মাতারবাড়িতে ‘এক্সিলেন্স’

এলএনজি যুগে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৫:৪৪

নিজস্ব প্রতিবেদক ও চট্টগ্রাম ব্যুরো

দেশে ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদা মেটাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির প্রথম চালান নিয়ে কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়িতে ভিড়েছে বিশেষায়িত জাহাজ ‘এক্সিলেন্স’। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ২টায় মাতারবাড়ি উপকূল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে জাহাজটি নোঙর করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এত বড় জাহাজ আগে আসেনি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। আর এর মধ্য দিয়ে এলএনজি যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।

সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এই গ্যাস যুক্ত করা সম্ভব হবে জাতীয় গ্রিডে। প্রাথমিকভাবে এই গ্যাস চট্টগ্রাম এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সারকারখানা ও অর্থনৈতিক জোনগুলোতে দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে প্রাকৃতিক গ্যাসের সঙ্গে মিশ্রণ হয়ে সারা দেশে পৌঁছে যাবে।

জাহাজের স্থানীয় এজেন্ট সিকম শিপিং লাইনসলিমিটেড সূত্রে জানা যায়, আমেরিকান কোম্পানির জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের কাতার থেকে এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। বিশেষায়িত এই জাহাজে করে আনা হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার তরল গ্যাস। জাহাজটি ২৭৭ মিটার লম্বা এবং ৪৪ মিটার প্রস্থ। এর ড্রাফট ১২ দশমিক ৫ মিটার।

‘এক্সিলেন্স’ জাহাজটি ব্যবহৃত হবে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) হিসেবে। জাহাজটি উপকূল থেকে দূরে অবস্থান করবে ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে। ১৫ বছর বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি জাহাজ ভাড়া পাবে। এরপর এটি বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় চলে আসবে।

জাহাজটির এ দেশীয় শিপিং এজেন্ট সিকম শিপিং লাইন্স লিমিটেডের পরিচালক জহুর আহমেদ বলেন, ‘এক্সিলেন্স’ জাহাজটিতে এলএনজিকে সমুদ্রের পানির উষ্ণতা ব্যবহার করে আবার প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করা হবে। এরপর পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামসহ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে। মে কিংবা জুন মাসে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে কাতার থেকে আমদানি করা এই গ্যাস।

প্রসঙ্গত, দেশে গ্যাসের সংকট মোকাবিলায় ২০১০ সালে অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। আমদানি করা তরল গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে প্রথমে ভাসমান গ্যাস টার্মিনালে আনা এবং পরে প্রক্রিয়াজাত করে সিএনজিতে রূপান্তরিত করে সারাদেশে সরবরাহের পরিকল্পনা করে সরকার। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারার মধ্য দিয়ে নিয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। বর্তমানে প্রকল্পটির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালির টার্মিনাল থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শেষ। এক্সিলারেটর এনার্জি বাংলাদেশ লিমিটেডের (ইইবিএল) মাধ্যমে বাস্তবায়িত ভাসমান টার্মিনাল থেকে এই গ্যাস গরম করে প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তরিত করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হবে। কাতার ছাড়াও ওমান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও জি-টু-জি ভিত্তিতে এবং স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এক্সিলারেট এনার্জি ছাড়াও দেশীয় কোম্পানি সামিট এলএনজি টার্মিনাল কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে চলতি বছরের মধ্যে আরো ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হবে জাতীয় গ্রিডে। এ ছাড়া কুতুবদিয়া ও পায়রাতে আরো এক বা একাধিক স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র।

জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় গ্রিডে এলএনজি যুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেট্রোবাংলার আওতাধীন গ্যাস বিতরণ কোম্পানির মধ্যে তিতাস, কর্ণফুলী, বাখরাবাদ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির দুই হাজার ৩৯০টি নতুন শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। সরকার ধাপে ধাপে মে মাস থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যে অনুমোদিত এই দুই হাজার ৩৯০টি শিল্পকারখানায় নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেবে।

ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, এই মুহূর্তে দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও আমদানিকৃত এলএনজি দিয়ে প্রাথমিকভাবে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সংযোগ করা হবে। ২০১৮ সালের চাহিদা মোতাবেক গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলে দেশে প্রায় ১০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং জিডিপি বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি সরকার ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন এবং মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ সব ক্ষেত্রে এ গ্যাস সরবরাহ নতুন মাত্রা যোগ করবে।

পিডিএসও/তাজ