নির্বাচনের বছরে জনবান্ধব বাজেট

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৮, ০৮:১৪ | আপডেট : ২৭ মে ২০১৮, ১২:২০

শাহ্জাহান সাজু

প্রণীত হতে যাওয়া ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে জনতুষ্টিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে তুষ্ট করতে বাজেটে বেশকিছু খাত যেমন নতুন করে সংযুক্ত হচ্ছে; তেমনি সরাসরি জনসম্পৃক্ত খাতগুলোতে বরাদ্দও বাড়ানো হচ্ছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থাসহ বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা থাকছে এবারের বাজেটে। এছাড়া নতুন ১১ লাখ দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা যেমন বাড়ছে; তেমনি ছাড় দেওয়া হচ্ছে করপোরেট করেও। এমনকি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বৃত্ত ভাঙার পরিকল্পনাও থাকছে আসন্ন বাজেটে।

এমনকি জনগণের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হতে পারে—এমন কোনো কর বা ভ্যাট পলিসি নিচ্ছে না সরকার। বরং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া কোম্পানির কর হারেও পরিবর্তন আসছে। কোম্পানির কর হারে কিছুটা ছাড় দেওয়া হতে পারে।

আগামী ৭ জুন ঘোষণা হতে যাওয়া বাজেটকে অর্থনীতিবিদরা ‘জনতুষ্টির বাজেট’ হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, ঠিক ছয় মাস পরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেজন্য জনগণের মধ্যে বিরূপ প্রভাব বা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়—এমন কিছু সরকার এবারের বাজেটে রাখবে না। যাতে নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। সেজন্যই এবারের বাজেটে ভোটার তুষ্টি করার বিষয়টি থাকছে। তবে এর ফলে সাধারণ মানুষ লাভবানও হবে। ঠিকমতো রাজস্ব আয় হলে এমন বাজেটও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

আসছে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের পরিমাণ চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হতে পারে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা, যা চলতি (২০১৭-১৮) অর্থবছরের চেয়ে ১৮ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি।

নতুন অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরের ১ লাখ ৮০ হাজার ৮৬৯ কোটি ১৭ লাখ টাকার এডিপির মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি, বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৬০ হাজার কোটি এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল থেকে ৭ হাজার ৮৬৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, আসন্ন বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা বিদ্যমান আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা করা হচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বলেছেন, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যথেষ্ট বেড়ে গেছে। এ কারণে করমুক্ত আয়সীমা বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। একইভাবে করপোরেট কর হার কমানো হবে বলেও সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থনীতিবিষয়ক রিপোর্টারদের সংগঠন ইআরএফের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন। এমনকি ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির বৃত্ত ভাঙার পর এবার ৭ শতাংশের বৃত্ত ভাঙার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। আসন্ন বাজেটের মাধ্যমে বৃত্ত ভেঙে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বেসরকারি খাতে সবাই যেন পেনশন পান সেজন্য বাজেটে প্রস্তাবিত সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতির খসড়া কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।

আসছে বাজেটের লক্ষ্য থাকছে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনসহ জিনিসপত্র বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্বপ্নের পদ্মা সেতুসহ অন্যান্য মেগা প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে নতুন বাজেটে থাকবে বিশেষ পদক্ষেপ। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় বাড়াতে থাকছে নানা কর্মসূচি। বাজেটে প্রায় নতুন করে ১১ লাখ দরিদ্র মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

সূত্র মতে, আগামী বাজেটে সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের মতো বেসরকারি খাতে চাকরিজীবীরা মাসিক পেনশন সুবিধা পাবেন। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবিত খসড়া কাঠামোতে সুবিধাভোগীর আওতা ব্যাপক বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়ায় বেসরকারি খাতের প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক সব চাকরিজীবীকে এর আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়াও দরিদ্র মানুষ যারা নিয়মিত আয় করেন তারা যেন সুবিধা পেতে পারেন সে ব্যবস্থাও থাকছে সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায়। অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার যে উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ তবে বাস্তবায়ন করা চ্যালেঞ্জি হবে বলে মনে করছেন তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বর্তমানে সরকারি খাতে চাকরিজীবী প্রায় ১৫ লাখ, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ ভাগ। তারা সবাই পেনশন সুবিধা পান। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ৯৫ শতাংশের মধ্যে মাত্র আট ভাগ আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই।

এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, সার্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগটি ভালো। তাছাড়া পৃথিবীর অনেক দেশেই এটি প্রবর্তন করা হয়েছে। এতে বেসরকারি পেনশনভোগীরা উপকৃত হবেন। এটি বাস্তবায়ন করতে গেলে বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সরকারের একটা সমঝোতায় আসতে হবে।

সূত্র জানায়, সার্বজনীন পেনশন পদ্ধতি বাস্তবায়নের কাজ ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু হতে পারে। এই ব্যবস্থা পুরোপুরি বাস্তবায়নে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগতে পারে।

সূত্র জানায়, আসন্ন বাজেটে প্রায় ১১ লাখ দরিদ্র মানুষকে নতুন করে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। এর ফলে এ কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৮৬ লাখ। পাশাপাশি বাজেটে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির টাকার পরিমাণ বাড়ানো হচ্ছে। এছাড়া বাজেটে মাতৃত্বকালীন ভাতা ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৮০০ টাকা করা হচ্ছে। পাশাপাশি কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মায়ের (শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মা) ভাতাও ৩০০ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ক্যানসার, কিডনি, স্টোক, প্যারালাইজড ও জন্মগত হৃদরোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচিতে অর্থ বাড়ানো হচ্ছে। চলতি বাজেটে এক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও আসছে বাজেটে ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।

সূত্র মতে, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৮টি খাতে ৭৫ লাখ জনগোষ্ঠীকে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আর আসছে বাজেটে দেওয়া হবে প্রায় ৮৬ লাখ দরিদ্র মানুষকে। অর্থাৎ প্রায় ১১ লাখ মানুষ যোগ হচ্ছে এই কর্মসূচির আওতায়।

সূত্র আরো জানায়, সারা দেশে বর্তমান বয়স্কভাতা কর্মসূচির আওতায় ৩৫ লাখ উপকারভোগী রয়েছে। আগামী বাজেটে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ৪০ লাখে। বিধবা ও দুস্থ মহিলা ভাতার আওতায় ১২ লাখ ৬৫ হাজার জন ভাতা পাচ্ছেন। নতুন বাজেটে এ কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পাবেন ১৪ লাখ মহিলা। অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার অধীনে আসন্ন বাজেটে ৮ লাখ ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখে উন্নীত করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমান ৩০ হাজার চা শ্রমিক জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ভাতা পাচ্ছেন। নতুন বাজেটে আরো ১০ হাজার বাড়িয়ে ৪০ হাজার করা হচ্ছে। মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছে ৬ লাখ মা। নতুন বাজেটে এ ভাতা দেওয়া হবে ৭ লাখ মাকে। এছাড়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, হিজড়া, বেদে ও অনগ্রসর গোষ্ঠীর ভাতাও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

পিডিএসও/হেলাল