বিদ্যুৎ নিয়ে মেগা পরিকল্পনা

প্রকাশ : ২০ মে ২০১৮, ০৮:০৫ | আপডেট : ২০ মে ২০১৮, ১২:৩৮

গাজী শাহনেওয়াজ

আর্থিক খাতের অব্যাহত উন্নয়ন ও ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিদ্যুৎ খাতে মেগা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এই পরিকল্পনাকে বলা হচ্ছে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টারপ্ল্যান (পিএসএমপি)। ঘোষিত মেগা পরিকল্পনাতে ২০৪১ সাল নাগাদ বিদ্যুতের চাহিদার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮২ হাজার ২৯২ মেগাওয়াট।

এর আগে এই সময়কালের মধ্যে এ লক্ষ্য ছিল ৬১ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। তবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হওয়ায় এই চাহিদা বেড়েছে প্রায় বিশ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমানে মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন ঘণ্টায় ৪৩৩ কিলোওয়াট আর ২০৪১ সালে তা বেড়ে হবে প্রায় ২৪০০ কিলোওয়াট। বর্তমানে মাথাপিছু ব্যবহার ৩৯০ কিলোওয়াট আর ২০৪১ সালে এটি বেড়ে দাঁড়াবে ঘণ্টায় ২১৫০ কিলোওয়াট।

নতুন বিদ্যুতের এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হবে ২১৬ বিলিয়ন ডলার; যার মধ্যে উৎপাদনে ১৫০ বিলিয়ন ডলার, সঞ্চালন খাতে ৩১ বিলিয়ন ডলার এবং বিতরণ খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জন করায় মানুষের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই নতুন এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

বিদ্যুতের নতুন মেগা প্রকল্পের একটি প্রতিবেদন সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় উত্থাপন করা হয়। জাইকার তৈরি করা এই প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোঃ তাজুল ইসলাম এমপি এ প্রসঙ্গে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে বিদ্যুৎ খাতকে একটি সম্মানজনক স্থানে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদের রেখে যাওয়া বিদ্যুৎ খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রাপ্তে নিয়ে যায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদ্যুতের একটি মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। সেখানে ২০৪১ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ৬১ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। তার নেতৃত্বে এই সরকারের সঠিক পথ পরিচালনায় বাংলাদেশে এ বছর এলডিসি থেকে বেরিয়ে এসে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হয়েছে। তাই বঙ্গবন্ধুকন্যা মানুষের চাহিদা এবং বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে এ সেক্টরে সংস্কার এনে নতুন করে বিদ্যুতের মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়াবে ৮২ হাজার ২৯২ মেগাওয়াট।

এদিকে উন্নয়নের এই গতি অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্রে অর্থাৎ উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হবে বাংলাদেশ। এতে ছয়টি খাতে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে; চাহিদার অনুষঙ্গের মধ্যে দরিদ্র ও অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার হ্রাস, নতুন নতুন এলাকা বিদ্যুতায়ন, জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান বৃদ্ধি, নতুন ইকোনমিক জোন সৃষ্টি, মেট্রোরেলের প্রবর্তন এবং নতুন কর্মসংস্থানের ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

চাহিদা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে ১৩২৬০ মেগাওয়াট (জিডিপির ১৪ শতাংশ), ২০২০ সালে ১৭০১৫ মেগাওয়াট (১৩ শতাংশ), ২০২১ সালে ১৯০৩৪ মেগাওয়াট (১২ শতাংশ), ২০২৫ সালে ২৮২৩১ মেগাওয়াট (১০ শতাংশ), ২০৩০ সালে ৪১৮৯০ মেগাওয়াট (৮ শতাংশ), ২০৩৫ সালে ৫৯২৭৫ মেগাওয়াট (৭ শতাংশ) এবং ২০৪১ সালে ৮২২৯২ মেগাওয়াট (জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ)।

বিদ্যুতের চাহিদা উৎপাদন এবং রিজার্ভ মার্জিন-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, ২০২২ সালে রিজার্ভ মার্জিন হবে সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশ এবং ২০৪১ সালে এসে তা ১৪ শতাংশে দাঁড়াবে। তাই বিদ্যুৎ পর্যালোচনা কমিটি অর্থনৈতিক ও কারিগরি দিক বিবেচনা করে রিজার্ভ মার্জিন ২০-২৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করেছে।

মেগা প্রকল্পে সঞ্চালন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় দেখানো হয়েছে, ২০৪১ সালে মোট গ্রিডের উপকেন্দ্রের সংখ্যা হবে ৫৬২টি ও ক্ষমতা হবে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৪০৬ এমভি এবং সঞ্চালন লাইন হবে ৩৬ হাজার ৮৭০ কিলোমিটার। এই পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ডেস্প্যাচ ক্ষমতার পরিমাণ হয় বিদ্যুৎ বিতরণ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩৩ কেভি ডেস্প্যাচ ক্ষমতা ২০৪১ সালে দাঁড়াবে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৭৩৫ এমভিএ (১৩৮৩৬২ মেগাওয়াট)।

এদিকে, বর্তমানে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন ৪৩৪ হাজার কিলোমিটার এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইনের পরিমাণ দাঁড়াবে (৩৩ কেভি) ১১০০ হাজার কিলোমিটার। এ ছাড়া বর্তমানে বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৮৭ লাখ এবং প্রায় ৯০ শতাংশ জনগণ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায়। আগামী ২০২১ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধাভোগী হবে, যা জাইকার প্রণীত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পিডিএসও/হেলাল