ওয়াসার প্রকল্প

পদ্মার পানি মেটাবে ঢাকার চাহিদা

প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০১৮, ১০:৪৪

নিজস্ব প্রতিবেদক

আবারও মুন্সীগঞ্জ থেকে পানি এনে রাজধানী ঢাকার চাহিদা মেটানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির অধীনে মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার যশলদিয়া এলাকার পদ্মা নদী থেকে পানি পরিশোধন করে রাজধানীতে আনা হবে। এ লক্ষ্যে সরকার একটি পৃথক প্রকল্প হাতে নিয়েছে; যা সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে। ওয়াসা সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এর আগে ২০০৯ সালে ঢাকায় পানির চাহিদা মেটাতে মুন্সীগঞ্জ থেকে পানি এনেছিল সরকার। ওই সময় ঢাকায় পানির চাহিদা ছিল ২১২ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা পেত মাত্র ৮৮ কোটি লিটার। ২০১৫ সালে ২২০-২২৫ কোটি লিটার পানির সংস্থান করেছে ওয়াসা। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর পানিও ঢাকা ওয়াসায় যুক্ত করেছিল সরকার।

ওয়াসা সূত্র জানায়, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে প্রতি বছর এর স্তর ২ থেকে ৩ মিটার নিচে নেমে যায়। এর ফলে শুধু পরিবেশের জন্য নয়, ভবিষ্যতে খাবার পানির জন্যও হুমকি। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে ভূপৃষ্ঠস্থ পানি ব্যবহারের লক্ষ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার (৪৫০ এমএলডি) পরিশোধিত পানি ঢাকায় সরবরাহ করা হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ‘পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার নির্মাণ (ফেস-১) (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প নামের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সরকারের মোট ব্যয় হবে ৩ হাজার ৬৭০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে ১ হাজার ২৪৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে ২২ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য বাবদ বরাদ্দ দেওয়া হবে ২ হাজার ৪০৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রকল্প সহায়তা দেবে চায়না এক্সিম ব্যাংক (চীন)। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা) প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ৩০ জনের মধ্যে বাস্তবায়ন করবে।

ওয়াসা জানায়, বর্তমানে ঢাকা মহানগরীতে দৈনিক ২৩৫ কোটি লিটার পানির চাহিদার বিপরীতে ২৩৫ কোটি লিটার সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে ৭৮ শতাংশ এবং সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট থেকে বাকি ২২ শতাংশ চাহিদার জোগান দিচ্ছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠস্থ উৎস থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি ঢাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পটির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ‘চায়না এক্সিম ব্যাংক’ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে ইআরডির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রকল্পের আওতায় কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য চায়না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএএমই ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে নিযুক্ত করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজটি বাস্তবায়নের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার একটি চুক্তিও সম্পাদিত হয়।

ঢাকা ওয়াসার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী কাজটি বাস্তবায়নের সময়সীমা ৪২ মাস, যা ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের কমিশনিং, টেস্টিং, ডিফেক্ট লাইবিলিটি পিরিয়ড ধরে প্রকল্পের সংশোধনসহ আগামী ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় বাড়ানোর প্রয়োজন হবে বিধায় স্থানীয় সরকার বিভাগ প্রকল্পটির দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানায়, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হলো ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার খাবার পানি উৎপন্ন করে ঢাকা মহানগরীতে সরবরাহ করা।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার ক্ষমতাসম্পন্ন পানি শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। ইনটেক প্লান্ট, ট্রান্সমিশন পাইপলাইন ইত্যাদির ড্রয়িং ডিজাইন, সাপ্লাই অ্যান্ড ইনস্টলেশন, যানবাহন কেনা ও সরবরাহ কার্যক্রমও বাস্তবায়িত হবে এ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০৪ একর জমি অধিগ্রহণ করে তা উন্নয়ন করা হবে বলেও জানায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্র।

কয়েক মাস আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ের কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন। ৩ জুলাই একনেকে অনুমোদন হওয়া প্রকল্পটি দ্বিতীয় সংশোধনী প্রকল্প। ওইবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁও থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার যশলদিয়ায় ‘পদ্মা পানি শোধনাগার’-এর প্রথম পর্বের কাজের উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছিলেন, যশলদিয়ায় এখন যেটা নির্মিত হচ্ছে, সেটা প্রথম পর্যায়। এরপর দ্বিতীয় পর্যায়টি নির্মাণ করা হবে। দ্বিতীয় পর্যায়টি নির্মিত হলে আরো ৪৫ কোটি লিটার পানি পাওয়া যাবে।

ওয়াসার সূত্র বলছে, এই বছরের মার্চের শেষ দিকে রাজধানীতে প্রতিদিন পানির গড় চাহিদা ছিল ২৩৬ কোটি লিটার। এখন ঢাকায় পানির চাহিদা দাঁড়িয়েছে ২৪৫ কোটি লিটার। রাজধানীতে ওয়াসার বর্তমানে ৭৮০টি পানির পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে চালু রয়েছে ৭৩৮টি। আর বাকি ৩৩টি স্ট্যান্ড বাই রয়েছে। বাকি নয়টি পাম্প অকার্যকর।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকায় পানির সংকট থাকবে না। বিশেষ করে খাবার পানির সংকট দূর হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। কাজেই রাজধানীবাসী অচিরেই এর সুবিধা পাবে।’

পিডিএসও/তাজ