চামড়ার বাজারে ধস, নেপথ্যে সিন্ডিকেট

প্রকাশ | ২৫ আগস্ট ২০১৮, ১৩:৪০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সারা দেশে চামড়া শিল্পে ধসের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। কোরবানির ঈদে ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সাড়া না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন কাঁচা চামড়ার আড়তদাররা। আড়তদাররা বলছেন, গত কয়েক বছরে কাঁচা চামড়ার দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারা অভিযোগ করেন ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা ঈদের আগে সিন্ডিকেট করে চামড়া কেনার জন্য কোনো টাকা বরাদ্দ করেনি বলে কম দামে চামড়া কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

এদিকে, পাড়া-মহল্লা থেকে কেনা চামড়া আড়তদারদের কাছে বিক্রি করতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে মৌসুমি বিক্রেতাদের। গত বুধবার ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে আড়তে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমতে থাকায় অনেক মৌসুমি বিক্রেতা হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনেছেন বলে দাবি করেছেন। সরকার ট্যানারি মালিকদের জন্য চামড়ার দর নির্ধারণ করে দিলেও মৌসুমি বিক্রেতারা সেটি মাথায় রেখে বেশি দাম দিয়ে চামড়ায় কিনেই লোকসানে পড়েছেন বলে মনে করেন আড়তদাররা।

গত বৃহস্পতিবার অনেকে পশু কোরবানি দিলেও আরো লোকসানের শঙ্কায় মৌসুমি বিক্রেতা আর চামড়া কিনতে সাহস করেননি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় চামড়ার একজন মৌসুমি বিক্রেতা বলেন, ঈদের দিন তিনি ১৫০ চামড়া কিনেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনেছিলেন। তাই গত বৃহস্পতিবার আর চামড়া কিনতে পারেননি।

‘৬০০ থেকে ৯০০ টাকা দরে দেড়-দুই লাখ টাকার গরুর চামড়া কিনেছিলেন অথচ অধিকাংশ চামড়াই বিক্রি করেতে হয়েছে ৪০০ টাকায়।’ কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন ৯টা পর্যন্ত কোনো আড়তদার আমার কাছে চামড়া কিনতে আসেনি। পরে রাত ১০টায় লোকসানে চামড়া বিক্রি করেছেন।’

এ বছর সরকার ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করে দেয়। গত বছর লবণযুক্ত চামড়ার দাম ধরা হয় প্রতি বর্গফুট ৫০ টাকা থেকে ৫৫ টাকা। অন্য বছর রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল কাঁচা চামড়া সংগ্রহের প্রধান ক্ষেত্র।

হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি সাভারের হেমায়েতপুরে সরে যাওয়ায় এবার রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি, লালবাগের পোস্তা, নবাবপুরের মানসী সিনেমা হল, পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজার এলাকায় বসেছে চামড়ার অস্থায়ী পাইকারি বাজার। মৌসুমি বিক্রেতারা পাড়া-মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কেনাতেই বিপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন লালবাগের পোস্তা এলাকার একজন আড়তদার বলেন, ‘এ বছর চামড়ার সর্বোচ্চ মূল্য ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সেই হিসাবে প্রতি বর্গফুট চামড়া ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে। কারণ এর সঙ্গে লবণ দেওয়ার খরচ যোগ হবে। আবার এই চামড়া নিয়ে যেতে হবে সাভারের হেমায়েতপুরে। আগে হাজারীবাগে পৌঁছে দিলেই চলত। অনেকে মহল্লা থেকে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছে। তারা আমাদের কাছে নিয়ে আসার পর সেই দাম আমরা দিতে পারিনি। এভাবেই চামড়া নিয়ে এবার একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে।’

আরেক আড়তদার বলেন, ‘ঈদের দিন সকালের দিকে অনেকে চামড়ার বেশি দাম দিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু আমরা সেই দামটা দিতে পারিনি। ঈদের পরদিন যারা চামড়া নিয়ে আসছেন তারা কিছুটা লাভবান হচ্ছেন।

অপর একজন আড়তদার বলেন, এ বছর আন্তর্জাতিকভাবে চামড়ার দাম কম থাকায় দেশের বাজারেও সরকার দাম কিছুটা কমিয়েছে। কিন্তু অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বিষয়টি ধরতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন এলাকা থেকে চামড়া সংগ্রহ করার পর তা প্রতি বর্গফুট ৪৫ টাকা থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু এই দামটা আড়তদারদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, যারা লবণযুক্ত চামড়া ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রি করবেন। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী না বুঝতে পেরে এবার বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেছেন। তারা আংশিকভাবে একটু লোকসানের শিকার হয়েছেন।

এ বছর ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় ৫ লাখ পশু কোরবানি হয়েছে বলে নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এর সঙ্গে আশেপাশের জেলা মিলিয়ে এবার ১০ লাখ চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্য ধরেছে বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন।

