ঈদে নির্বাচনী আমেজ : চাঙা দেশের অর্থনীতি

প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১০:১৪ | আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৮, ১২:৫৮

প্রতীক ইজাজ
ছবি : সংগৃহীত

এমনিতেই দেশে ঈদের সময় অর্থনীতির আকার বাড়ে। কোরবানি ঈদের সময় সেই অর্থনীতি আরো চাঙা হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের আবহ। ফলে এবার শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অর্থের প্রবাহ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা এবার বেশি সংখ্যক পশু কোরবানি দেবেন। সেই সঙ্গে নির্বাচনী এলাকায় তাদের পদচারণা ও প্রচারণা, উপহারসামগ্রী কেনা ও বিতরণ এবং ঈদের দিন সকাল থেকে জনসংযোগ ও ঈদ সেলামিতে নগদ অর্থের প্রবাহ থাকবে লক্ষণীয়।

ভোটের আগে এটাই শেষ ঈদ হওয়ায় এবার কোরবানি ঈদ আয়োজনে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা নির্বাচনী এলাকায় পাড়ি জমাতে শুরু করেছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীরা ওইসব এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের হয়ে জায়গা নির্ধারণ করছেন। পশু কোরবানি হবে। মাংস বিতরণ হবে সকাল থেকেই। আবার কেউ কেউ দিনব্যাপী ভোজের আয়োজন করেছেন। দলে দলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। সেমাই, চিনিসহ নানা উপহার দিচ্ছেন। ঈদের দিন থেকে শুরু হবে ঈদ সেলামি। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী ঈদ রাজনীতির এমন তথ্য জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সূত্রগুলো। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে চাঙা হয়ে ওঠে অর্থনীতি।

কেনাকাটা, ভ্রমণ, বিনোদনসহ নানা খাতে মানুষের ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে অর্থের প্রবাহ বেড়ে যায়। বিশেষ করে কোরবানি ঈদে পশু কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে অর্থনীতিতে নতুন দিক যুক্ত হয়। এবার নির্বাচন সামনে থাকায় ঈদ অর্থনীতির আকার বড় হবে। এর সঙ্গে ঈদের গতানুগতিক অর্থনীতি তো রয়েছেই। অর্থনীতিবিদদের হিসাবে, গত ঈদুল ফিতরের অর্থনীতি প্রায় এক লাখ কোটি টাকার মতো ছিল। সেখানে ঈদুল আজহায় ওই অর্থের সঙ্গে আরো প্রায় ৩০-৫০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হবে। তারওপর সামনে নির্বাচন। সব মিলে এবার ঈদে দেশের অর্থনীতিতে যোগ হবে বাড়তি প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা।

ঈদ অর্থনীতিতে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহের বিভিন্ন উৎসের কথা জানিয়েছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, স্বাভাবিকের তুলনায় এবার বেশি সংখ্যক কোরবানির পশু কেনাবেচা হবে। পশুর চামড়ার সংখ্যাও বাড়বে। ফ্রিজসহ আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র কিনবে মানুষ। কোরবানি ঈদ কেন্দ্র করে মসলা, পরিবহন, কসাই বা মাংস কাটাকাটি করার লোকজন, কামার-কুমার সম্প্রদায়ের হাতেও অর্থের সমাগম ঘটবে। ঈদে যুক্ত হয়েছে পর্যটন বা ভ্রমণ ও বিনোদন ব্যয়। এ ছাড়া কোরবানি ঈদের সময় রেমিট্যান্সের প্রবাহ বেড়ে ওঠে। আগস্টে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে দেশে। যুক্ত হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী এবং বিভিন্ন খাতের শ্রমিকদের ঈদ বোনাস, যা গ্রামীণ ও শহরের অর্থনীতিতে বাড়তি গতি এনে দেবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ঈদ ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বিস্তৃতি ঘটায় শহর ও গ্রামে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঈদের অর্থনীতির আকার যা-ই হোক না কেন, দেশের ভেতরে এর মূল্য সংযোজন কতটুকু সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পণ্যই এ উপলক্ষে আমদানি হয়ে আসে। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভোগ্যপণ্যের চাহিদায়ও বৈচিত্র্য এসেছে।

‘তবে এবার ঈদ উৎসবের সঙ্গে যোগ হচ্ছে আসন্ন নির্বাচন’ উল্লেখ করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রার্থীরা চাইবেন এলাকায় তাদের ভাবমূর্তি বাড়াতে। রোজার ঈদের সময় তারা নিজ নিজ এলাকায় যাকাত দিয়েছেন। এবার ভোটারদের কথা মাথায় রেখে কোরবানিকে বেছে নিয়েছে। এলাকায় নিজস্ব লোকজন ও নিম্নবিত্তদের মধ্যে কোরবানির মাংসসহ অন্যান্য উপহার সামগ্রীও বিতরণ করবেন। এতে এবার পশুর চাহিদাও বাড়বে। চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়তে পারে। সব মিলে সামষ্টিক অর্থনীতি বেশ চাঙা হবে বলেই ধারণা এই অর্থনীতিবিদের।

