পাবনায় বাদাম চাষে কৃষক পরিবারে স্বচ্ছলতা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ১৭:০৭

খালেকুজ্জামান পান্নু, পাবনা

লাভজনক হওয়ায় পাবনার চাষিরা চিনাবাদাম চাষে ঝুঁকেছেন। পাবনা জেলায় পদ্মা ও যমুনার বুকে জেগে ওঠা বেলে-দোআঁশ মাটির বিশাল চর রয়েছে। এসব চর বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাবনা জেলার অনেক চাষি চিনাবাদাম আবাদ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা এনেছেন।

পাবনার বেড়া উপজেলার পেঁচাকোলা যমুনা নদী পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, অনেক কৃষক পরিবারের ছোট-বড় সদস্যরা মনের আনন্দে গাছ থেকে চিনা বাদাম সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাবনার চরাঞ্চলের মাটি বাদাম চাষের জন্য খুবই উপযোগী। দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে বাদাম চাষ। গেলো বছর রবি মৌসুমে জেলায় ১ হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমিতে বাদাম চাষ হয়েছে। এ বছর রবি মৌসুমে জেলায় পাঁচ উপজেলায় এক হাজার ৫৫৪ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল। কিন্তু লক্ষমাত্রার চেয়ে ৩১৭ হেক্টর জমিতে বেশি অর্থাৎ এক হাজার ৮৭১ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি চিনাবাদাম আবাদ হয়েছে বেড়া উপজেলায় এক হাজার ১৫৫ হেক্টর জমিতে। এছাড়া পাবনা সদর উপজেলায় ২০০ হেক্টর, সুজানগরে ৩৫০ হেক্টর,  ঈশ্বরদীতে ১৫ হেক্টর, সাঁথিয়া উপজেলায় ১০ হেক্টর জমিতে বাদাম আবাদ হয়েছে। 

বাদাম চাষিরা জানান, প্রতিবছর আগাম বণ্যায় চরের নিন্মাঞ্চলের বাদাম ক্ষেত তলিয়ে যায়। সেজন্য আগুর জাতের বাদাম রোপন করা হয়। যাতে বণ্যার পানি আসার আগেই ক্ষেত থেকে বাদাম তোলা যায়। সাধারণত আষাঢ় মাসের মধ্যেই বাদাম তোলা শেষ হয়ে যায়। বেড়া উপজেলার ঢালারচর, কল্যাণপুর এলাকার বেশ কয়েকজন বাদাম চাষি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে চিনাবাদাম চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন। 

পাবনার বেড়া উপজেলার চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, এবছর বাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। সম্প্রতি উজানের ঢলে যমুনার চরের নিন্ম এলাকার বেশ কিছু বাদামের ক্ষেত পানিতে ডুবে যায়। কৃষকেরা জমি থেকে বাদাম তুলছেন। কৃষাণি ও কিশোর-কিশোরীরা গাছ থেকে বাদাম ছাড়িয়ে স্তুপ করে রাখছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র চাষিরা জমি থেকে বাদাম হাটে নিয়ে বিক্রি করছেন। জোতদার ও বিত্তবান চাষিরা বাদাম শুকিয়ে গোলাজাত করে রাখছেন। এছাড়া অফ সিজনে বেশি দামে বিক্রির আশায় অনেক ব্যবসায়ী বাদাম কিনে মজুত (বাধাই) করছেন। 

বেড়া উপজেলার নাকালিয়া ও নগরবাড়ীতে চরাঞ্চলের বাদামকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বাদাম বিক্রির পাইকারি মোকাম এবং বাদাম কারখানা। প্রতিদিন চরের কৃষকরা নৌকায় করে নাকালিয়া ও নগরবাড়ী মোকামে বাদাম বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। বাদাম বিক্রি করে তারা সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী কিনে নিয়ে যান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা বাদাম কেনার জন্য এই মোকামে আসেন। বাদাম কেনা-বেচার জন্য দু’টি মোকাম ২০-২২টি আড়ত গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা স্থানীয় আড়তদারের মাধ্যমে বাদাম কিনে এখান থেকে নিজ নিজ গন্তব্যে নিয়ে যান। আবার কিছু কিছু বড় ব্যবসায়ী বাদাম কিনে মেশিনে খোসা ছাড়িয়ে নিচ্ছেন। পরে সেই বাদামের দানা সেখান থেকে সরাসরি প্রাণ, আকিজ, স্কয়ারসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে।

চরনাগদার কৃষক আহেদ আলী প্রামানিক জানান, তিনি এ বছর দুই একর (ছয় বিঘা) জমিতে বাদাম আবাদ করেছিলেন। বীজ বপনের পর চৈত্র মাসে বৃষ্টি হওয়ায় বাদামের বাম্পার ফলন পেয়েছেন। ছয় বিঘা জমির বাদাম তুলে পাওয়া গেছে ১৪০ মন। রোদে শুকানোর পর তিনি পেয়েছেন মোট ৭০ মন। গত বছর একই পরিমান জমিতে বাদাম উৎপাদন হয়েছিল ১৩০ মন। অন্যান্য ফসল আবাদের চেয়ে বাদাম আবাদে পরিশ্রম ও খরচ অনেক কম পড়ে। তার ছয় বিঘা জমি হালচাষে দুই হাজার টাকা, বাদাম বীজ আট হাজার টাকা, শ্রমিক এক হাজার ২০০ টাকা, কীট নাশক এক হাজার টাকা, জমি থেকে বাদাম তোলা বাবদ প্রতি মন ১০০ টাকা হিসেবে ১৪ হাজার টাকা, পরিবহন খরচ এক হাজার ৩০০ টাকা মোট খরচ পরে সাড়ে ২৭ হাজার টাকা। এবছর চরের চাষিরা বাদাম বিক্রি করে বেশ লাভবান হচ্ছেন বলে তিনি জানান।

শুধু কৃষক আহেদ আলী নয়, চরপেঁচাকোলার কৃষক আকবর আলী, সোনা মিয়া, চরঢালার আক্কাছ আলী, সাগর সরকার, গহের প্রামানিকসহ বিভিন্ন চরের শতাধিক কৃষকের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, এ বছর বাদামের আশাতীত ফলন হয়েছে। হাট-বাজারে মানভেদে প্রতিমন বাদাম দুই হাজার থেকে দুই হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত বছর প্রতিমন বাদাম বিক্রি হয়েছে এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দরে। এবছর বাদামের দাম বেশি হওয়ায় চাষিরা বেশ লাভবান হচ্ছেন।

পাবনার নগরবাড়ীর আড়তদার আব্দুর রাজ্জাক জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাদাম ব্যবসায়ীরা তার আড়তে বাদাম কিনতে আসেন। তিনি তাদের বাদাম কিনে দেন। অনেক সময় পরিচিত ব্যপারীদের বাকিতে বাদাম দিতে হয়। তারা সময় মতো পাওনা টাকা পরিষোধ করেন। বাকিতে বাদাম বিক্রি করে তাকে কোনও অসুবিধায় পড়তে হয়নি।

অপরদিকে জেলার সুজানগর উপজেলায় চিনাবাদামের বাম্পার ফলন হয়েছে। হাট-বাজারে চিনাবাদামের দাম বেশি পাওয়ায় চরাঞ্চলে কৃষকদের খুশি ও মুখে আনন্দের হাসি দেখা গেছে। 

এসব এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় সুজানগর উপজেলার ভায়না, সাতবাড়ীয়া, মানিকহাট, নাজিরগঞ্জ ও সাগরকান্দী ইউনিয়নে রয়েছে পদ্মার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চাল। এসব চরাঞ্চলের জমিতে ধান-পাট ও অন্য ফসল তেমন ভালো হয় না, এ কারণে কৃষকরা বেশিরভাগ সময় এ সকল জমিতে ধান-পাট আবাদ করে লোকসানে পড়েন। এ জন্য তারা লোকসান থেকে বাঁচতে এ বছর উপজেলা কৃষি বিভাগের পরার্মশে সকল ইউনিয়নের পদ্মার চরাঞ্চলের বেশিরভাগ জমিতে চিনাবাদম আবাদ করেছে।

এসব চরাঞ্চল থেকে অনেক কষ্টে নৌকা, ঘোড়ার ও গরুর গাড়িতে করে চিনাবাদাম কৃষকের বাড়ীতে আনতে হয়, এরপর চিনাবাদামের গাছ থেকে বাদাম সংগ্রহ করে রদ্রুতে শুকিয়ে বাজারজাত করতে হয়। উপজেলার শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের কৃষক জুয়েল মৃধা জানান, তিনি এ বছর ৫ বিঘা জমিতে ঢাকা-১ জাতের বাদাম আবাদ করেছেন, প্রতি বিঘা জমিতে ফলন হয় গড়ে প্রায় ১০ মণ । উপজেলার ভায়না গ্রামের কৃষক আব্দুর রউফ জানান, প্রতি বিঘা জমিতে চিনাবাদাম আবাদ করতে সার, বীজ ও শ্রমিকসহ উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা, বর্তমান বাজার মূল্যে প্রতি বিঘা জমিতে উৎপাদিত চিনাবাদামের মূল্য প্রায় ২১/২২ হাজার টাকা যা, উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ১৬/১৭ হাজার টাকার বেশি।

ফলে চিনাবাদাম চাষিরা বর্তমানে বাজারে ভাল দাম পেয়ে ভীষণ খুশি, এ কারণে কৃষানীরা মনের আনন্দে চিনাবাদাম গাছ থেকে চিনাবাদাম সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করায় ব্যস্ত সময় পাড় করছেন।

উপজেলা কৃষি অফিসার ময়নুল হক সরকার জানান, এ বছর এ চারটি ইউনিয়নে ৬‘শ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম আবাদের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এসময় আবহওয়া অনুকূলে থাকায় আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৫০ হেক্টর বেশি জমিতে। অর্থৎ মোট সাড়ে ৬‘শ হেক্টর জমিতে চিনাবাদম আবাদ করা হয়। অনুকূলে আবহওয়া আর সঠিক সময়ে সার বিষ দেওয়ায় সর্বত্র চিনাবাদামের ফলন ভালো হয়েছে।

পাবনা কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক বিভূতি ভূষণ সরকার বলেন, পাবনা জেলার চরাঞ্চলের বেলে-দোআঁশ মাটি বাদাম চাষের উপযোগী। লাভজনক হওয়ায় বাদাম চাষ প্রতিবছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বছর বাদামের আবাদ ও উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। অনুকুল আবহাওয়া এবং সময়মতো বৃষ্টি হওয়ায় এ বছর পাবনা অঞ্চলে বাদামের বাম্পার ফলন এবং দাঁনা পুষ্ট হয়েছে। 

পিডিএসও/রিহাব