এদিকে ট্যানারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম পড়ে যাওয়ায় এই শিল্পে মন্দা হাওয়া বইছে। হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে সাভারে আন্তর্জাতিকমানের আধুনিক চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল সরকারের। যার পথ ধরে রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর করে সাভারে নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল ট্যানারিগুলো হবে কমপ্লায়েন্ট, আন্তর্জাতিকভাবে বাড়বে দেশীয় চামড়ার বাজার। কিন্তু গত বছর থেকে উৎপাদনে যাওয়া এই ট্যানারি শিল্পের অবকাঠামোর অবস্থা বেহাল।

একটি ট্যানারির কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা বাড়াতে হলে আমাদের কমপ্লায়েন্স রেডি করতে হবে। সিইটিপি (কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার) ঠিক করতে হবে। রাস্তাঘাট ঠিক করতে হবে। ডাম্পিং ইয়ার্ড ঠিক করতে হবে। এই জিনিসগুলো ঠিক না হওয়া পর্যন্ত বিদেশিরা আসবে না। বিদেশিরা না এলে আপনার চামড়া দামও বাড়বে না।

চামড়া শিল্পের বেহাল অবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছে সারা দেশের আড়তগুলোতে। আড়ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, চামড়াশিল্পের এমন মন্দা তারা আগে দেখেননি। নাটোরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় অবস্থিত দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চামড়ার বাজারেও ফেরেনি প্রাণচাঞ্চল্য। এক ব্যবসায়ী বলেন, ‘২৫-৩০ বছর ধরে চামড়ার ব্যবসা করি। এ রকম অসুবিধা কখনোই দেখা দেয়নি যে চামড়া বিক্রি হয় না। চামড়াগুলো পড়ে আছে, দাম অর্ধেকে চলে আসছে।’

ভোলাতেও ভাটা পড়েছে কাঁচা চামড়ার চাহিদাতে। আড়তদাররা বলছেন, চামড়ার দাম কম হওয়ায় স্থানীয় মাদ্রাসায় দান করে দিয়েছেন অনেকেই। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ না পেয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আড়তে চামড়া সংগ্রহের চাহিদা কমে যাওয়ায়ও চামড়ার বাজার পড়েছে বলে মনের করছেন অনেকে। চামড়া শিল্পের এমন পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারের মন্দাকেই দায়ী করছেন ট্যানারি মালিকরা। তারা বলছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামেই তারা চামড়া কিনছেন। সাভারের ট্যানারি শিল্পের ১৫৫টি ট্যানারির মধ্যে চালু রয়েছে ১৩০টি। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এরই মধ্যে চামড়া আসতে শুরু করেছে এই নগরীতে। দুই-তিন দিনের মধ্যে ট্যানারির উৎপাদন পুরো দমে শুরু হবে বলে জানান ট্যানারি মালিকরা।

চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে চামড়ার দাম কম : কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দামে ধস নেমেছে। গত ৩০ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম দামে কেনাবেচা হচ্ছে পশুর চামড়া। এজন্য মৌসুমি ব্যবসায়ী বা ফড়িয়ারা ট্যানারি মালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের দিকে অভিযোগের তীর ছুড়লেও ব্যবসায়ীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধের কারণেই কাঁচা চামড়ার দাম পড়ে গেছে। এ ছাড়া হাজারীবাগ থেকে সব ট্যানারি সাভারের ‘অপ্রস্তুত’ চামড়া-শিল্পনগরীতে স্থানান্তরিত করার কারণেও দেশি-বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বলেও দাবি ব্যবসায়ীদের।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) এক কর্মকর্তা বলেন, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে আমাদের দেশের চামড়ার বাজারে ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রধান বাজার হলো চীন অথচ তিন মাস ধরে চীনে রফতানি হচ্ছে না। দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে চীন আমাদের চামড়া নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। আগের অর্ডার তো নিচ্ছেই না, নতুন কোনো অর্ডারও দিচ্ছে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের অর্ডার দেওয়া প্যাকিং করা প্রায় ১০০ কনটেইনার এখনো নিচ্ছে না চীন। চামড়ার দাম এত কম এর আগে কখনো হয়নি। বিগত তিন দশক পর এবার চামড়ার দাম সবচেয়ে কম।’

সেপ্টেম্বর থেকে চামড়া কিনবে ট্যানারি মালিকরা : এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘আগামী সপ্তাহ অর্থাৎ ১ সেপ্টেম্বর থেকে ট্যানারির মালিকরা লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ শুরু করবেন। সরকার নির্ধারিত দামেই আড়তদার ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লবণযুক্ত চামড়া কেনা হবে। চামড়ার মান অনুযায়ী, দাম দেওয়া হবে। রাজধানীর সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়ত পোস্তাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার থেকে এ চামড়া সংগ্রহ করা হবে।’

প্রতি বছর কোরবানির ঈদের ১০-১৫ দিন পর কাঁচা লবণযুক্ত চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এবার নির্বাচনী বছরের কারণে গতবারের তুলনায় ২০-৩০ লাখ পশু বেশি কোরবানি হয়েছে বলে আমাদের ধারণা। তাই এক কোটির ওপরে চামড়া সংগ্রহ করার প্রস্তুতি রয়েছে।’

পিডিএসও/তাজ