ই-কমার্স নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনা

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০১৯, ১০:০০

শাহজাহান সাজু

জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য আগামী তিন বছরে দেশে পাঁচ হাজার ই-কমার্স উদ্যোক্তা তৈরি করে ১ লাখ তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান করতে চায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ‘ই-বাণিজ্য করব নিজের ব্যবসা গড়ব’—এই স্লোগানে টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল পার্ট-এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সেল। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের শিল্প ও জ্বালানি বিভাগ। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এ কর্মসূচির আওতায় যারা উদ্যোক্তা হয়ে বেকারদের চাকরি দিতে চান এমন সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রশিক্ষিত হওয়ার পর একজন উদ্যোক্তা কীভাবে, কোন খাতে বিনিয়োগ করে লাভবান হবেন তার একটি স্পষ্ট ধারণা পাবেন। ই-বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করার জন্য অর্থ সংগ্রহের পথও দেখিয়ে দেবে সরকার।

জানা যায়, ই-কমার্স সম্প্রসারিত হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর সুষম বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে। ভোক্তারা ব্যবসায়ীদের কাছে ভালো সেবা পাবেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপকল্প-২১, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে নিয়ে যাওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নপূরণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা বাস্তবায়ন করতে হলে ই-কমার্স খাত দ্রুত এগিয়ে নিতে দেশের আটটি বিভাগে আগামী তিন বছরে ৫ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। সফলতার সঙ্গে পুরো প্রকল্পটি শেষ করার পর দ্বিতীয় ধাপে আবার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হবে। প্রশিক্ষণকালীন উদ্যোক্তারদের একটি সম্মানীও দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণার্থীদের ৬৩টি বিষয়ের ওপর ই-কমার্স বিজনেস কন্টেন্ট সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংক ঋণ পাওয়াসহ বাজার সম্পর্কেও উদ্যোক্তারা জানতে পারবেন। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সুফল পেতে দেশে ব্যাপক ভিত্তিতে ই-কমার্স চালু হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, বাংলাদেশে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু ২০১০ সালে। বর্তমান সরকার ওই সময় দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছায় সর্বপ্রথম ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের কাজ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে ই-বাণিজ্য। শুরুতে বাংলাদেশে ই-কমার্সে মোট ব্যবসার পরিমাণ ছিল ৮০ কোটি টাকা। এর পরের বছর ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি হয়ে থাকে। বর্তমান প্রবৃদ্ধিও শতভাগের ওপরে। দেশে ই-কমার্সের বাণিজ্যের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে।

ইলেকট্রনিক কমার্স বা ই-কমার্স বা ই-বাণিজ্যের হচ্ছে ইলেকট্রনিক সিস্টেমের (ইন্টারনেট বা অন্য কোনো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক) মাধ্যমে পণ্য বা সেবা ক্রয়-বিক্রয়। দেশে ই-কমার্সের গুরুত্ব দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। তরুণ উদ্যোক্তারাও এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহী হয়ে উঠছেন। ই-কমার্সে সেবা দিতে এগিয়ে এসেছে অনেক প্রতিষ্ঠান। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ এখন অনেক ক্ষেত্রেই উদাহরণ হয়ে উঠছে। অনেক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে ই-কমার্সে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টির উদাহরণ টেনে আনা হয়েছে ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনসিটিএডি) করা সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ই-কমার্সে যুক্ত হওয়ার দারুণ সুযোগ এখন। এই ক্ষেত্রটি থেকে লাভবান হওয়ার সুযোগ এখন দ্রুত বাড়ছে। প্রথমত, মোবাইল ফোনের ব্যবহার বেড়েছে। এতে যোগাযোগ সুবিধা উন্নত হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগের হার বেড়েছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারের হারও বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, নতুন ই-কমার্স অ্যাপ্লিকেশন, প্ল্যাটফর্ম এবং পেমেন্ট সুবিধার কারণে ই-কমার্সের ব্যবহার সহজতর হয়েছে। তৃতীয়ত, স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স সেবার মাধ্যমে স্থানীয়দের চাহিদা পূরণ করতে উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ছে।

জানা যায়, ডিজিটাল কার্যক্রম ব্যবসা বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের নীতিমালার ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতে টেকসই উন্নয়নের জন্য ই-কমার্সের ব্যবহার আরো বাড়ানো যায়। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ সত্ত্বেও বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় ই-কমার্সে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। যেখানে উন্নত দেশের মানুষ অনলাইন শপিংয়ে বেশি নির্ভরশীল আর সেখানে বাংলাদেশে মাত্র কয়েক বছর হলো অনলাইনে শপিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে আশা করা যায়, তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টা আর সরকারের নানামুখী পদক্ষেপে বাংলাদেশকে ই-কমার্সে অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। সব মিলে বাংলাদেশ এখন ই-কমার্স এক অপার সম্ভাবনাময় খাত। যা কেনাকাটাকে করবে আরো গতিশীল, সাশ্রয়ী এবং সহজ।

জানা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে রফতানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরই মধ্যে ৭ থেকে ১০ হাজার ফ্রিল্যান্সার সফটওয়্যার ডেভেলপার কর্তৃক প্রায় ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় ৪০০টি সফটওয়্যার ফার্ম, আইসিটি কোম্পানি তাদের উৎপাদিত সফটওয়্যার এবং আইসিটি সার্ভিসেস যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বেও প্রায় ৬০টি দেশে রফতানি হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল