‘৭০০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো’

প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৩৭

ঢাবি প্রতিনিধি

‘বাংলাদেশের একজন উচ্চবিত্ত বা ধনী ব্যক্তি পণ্য কিনতে যে হারে কর দেন, একজন শ্রমিক বা নিম্ন আয়ের মানুষও একই হারে কর দেন। ফলে একদিকে যেমন বৈষম্য বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচও বাড়ছে। আবার বর্তমান কর ব্যবস্থায় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ধনী ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে অর্থপাচার ও কর ফাঁকিতে উৎসাহিত করছে। শেষমেশ দেশ চালাতে গিয়ে মানুষের উপর কর আরোপ করছে সরকার। ফলে জীবন চালাতে চাপে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।’

মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘জনগণের কর আদালত’ নামে দিনব্যাপী এক অনুষ্ঠানে এসব কথা উঠে আসে। জনবান্ধব কর ব্যবস্থা প্রচলনে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করতে এই আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
 
একশন এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবিরের সঞ্চালনায় জনগণের এই কর আদালতের বিচারক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ। এছাড়াও আদালতে এমিকাস কিউরি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মানবাধিকারকর্মী রাজিকুজ্জামান রতন, চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক বাবু কামরুজ্জামান, কোয়ালিশন ফর আরবান পোরের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টও কে. রেবেকা সান-ইয়াত প্রমুখ।
 
‘কর আদালতে’ দুইটি অধিবেশনে মোট পাঁচটি বিষয়ে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়। প্রথম অধিবেশনে জনগণের উপর পরোক্ষ করের প্রভাব নিয়ে শুনানি হয়। দ্বিতীয় অধিবেশনে শুনানি হয় কর্পোরেট কর ফাঁকি ও এর প্রভাব নিয়ে। এই অধিবেশনে এই বিষয়ে একশনএইড বাংলাদেশ-এর গবেষণার কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এতে বলা হয়, ‘সরকারের সঙ্গে চুক্তির ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশে কাজ করা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছর প্রায় ৭০০ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিচ্ছে।’


 
ছায়া আদালতে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘কর জনগণবান্ধব করে তুলতে সংসদে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে বৈষম্যের কথা তুলে ধরা এবং পরিবর্তন আনা সম্ভব। কিন্তু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠরাই কর দিতে চায় না, ধনীদের কথা ভেবে কর ব্যবস্থা তৈরি করে। মানুষের মাঝে কর ও ভ্যাট বিষয়ক সচেতনতা বাড়াতে হবে, তৈরি করতে হবে জনগণবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলতে হবে যৌক্তিক, নৈতিক ও বৈষম্যহীন কর ব্যবস্থা। আর সেজন্য প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা।’

এমএম আকাশ বলেন, ‘সরকার প্রণীত নীতি ও আইনগুলো এমন যাতে রাজস্ব আয়ের বোঝাটা গিয়ে পড়ছে সাধারন মানুষের উপর। পরোক্ষ করের পরিমাণ যেখানে কম হওয়ার কথা সেখানে সাধারণ মানুষকেই সেই কর বেশি দিতে হয়। অথচ বৈধ-অবৈধ উপায়ে হাজার হাজার কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করছেন ক্ষমতাসীনরা। আবার কর ফাঁকিও দিচ্ছেন তারা। সেদিকে সরকার খেয়াল নেই। ফলে এখনও এদেশে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মত জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকারের বিনিয়োগ কম। সাধারণ মানুষ কর দিয়েও সেখানে সেবা পান না। এটি খুবই দুঃখজনক।’

ফারাহ্ কবির বলেন, আমরা কর দিতে চাই। তবে সেই কর হওয়া উচিত সাধারণ জনবান্ধব। সাধারণ জনগোষ্ঠীর উপর থেকে ভ্যাটের বোঝা কমাতে বাংলাদেশ সরকারের কর্পোরেট কর আহরণের পরিমাণ বাড়াতে হবে। কারণ জাতীয় রাজস্বে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর সামান্য পরিমাণেই যোগ হয়। ফলে সরকারকে ভিন্ন উপায়ে যেমন ভ্যাটের উপর জোর দিতে হয় রাজস্ব আদায়ের জন্য। এই সুযোগে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। আর করের ঘাটতির কারণে উন্নয়ন বাজেটের বরাদ্দ কমে যাচ্ছে, বিশেষ করে গণসেবা খাতসমূহে যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। তাদের বাজেট ঘাটতি এবং গরীব মানুষের উপর থেকে ভ্যাটের বোঝা কমাতে কর্পোরেট কর আদায়ের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, বহুজাতিক কর্পোরেট কোম্পানির দ্বারা এই বিপুল পরিমাণ টাকার কর ফাঁকি ও অর্থপাচার যদি রোধ করা সম্ভব হয় তাহলে বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ হবে। আর টাকা দিয়ে সাধারণ জনগণের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ উপযুক্ত মানের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি দেশে প্রচলিত কর প্রথার যেই অসম বন্টন ব্যবস্থা রয়েছে তার প্রতিকার সম্ভব হবে। সাধারণ জনগণের মাথা থেকে ভ্যাটের বোঝাও কমবে। 

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে সমান্তরালে অবস্থানকারী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর সংগ্রহের হার এখনও অনেক কম। যা ২০০৯ থেকে ২০১৮ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৮ থেকে ১০.৩৯ শতাংশ। কিন্তু নেপালে এ অনুপাত ১৪ শতাংশ যেখানে বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় নেপালের প্রায় দ্বিগুন। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকার চাইলেই এই অনুপাত সহজেই ১৬ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে। আর তার জন্য সরকারকে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে কর্পোরেট করসহ অন্তর্ভুক্তিমূলক কর ব্যবস্থার উপর।

পিডিএসও/অপূর্ব