সমুদ্রসম্পদ আহরণে আসছে বড় বিনিয়োগ

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৯, ০৯:৩৩

শাহজাহান সাজু

তেল-গ্যাস উত্তোলন, মৎস্যসম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটনসহ এই চার ক্ষেত্র নিয়ে বড় পরিসরে কাজ শুরু হচ্ছে। দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে সমুদ্রসম্পদ আহরণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার। ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর উদ্যোগে একটি জরুরি বৈঠক করা হয়। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি সেল এই বৈঠকের আয়োজন করে।

সূত্র জানায়, ওই সভায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খোরশেদ আলম ও ব্লু-ইকোনমি সেলের প্রধান অতিরিক্ত সচিব গোলাম শফিউদ্দিন সেলের কার্যক্রম তুলে ধরেন।

বৈঠকে দ্রুত সমুদ্রসম্পদ আহরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। পাশাপাশি তা ব্যবহারে সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এগুলোর মধ্যে মাছ ধরার আর্টিশনাল নৌকা-ট্রলারগুলোর লাইসেন্স প্রদানের আইন-বিধান শিথিল করা, জাহাজ শিল্পের উন্নয়নে বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ সংরক্ষণ আইন-২০১৯ অনুমোদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ইনল্যান্ড ফিশিংয়ের বিষয়ে প্রতিদিন ছেলেদের মাছের অবস্থান জানার জন্য যেসব উদ্যোগ-প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা কার্যকর করা।

জানা যায়, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে আইনি লড়াইয়ে বিশাল সমুদ্র জয়ের পর বাংলাদেশের অর্জিত জলসীমার ওপর দিয়ে বিমান চলাচলের জন্য পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুট আবিষ্কার হয়েছে। এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস প্রদানের জন্য এ রুটগুলোর ট্রাফিক কন্ট্রোল বাংলাদেশ বুঝে নিলে এখনই রাজস্ব প্রাপ্তির খাতায় আরো যোগ হবে ২৫০ কোটি টাকা। তেল-গ্যাসের পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমানায় রয়েছে মাছের খনি। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে ৪৫০ প্রজাতির মাছ আহরণ সম্ভব। বঙ্গোপসাগরে ১৩টি জায়গায় আছে সোনার চেয়ে অধিক মূল্যবান বালি, ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম। যাতে মিশে আছে ইলমেনাইট, গার্নেট, সিলিমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, ম্যাগনেটাইট। অগভীরে জমে আছে ‘ক্লে’। যা দিয়ে তৈরি হয় সিমেন্ট। বে অব বেঙ্গল ঘিরে গড়ে উঠবে পর্যটন শিল্প। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সাগরে প্রমোদ ভ্রমণ করবেন। সূত্র আরো জানায়, বৈঠকে সি ক্রুজ-কোস্টাল ট্যুরিজম ফলপ্রসূ করতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়নে কথা বলা হয়। একই বছরে যত জাহাজ আসবে তা একেবারেই সরকারের কাছ থেকে সব ধরনের ক্লিয়ারেন্স অনুমোদন নেওয়াসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশদূষণ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার বিষয়টি পরিবেশ অধিদফতরের নিয়মিত মনিটরিংয়ের কথা বলা হয়। সমুদ্র উপকূলে নতুন জেগে উঠা চরের মালিকানা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশে অর্জিত জলসীমার ওপর এফআইআর (ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিওন) বর্ধিতকরণসহ এয়ার ট্রাফিক সার্ভিস প্রদানের মাধ্যমে রাজস্ব আয় প্রাপ্তির লক্ষ্যে রাডারের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।

সভায় বলা হয়, নতুন কর্মপরিকল্পনা বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, গভীর সমুদ্রে আগামী তিন মাসের মধ্যে টুনা মাছ ধরার পরিকল্পনা এবং মেরিকালচার, সি উইড ও শামুক ঝিনুক নিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

জানা যায়, ৭টি নির্ধারিত স্থানে টাওয়ার স্থাপনের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যার মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর নাগাদ শেষ করে আনা হবে। এই প্রকল্পের কাজ শেষ হলে মাছের অবস্থান ট্র্যাকিংসহ জেলেদের কাছে যেকোনো মেসেজ সহজে প্রেরণ করা সম্ভব হবে। পণ্য পরিবহনে বাংলাদেশ পতাকাবাহী জাহাজ অগ্রাধিকার পাবে। দেশের এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের উদ্দেশ্যে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় কর্তৃক এরই মধ্যে ৪২টি প্রতিষ্ঠানকে কনটেইনার জাহাজ নির্মাণ বা সংগ্রহের অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশের সীমানায় সাগরের জলসীমায় পাঁচটি আন্তর্জাতিক রুট আবিষ্কার করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক রুট রয়েছে তা বাংলাদেশের রাডার ব্যবস্থার কাভারেজের বাইরে অবস্থিত। তবে তিনটির মধ্যে পি-৬৪৬ একটি রুটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই রুটে দৈনিক আনুমানিক গড়ে ৫৫টি এয়ারক্রাফট যাতায়াত করে। পি-৬৪৬ রুটে চলাচলকারী ফ্লাইটগুলোর বাংলাদেশের এরোনটিক্যাল চার্জ অনুযায়ী দৈনিক গড় রাজস্ব (মাঝারি সাইজের এয়ারক্রাফট অনুযায়ী) হিসাব ১৬৫০০ মার্কিন ডলার ও বার্ষিক সম্ভাব্য রাজস্ব ৪৯ কোটি ৯৮ লাখ ৬৭ হাজার ৫০০ টাকা। অন্য দুটি এয়ার রুট এন-৮৯৫ ও এম-৭৭০এ যাতায়াতকারী ফ্লাইটের সংখ্যার হিসাব করা সম্ভব হয়নি। এই তিনটির পাশাপাশি আরো দুটি রুটের সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই হিসেবে পাঁচটি রুটে ২৫০ কোটি টাকা আয় করতে পারবে বাংলাদেশ। গভীর সমুদ্রে কোন এলাকায় কি মাছ আছে তা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জানার জন্য বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, যা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক যাচাই-বাছাই ও সংশোধনপূর্বক চূড়ান্ত করা হয়েছে।

পি​ডিএসও/হেলাল