ঢাকায় ভাড়া আকাশচুম্বী

দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছেই না বাড়িওয়ালাদের

২৫ বছরে ভাড়া বেড়েছে ৪ থেকে ৭ গুণ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৮, ১৫:৫২ | আপডেট : ১৮ জুলাই ২০১৮, ১৬:০৬

নিজস্ব প্রতিবেদক

ড্রইং, ডাইনিং একসঙ্গেই। বেডরুমও মাত্র একটি। তার ওপরে সেঁতসেঁতে পুরনো দেয়াল। এই ফ্ল্যাটের জন্যই মাস শেষে বাড়িওয়ালাকে দিতে হয় ১৬ হাজার টাকা। আবার পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল তো রয়েছেই। আবার সরুগলি আর সামান্য বৃষ্টিতে হয় কোমর পানি। তবুও আকাশচুম্বী বাড়িভাড়ায় নিরুপায় ভাড়াটিয়ারা।

এত অভিযোগ যেন গায়ে মাখারই সময় নেই বাড়িওয়ালাদের। তাদের দৌরাত্ম্যও বন্ধ হচ্ছে না কোনো কিছুতেই। তাছাড়া ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়, যখন তখন ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া আর বাড়ি ছাড়ার হুমকি, সব মিলিয়ে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে ভাড়াটিয়াদের জীবন।

আইনজীবীরা বলছেন, আদালতের নির্দেশনার পরও দীর্ঘদিনেও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠন না হওয়ায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সুরাহাও হচ্ছে না ভাড়াটিয়া-বাড়িওয়ালা বিরোধের। তবে বাড়িওয়ালাদের দৌরাত্ম্য বন্ধে এলাকাভেদে ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে মনিটরিং কমিটি গঠনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

তবে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক জানিয়েছেন, কোনো ভাড়াটিয়া সংক্ষুব্ধ হলে তার প্রতিকার প্রাপ্তির সুব্যবস্থা আছে। এ আইনের আশ্রয় নেওয়া গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সাড়ে ৩ হাজার মামলা আদালতে বিচারাধীন আছে এবং ওই বছরে ৫৬৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে টেবিলে উত্থাপিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রশ্নের লিখিত জবাবে এ তথ্য জানান তিনি।

এদিকে রাজধানীর সব এলাকাতেই বাসাভাড়া বাড়ছে। নগরের মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, কাঁঠালবাগান, গ্রিন রোড, ধানমন্ডি, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, বংশাল, গুলশান, বনানী, উত্তরা, আগারগাঁও, শ্যামলী, মগবাজার, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকার ৩০ জন ভাড়াটের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে প্রতি বছরই বাড়ির মালিক ভাড়া বাড়ান। গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বৃদ্ধির হার প্রায় দ্বিগুণ। বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দামের এই হিসাব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।

ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৯৯০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল ২ হাজার ৯৪২ টাকা। ২০১৫ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ১৫০ টাকা। গত বছর এই ভাড়া এসে ঠেকেছে ২১ হাজার ৩৪০ টাকায়। ২০০৬ সাল থেকে গত ১০ বছরে ভাড়া বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে ২০০০-২০১০ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে নগরায়ণের গতি ছিল বেশি। এ ছাড়া ২০১০ সালে ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ লোক শহরে বসবাস করে। বাড়িভাড়া বাড়ার আরো একটি কারণ হচ্ছে লোকজন নানা কারণে ঢাকামুখী। যে কারণে চাহিদা এ জোগানের মধ্যে কোনো সামঞ্জস্য নেই। নতুন ফ্ল্যাটে গ্যাস বা বিদ্যুৎ নেই। ফলে পুরনো বাড়িগুলোতেই ওঠে মানুষ। রিহাবের তথ্য অনুসারে এখন ঢাকায় প্রায় ১৫ হাজার ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে।

বাড়িভাড়া নিয়ে যেসব অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের কয়েকটি মহল্লা ঘুরে দেখা গেল তার বাস্তব উদাহরণ। এক ভাড়াটিয়া বলেন, ৭০০ স্কয়ার ফিটের বাসা এখন ১৫ হাজারের নিচে ভাড়া পাওয়া যায় না।’ অপর একজন বলেন, ‘বাড়িওয়ালা আমাদের কোনো কথাই শোনে না। তারা বলেন, পারলে থাক না হলে যাও।’

গুলশান, বারিধারা, ধানমন্ডি কিংবা লালমাটিয়া। ন্যূনতম ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা মাসিক আয় না হলে এসব এলাকায় থাকা এখন অনেকটা স্বপ্নের মতো। রাজধানীর মহানগর প্রকল্প কিংবা বনশ্রীও পিছিয়ে নেই কোনো অংশে।

বাড়িভাড়ার নামে ভাড়াটিয়াদের ওপর এক ধরনের যে নির্যাতন চলছে তার চিত্র অনেকটাই ফুটে উঠে রামপুরা এলাকায়। নানা বিড়ম্বনা থাকলেও মাস শেষে গুনতে হয় বড় অংকের টাকা। ভাড়াটিয়ারা বলছেন, কর্মস্থল কিংবা সন্তানদের স্কুল কলেজের কারণে সুবিধাজনক এলাকায় বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের। আর সেই সুযোগেই ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে নিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা।

ফার্মগেট এলাকার এক বাড়িওয়ালা বলেন, ‘ভাড়ার বিষয়টি যারা বেশি বলছেন, তারা আসলে ভুল বলছেন। ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়েই আছে।’

আইনের কার্যকারিতা না থাকাকেই বাড়িভাড়া বিরোধের অন্যতম কারণ বলছেন আইনজীবীরা। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন বলছে, এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে প্রয়োজন আইনের আরো সহজীকরণ।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘এ ব্যাপারে সরকার বা সংসদ কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না। বাড়িভাড়া আইনটা এক ধরনের অকার্যকর হয়ে আছে। এজন্য আমরা বিকল্প পথে কিছু নির্দেশনা চেয়েছি।’

পিডিএসও/তাজ