এবার কোরবানি ঈদে মূলত নির্বাচনী আমেজ থাকবে—মত অর্থনীতিবিদদের। তারা বলছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রথম সারির নেতারা নির্বাচনী ঈদকে ঘিরে কী পরিমাণ টাকা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় নিয়ে গেছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে তা আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকার কম নয়। তাদের হিসেবে, ৩০০ আসনের মধ্যে কমপক্ষে ২০০ আসনে গড়ে দুইজন করে ৪০০ বিত্তশালী রাজনীতিবিদ রয়েছেন। যারা এবারের ঈদকে ঘিরে দান-খয়রাত-বকশিশ ও শুভেচ্ছা উপহার দেওয়ার মধ্য দিয়ে এলাকায় নিজের শক্তিশালী অবস্থান গড়ে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। আবার তাদের পক্ষে ঘনিষ্ঠজন ও বিশেষ সুযোগ-সুবিধাভোগীরাও অনেকে গোপনে-প্রকাশ্যে বিপুল টাকা খরচ করছেন। এককথায় নির্বাচনী ঈদকে ঘিরে গ্রামে টাকার প্রবাহ সাধারণ সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, এ বছর দেশে এক কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। চাহিদা সর্বোচ্চ ১ কোটি ১০ লাখ। গত বছর কোরবানিতে জবাই হয়েছিল ১ কোটি চার লাখ ২২ হাজার পশু। সরকারি হিসাবে এবার বেশি রয়েছে ৬ লাখ ২৭ হাজার পশু। ধারণা করা হচ্ছে, সামনে নির্বাচন থাকায় এবার পশু কোরবানির সংখ্যা বাড়তে পারে। সে হিসাবে ৫-১০ শতাংশ পশু বেশি জবাই হতে পারে। তবে বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কোরবানির বেশিরভাগ গরুর দাম প্রায় লাখ টাকা ছুঁই-ছুঁই করলেও প্রতিটি গরুর গড় মূল্য ৫০ হাজার টাকা। খাসির গড় মূল্য ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ধরা হয়। সে হিসাবে গরু, ছাগল ও ভেড়াসহ পশুর বাজার দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকায়। এর বাইরে কোরবানির পশুর ইজারা, পশুর খাবার, রাখালসহ অন্যন্য অনুষঙ্গও রয়েছে।

চামড়া ব্যবসায়ীদের মতে, প্রতিবছর দেশে দেড় কোটিরও বেশি পশুর চামড়া পাওয়া যায়। এর বড় অংশই আসে কোরবানির পশু থেকে। এ খাতের মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা। কোরবানি ঈদের বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। ‘তবে এবার চামড়ার বাজার একেবারেই মন্দা যাবে’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ফিনিস্ড লেদার এন্ড লেদার গুডস এন্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি টিপু সুলতান বলেন, কেননা চামড়ার মূল্য গতবারের চেয়েও কমেছে। এবার প্রায় ১০ শতাংশ কম নির্ধারিত হয়েছে চামড়ার মূল্য’- বলে জানিয়েছেন ।

জানা গেছে, প্রতিবছর দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২২ লাখ মেট্রিক টন, রসুনের চাহিদা ৫ লাখ মেট্রিক টন ও আদা ৩ লাখ টন। এর উল্লেখযোগ্য অংশই কোরবানিতে ব্যবহার হয়। গরম মসলা বিশেষ করে এলাচি, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা, তেজপাতারও উল্লেখযোগ্য অংশ কোরবানিতে ব্যবহার হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, গত অর্থবছরে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এলাচি, ৭ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন দারুচিনি, ১৭০ মেট্রিক টন লবঙ্গ এবং ৩৭০ মেট্রিক টন জিরা আমদানি হয়। এবার কোরবানির বাজারে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হবে এসব পণ্যের।

কোরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হলো কামারদের তৈরি উপকরণ ছুরি, বঁটি, দা, চাপাতি, কুড়াল, রামদা। ঈদকে ঘিরে ফ্রিজের চাহিদা বাড়ে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। তাদের হিসেবে, কোরবানি ঈদে প্রায় ৭ লাখ ফ্রিজ বিক্রি হয়। এ সময় মাংস রাখার জন্য সাধারণত বড় আকারের ফ্রিজই বেশি বিক্রি হয়। এর মধ্যে প্রতিটি ফ্রিজের গড় মূল্য ৩০ হাজার টাকা হিসেবেও এ সময় ফ্রিজের বাজার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার।

এবারের ঈদ সামনে রেখে টাকার প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক সূত্রমতে, ঈদকে সামনে রেখে গত বছর প্রবাসীরা রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল ১৩১ কোটি ডলার। প্রতি ডলার ৮৪ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ১১ হাজার কোটি টাকা। এ বছর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। কেবল আগস্টেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় এসেছে দেশে।

তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য মতে, এ শিল্পে ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এসব শ্রমিকের ৯৫ শতাংশই গ্রাম থেকে আসা। যার ৭০ শতাংশই ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যান। তাই কয়েক মাস আগ থেকেই তারা টাকা জমাতে থাকেন ঈদের জন্য। এর সঙ্গে বেতন-বোনাসের পুরো অর্থই খরচ হয় ঈদকে ঘিরে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই এক সমীক্ষায় বলেছে, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত যাচ্ছে ৬০০ কোটি টাকা। এ উৎসবে ভ্রমণ ও বিনোদন বাবদ ব্যয় হয় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব খাতে নিয়মিত প্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত যোগ হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরো কয়েকটি খাতের কর্মকান্ড অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সাড়ে ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সম্ভাব্য বোনাস বাবদ প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। দেশব্যাপী ৬০ লাখ দোকান কর্মচারীর বোনাস ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। পোশাক ও বস্ত্র খাতের ৭০ লাখ শ্রমিকের সম্ভাব্য বোনাস ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ঈদকে ঘিরে এরইমধ্যে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রামে আর্থিক লেনদেনও প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এসব অর্থ ঈদ অর্থনীতিতে বাড়তি যোগ হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল