বিলুপ্তির পথে দেশীয় মাছ

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৮, ১৬:৫৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

একসময় দেশি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ গ্রাম-গঞ্জের হাটবাজারে মিলত প্রচুর। এখন আর সেসব মাছ খুব দেখা যায় না। জেলেদের জালেও ধরা পড়ে খুব কম। দেশীয় এসব মাছের মধ্যে রয়েছে— কৈ, মাগুর, শিং, পাবদা, টেংরা, পুঁটি, ডারকা, মলা, ঢেলা, চেলা, শাল চোপরা, শোল, বোয়াল, আইড়, ভ্যাদা, বুড়াল, বাইম, খলিসা, ফলি, চিংড়ি, মালান্দা, খরকাটি, গজার, শবেদা, চেং, টাকি, চিতল, গতা, পোয়া, বালিয়া, উপর চকুয়া, কাকিলা, গুত্তুম, গজার বৌরানীসহ প্রায় ৫০টিরও বেশি মিঠা পানির বিভিন্ন ধরনের মাছ।

এসব মাছ কমে যাওয়ার পেছনে অন্তত ১৪টি কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। গ্রামবাংলায় পৌষ-মাঘ মাসে পুকুর, খাল, ডোবা, ঘেরের পানি কমতে থাকলে দেশি মাছ ধরার ধুম পড়ে যেত। এখন সেসব দেখা যায় না। বর্ষাকালে ধানের জমিতে কইয়া জাল, বড়শি ও চাঁই পেতে মাছ ধরার রীতিও হারিয়ে গেছে অনেক এলাকা থেকে। যারা একসময় পুকুর, খাল-বিল, ডোবা, নালায় মাছ ধরে পরিবারের চাহিদা পূরণ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বাজার থেকে চাষের মাছ কিনে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশীয় মাছ ক্রমশ হারিয়ে যাওয়ার জন্য অনেকগুলো কারণই দায়ী।

এরমধ্যে মধ্যে জলবায়ুর প্রভাব, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, কারেন্ট জালের অবৈধ ব্যবহার, ফসলি জমিতে অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহার, জলাশয় দূষণ, নদ-নদীর নব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ নির্মাণ, নদী সংশ্লিষ্ট খাল-বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, ডোবা ও জলাশয় ভরাট করা, মা মাছের আবাসস্থলের অভাব, ডিম ছাড়ার আগেই মা মাছ ধরে ফেলা, ডোবা-নালা-পুকুর-বিল ছেঁকে মাছ ধরা, বিদেশি রাক্ষুসে মাছের চাষ ও মাছের প্রজননে ব্যাঘাত ঘটানো। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই ১৪টি কারণে ৫০ টির বেশি দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যেতে বসেছে।

মৎস্য অধিদফতরের সূত্র বলছে, হারিয়ে যাওয়া দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যা আড়াই শ-এর বেশি। হাটবাজার, পুকুর, খাল, বিল কোথায়ও এখন আর মিঠাপানির সুস্বাদু সেসব মাছ মিলছে না। দেশি মাছের বদলে এখন বাজারে জায়গা দখল করে নিয়েছে চাষের পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, ক্রস ও কার্প জাতীয় মাছ।

রাজধানীর বাসাবো বাজারের মাছ ব্যবসায়ী ময়মনসিংহের বাসিন্দা আবদুল মজিদ বলেন, ‘১৫-১৬ বছর আগেও আমাদের এলাকায় মাছ কিনে খাওয়ার তেমন রেওয়াজ ছিল না। এখন নদী-বিল ও খালে মাছ নেই। মানুষ চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল।

এ প্রসঙ্গে শেরপুরের বাদগৈড় গ্রামের মৎস্য খামারি ফারুক বলেন, এ সময় গ্রামের মানুষরা পারিবারিক প্রয়োজনে মাছ ধরত। শোল, গজার, টাকি, চিংড়ি, শিং, কই, টেংরা, পাবদা, ফলিসহ বিভিন্ন জাতের মাছ ধরা পড়ত। এখন সেব মাছ নেই। বাজারেও মিলে না।

মৎস্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যে মাছগুলো হারিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ রক্ষায় গবেষণা চলছে। পাবদা, টেংরা, বোয়াল, আইড় মাছ এখন চাষ হচ্ছে। পাঙ্গাসের চাষ হচ্ছে আগে থেকেই। কৈ মাছেরও চাষ হচ্ছে। আরো গবেষণা হবে। দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষায় মৎস্য অধিদফতর প্রতিবছরই মৎস্য মেলার আয়োজন করে। একই কর্মসূচি জেলা, উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদের অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণেই দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রকৃতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে মানুষের সচেতনতার অভাবও রয়েছে। হারিয়ে যাওয়া দেশি মাছ রক্ষায় ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এখন পাবদা, টেংরা, বোয়াল, আইড়, পাঙ্গাস, কৈ ও শিং-মাগুর মাছের চাষ হচ্ছে।’

পিডিএসও/তাজ