আশাজাগানিয়া বাজেট

প্রকাশ : ০৮ জুন ২০১৮, ০৮:৩২ | আপডেট : ০৮ জুন ২০১৮, ১২:৩৭

শাহ্জাহান সাজু

বিশাল ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে জনগণের জন্য আশাজাগানিয়া বাজেট দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ আগামীর পথে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন সামনে রেখে ভোটের বছরে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এই বাজেট বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২৫ শতাংশ এবং মূল বাজেটের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেশি।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে জাতীয় সংসদে এই বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। তার আগে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ওই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ঘাটতির এই পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। অবশ্য বাজেটে চার হাজার ৫১ কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার আশার কথা বলেছেন মুহিত। ওই অনুদান পাওয়া গেলে ঘাটতি থাকবে এক লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ঘাটতি মেটাতে সরকারকে দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ১ লাখ ২১ হাজার ২৪২ কোটি টাকা ঋণ নিতে হবে। ঋণের অর্থের এই পরিমাণ বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ঋণের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে চাই। কমাতে চাই বৈষম্য। তাই বিদ্যমান সরকারি পেনশন কার্যক্রমের বাইরে বেসরকারি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সব কর্মজীবী মানুষের জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করতে চাই।

অর্থমন্ত্রী স্বপ্ন দেখিয়েছেন পাটুরিয়া-গোয়ালন্দ অবস্থানে ভবিষ্যতে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিশেষ সম্মাননা ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিন। দেশের কৃষকদের উৎপাদিত চালের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আমদানিকৃত চালের ওপর করারোপের প্রস্তাব করেছেন। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতি বিভাগে একটি করে ‘মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়’ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। প্রস্তাব করেছেন ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধ ও দেশে উৎপাদিত ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট বা এপিআই কাঁচামালের শুল্ক রেয়াত সুবিধা প্রদানের। স্কুলশিক্ষার্থীদের যাতায়াতে বাস আমদানি হলে তাতে শুল্কে ছাড় দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।

অর্থমন্ত্রী তার রেকর্ড গড়া বাজেট বক্তৃতায় উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা আদায়ে নানা কৌশলের কথা। করের আওতা বাড়ানোসহ বিভিন্ন খাতকে উৎসে করের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। একইভাবে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের শ্লথ গতি কাটাতে নানা ধরনের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেছেন এবারের বাজেটে। ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি মনোযোগ দিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নতুন বাজেটে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করেছেন।

প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরের বাজেটে যা ছিল ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংক ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৭ থাকবে বলে ধারণা দিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা। বিদায়ী অর্থবছরের মূল বাজেটে জিডিপির আকার ধরা হয়েছিল ২২ লাখ ২৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৮ কোটি টাকায়। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির গড়হার ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, চলতি অর্থবছরের বাজেটে যা রয়েছে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দেশের মোট জিডিপির ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। গত বছর প্রস্তাবিত বাজেট ছিল জিডিপিরি ১৮ শতাংশ।

গতকাল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সরকারের এই মেয়াদের শেষ বাজেট উপস্থাপনা শুরু করেন গত ৯ বছরের অর্থনৈতিক সাফল্যের মাল্টিমিডিয়া প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে। টানা ১০ বার বাজেট উপস্থাপন অর্থমন্ত্রীর জন্য একটি নতুন রেকর্ড। তবে সব মিলিয়ে তিনি বাজেট দিলেন ১২ বার।

বাজেট পরিসংখ্যান : প্রস্তাবিত ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার এই বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। এই উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা যাবে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি)। আর অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা, যা বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত অনুন্নয়ন বাজেটের চেয়ে ৩৪ শতাংশ বেশি। এই বিশাল ব্যয়ের প্রায় ৭৩ শতাংশ অর্থই রাজস্ব খাত থেকে আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেট ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা থাকলেও সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে করা হয় ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ। তার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে কর হিসেবে ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা আহরণ করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। যা জিডিপির ১১ দশমিক ৭ শতাংশ ।

রাজস্ব প্রাপ্তির মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, আমি বিশ্বাস করি, রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত। কারণ, ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনবল ও কর্মপদ্ধতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা হয়েছে।

বাজেটের সামগ্রিক ঘাটতি কাটাতে অর্থমন্ত্রী পরিকল্পনা করেছেন, এবার বৈদেশিক উৎস থেকে ৬০ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হবে। সেখান থেকে ১০ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা আগের ঋণের কিস্তি পরিশোধে খরচ হবে। ফলে সরকারের নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫০ হাজার ১৬ কোটি টাকা।

ঘাটতির বাকি ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা নেওয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এর মধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে হবে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি তিন হাজার কোটি টাকা অন্যান্য উৎস থেকে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মূল বাজেটে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছিল ৪৬ হাজার ৪২০ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৪১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।

এ অর্থবছরের মূল বাজেটে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৬০ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা নিয়ে ঘাটতি মেটানোর কথা বলা হয়েছিল। সংশোধিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৬৬ হাজার ১৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। মূল বাজেটে ব্যাংক থেকে ২৮ হাজার ২০৩ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা নেওয়ার লক্ষ্য ছিল। তবে অর্থবছর জুড়ে বেশি হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে এ খাত থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৯১৭ কোটি টাকা নেওয়ার কথা বলা হয়েছ সংশোধিত বাজেটে।

চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছিল এক লাখ ১২ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা, সংশোধিত বাজেটে তা সামান্য কমিয়ে এক লাখ ১২ হাজার ৪১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়।

* মোট ব্যয় : ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা

* মোট আয় : ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি

* ঘাটতি : ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি

* জিডিপির আকার : ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি

* জিডিপির প্রবৃদ্ধি : ৭ দশমিক ৮ শতাংশ

* মূল্যস্ফীতি : ৫ দশমিক ৬ শতাংশ

* অনুন্নয়ন ব্যয় : ২ লাখ ৯১ হাজার ৫৭৩ কোটি

* এডিপি : ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি

* এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্বপ্রাপ্তি : ২ লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি

পিডিএসও/হেলাল