়ার পর থেকে এখন বেসরকারি খাতে ও ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে নগদ টাকার প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় ক্রয়-বিক্রয় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশ ভালো। বৈশাখকেন্দ্রিক পণ্যসামগ্রী বিশেষ করে দেশীয় পোশাক-আশাকের একটি বড় বেচাকেনা হয় এই সময়ে। এর পাশাপাশি অন্যান্য সামগ্রীর ক্রয়-বিক্রয়ও বাড়ে। অর্থনীতির জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিক বলে জানান তিনি।

জানা যায়, আবহমান কাল ধরে পহেলা বৈশাখে হালখাতা করে থাকেন দেশে ব্যবসায়ীরা। হালখাতায় ক্রেতাদের মিষ্টি-নিমকি খাওয়ান তারা। বর্তমানে হালখাতা উৎসব রং হারালেও মিষ্টি খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। ফলে বৈশাখে মিষ্টির দোকানের ব্যবসা চার থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ঢাকার বেইলি রোড, আজিজ মার্কেট, গাউছিয়া মার্কেট, বসুন্ধরা ও যমুনা ফিউচার পার্কসহ দেশের সর্বত্র বৈশাখী পোশাকের ছড়াছড়ি। পোশাকের পাশাপাশি এই উৎসবে বিক্রি হচ্ছে মাটির বাসন, মাটির গহনা থেকে সোনার গহনা। মুরালি, চিঁড়া, দই ও পোলাওয়ের চাল ও মাংসের চাহিদা রয়েছে। গেঞ্জি ফতুয়া থেকে শাড়ি এবং বাঁশের বাঁশি থেকে স্টিল আলমারি, খাট বিছানার চাদর থেকে পর্দা ও ফ্লোর কার্পেট সব বিক্রি হবে এই উৎসবে। বিক্রি হবে টিভি ও ফ্রিজ। তাই সব পণ্যের দোকানে এখন ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ভিড় সার্বজনীন। জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির ক্রেতা দোকানে দোকানে নতুন পণ্যের খোঁজ করছেন। বিক্রি বাড়াতে ফার্নিচার, ইলেকট্রনিক্স ও পোশাকের দোকানে বিশেষ লোভনীয় ছাড় দেওয়া হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল