বিশ্লেষকদের অভিমত

ভারসাম্য রক্ষার কৌশলী বাজেট

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৮, ০৮:১০ | আপডেট : ১০ জুন ২০১৮, ১১:৫৮

প্রতীক ইজাজ

নানামুখী আলোচনা চলছে প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে। দেশের সার্বিক অর্থনীতির বিচারে এ বাজেট কতটুকু উচ্চাভিলাষী ও যুক্তিযুক্ত, সে আলোচনা যেমন হচ্ছে; তেমনি বিশাল অঙ্কের বৃহৎ এ বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জগুলো কি, সে নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ৪ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট শেষপর্যন্ত সংশোধিত বাজেটে কি আকার নেয় সেদিকেও তাকিয়ে সবাই। কেননা বিদায়ী অর্থবছরে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকার বাজেট পুরোটা বাস্তবায়ন করতে না পারায় অর্থমন্ত্রী মাঝপথে সংশোধন করে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকায়।

এ ছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে কোন শ্রেণির মানুষ বেশি লাভবান হলো, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ঠিক কতটা বাড়বে, নাকি স্থিতাবস্থায় রয়ে যাবে—এমন ভাবনাও পেয়ে বসেছে মানুষকে। অর্থমন্ত্রীর আশা অনুুযায়ী, দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিস্থিতি তৈরিতে এই বাজেট কতটুকু সফল হবে, সে অঙ্ক কষতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। আবার প্রস্তাবিত বাজেটে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা ঘাটতি অর্থায়নে সে সব উৎস ও বিশাল ব্যয় নির্বাহে যে রাজস্ব আয়ের কথা ভাবা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সার্বিক পরিস্থিতি তা পূরণে ঠিক কতটুকু সহায়ক হবে- সেটার ওপরও নির্ভর করছে বাজেট বাস্তবায়ন বাস্তবতা।

বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে হওয়ায় বাজেটে এবার রাজনৈতিক রং লেগেছে। আগে থেকেই বলা হচ্ছিল নির্বাচনী ভোটার সন্তুষ্টির বাজেট। অবশ্য অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত নিজেও বাজেটকে নির্বাচনী বাজেট বলে অভিহিত করেছেন। বাজেট উত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, আমার প্রতিটি বাজেটই নির্বাচনী বাজেট। আমি একটি দলের (আওয়ামী লীগ) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সে হিসেবে আমার বাজেট নির্বাচনী বাজেটই হবে। আমি এমন বাজেট দেই, যেটা মানুষ পছন্দ করবে। তিনি এমনও বলেন, আগেই বলেছিলাম নতুন কর আরোপ করা হবে না, এবারের বাজেটে সেটাই করা হয়েছে। কিন্তু সেই নির্বাচনী বাজেটের মাধ্যমে সরকার সাধারণ ভোটারদের ঠিক কতটুকু সন্তুষ্ট করতে পারল—সে প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থনীতিবিদরা প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেটকে সরকারের ভারসাম্য রক্ষার বিশেষ কৌশলী বাজেট বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, সরকার খুব কৌশলে কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে একটি ভারসাম্য রক্ষার বাজেট দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই বাজেটের মধ্য দিয়ে সবপক্ষকে খুশি করতে চেয়েছে। ফলে নতুন করে কোনো কর আরোপ করা হয়নি, বরং করের আওতা বাড়ানোর প্রয়াস আছে; তেমনি সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে উপকারভোগীদের ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এমনকি সর্বজনীন পেনশনের রূপরেখাসহ বেশকিছু সংস্কারের পথে হেঁটে সবার নজরও কেড়েছে সরকার।

‘তবে নির্বাচন সামনে থাকায় এবারের বাজেটে মোটাদাগে কোনো পরিবর্তন লক্ষ করা যায়নি’—এমন মত অর্থনীতিবিদদের। তারা বলেন, সরকার কোনো বিতর্ক তৈরি করতে চায়নি। বহুল সমালোচিত ব্যাংক খাত সংস্কারের কমিশন গঠনের কথাও অস্বীকার করেননি। বরং তা পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে যাওয়ার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। সে অর্থে প্রস্তাবিত বাজেট জনতুষ্টিমূলক বলা চলে। নির্বাচনের বছরে এমনটা কাম্য বলেও মত তাদের।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর অধ্যাপক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, হয়তো নির্বাচন সামনে বলেই সরকার সাদামাটা বাজেট দিয়েছে। বিশেষ কৌশল নিয়েছে। নতুন করে কোনো কর আরোপ হয়নি; এটা ভালো। এমনকি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে করপোরেট কর কমানো হয়েছে। এতে সুদের হার কমে যাবে। এতে দেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাবে ব্যবসায়ীরা। কিন্তু এর মাধ্যমে ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, সরকার যে উদ্দেশে এবার বাজেট প্রণয়ন করেছে, সেখানে সফল। কারণ সাধারণ ভোটাররা কর দেয় না। নতুন করও আরোপ করা হয়নি। ফলে আপাতত পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দেখছি না। এতে সাধারণ মানুষ খুশি হবে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, সামনে নির্বাচন বলেই এবার বাজেটে কর বসানোর ক্ষেত্রে সতর্ক ছিল সরকার। সেটি আগেই বলেছিলেন অর্থমন্ত্রী। সে অর্থে ব্যক্তিগত কর থেকে করপোরেট কর প্রায় অপরিবর্তিত থাকছে। এই প্রস্তাবনা ব্যক্তি পর্যায় ও ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য সুখবর বলা যেতে পারে। তবে ঘাটতি পূরণে অর্থায়ন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এই ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক উৎস থেকে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা (জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ) এবং অভ্যন্তরীণ উৎস হতে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা (জিডিপির ২ দশমিক ৮ শতাংশ) সংগ্রহ করা হবে। নিশ্চিত করে এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২০১৮-১৯ অর্থ বছরে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন খাতে। এরপরই রয়েছে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ, যা খুবই ইতিবাচক। এবারের বাজেটের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তির প্রতি বিশেষ ছাড় দেওয়ার প্রবণতা। এগুলো নিঃসন্দেহে আমদানিনির্ভর প্রবণতা থেকে বের হয়ে এসে দেশে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

বিশেষ করে সমালোচিত ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার নিয়ে সরকার বাজেটে সুচিন্তিত প্রস্তাব করেছে বলে মত বিশ্লেষকদের। এ ব্যাপারে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, মূলত পরিচালনায় বিশৃঙ্খলা দেখা দেওয়ায় দেশের আর্থিক খাত সংকটে পড়ে। তাই এ খাতে শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রস্তাবিত বাজেটে প্রচলিত আইন সংস্কারের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা জারির কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, যা ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে আমাদের কাছে। তবে তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতে প্রকৃত বাস্তবায়নের ওপর।

সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ খাতে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে সরকার খুবই সদয় মনোভাব পোষণ করেছে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, এ খাতে ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার আওতা বেড়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত ভাতার বাইরে বৈশাখী ও বিজয় ভাতা নামে দুটি বিশেষ ভাতা যুক্ত করার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে ১০ লাখ। মাতৃত্বকালীন এবং দুগ্ধদানকারী গরিব কর্মজীবী মায়েদের ভাতা ৩০০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা করার নির্দেশনার পাশাপাশি সেবা না দিলে অতিরিক্ত করারোপের ঘোষণা এসেছে। দেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য রয়েছে বিশেষ বরাদ্দ। মরণব্যাধি ক্যানসারের ওষুধের দাম কমছে। এই প্রস্তাবনা সাধারণ মানুষকে খুশি করবে।

অর্থনীতিবিদরা এমনও বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ৪৬ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে মানুষের জীবনমানের গুণগত উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর ব্যাপারে অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাব নতুন আশার সঞ্চার করেছে সাধারণ মানুষের মনে। বেসরকারি চাকরিজীবীরাও পেনশন পাবেন—এমন সিদ্ধান্তও সুখবর। তবে পেনশন ব্যবস্থায় সংস্কার আনতে হলে গণকর্মচারী (অবসর) আইন, ১৯৭৪ এবং এ বিষয়ে যে বিধি আছে, তা সংশোধন করতে হবে এবং একটি পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

প্রস্তাবিত বাজেট উচ্চাভিলাষী নয় বলে মত দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। তিনি বলেন, এটা উচ্চাভিলাষী বাজেট নয়। মানুষ বাড়ছে, অর্থনীতির আকার বাড়ছে। সেখানে রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা বাড়বে—এটা স্বাভাবিক। এখন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, মন্ত্রণালয়গুলো বাজেট গৃহীত হওয়ার পরদিন থেকে খরচ করতে পারবে। এমনটা হলে বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু এর জন্য প্রশাসনকে গণমুখী ও উন্নয়নমুখী করতে হবে। গত বছর প্রচেষ্টার পরও ৮০ থেকে ৮২ শতাংশের বেশি ব্যয় সম্ভব হয়নি। এখন পদক্ষেপগুলো নিলে বাস্তবায়ন উল্লেখযোগ্য হারে পূরণ হওয়া সম্ভব। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। ৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। সেদিকে লক্ষ রেখে বলতে পারি, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। একইভাবে নির্ধারিত মূল্যস্ফীতির পরিমাণ ৫ দশমিক ৬ ধরে রাখা গেলে ভালো।

পিডিএসও/হেলাল