আসন্ন বাজেটেই সোনা আমদানির নীতিমালা

খসড়া চূড়ান্ত করতে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ০৯:২৬ | আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০১৮, ১১:০৪

শাহ্জাহান সাজু

আসন্ন বাজেটে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে আগেকার জটিলতা পরিহার করে একটি সোনা আমদানি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শুধু ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো এলসির মাধ্যমে দেশে সোনা আমদানি করতে পারবে—এ ধরনের বিধান রেখে ওই নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যে নীতিমালায় সোনা আমদানি আগের চেয়ে সহজ ও সুবিধাজনক হবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ব্যবসায়ীরা বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানিতে উৎসাহিত হবেন, পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব খাতে জমা পড়বে বড় অঙ্কের অর্থ। সব কিছু ঠিক থাকলে আসন্ন ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটেই সোনা আমদানি-সংক্রান্ত নীতিমালা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সোনা আমদানি নীতিমালার খসড়া চূড়ান্ত করতে ইতোমধ্যেই নয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরই মধ্যে কমিটির একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সোনা আমদানি নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে, চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘জুয়েলারি আবহমান বাংলার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ থাকলেও প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাবে এ পর্যন্ত এই শিল্পের তেমন বিকাশ হয়নি। তাই জুয়েলারি শিল্পকে ব্যবসাবান্ধব করার লক্ষ্যে স্বর্ণ আমদানির জন্য সময়োচিত ও বাস্তবসম্মত একটি নীতিমালা প্রণয়নের জন্য এই সেক্টরের ব্যবসায়ী সমিতি বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। এ সকল প্রস্তাব পর্যালোচনা করে আমরা স্থির করেছি সংশ্লিষ্ট সকল দফতরের সঙ্গে আলোচনা করে স্বর্ণ আমদানি এবং জুয়েলারি শিল্পের জন্য একটি যুগোপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে, যাতে এদেশে জুয়েলারি শিল্প বিকাশ লাভ করতে পারে।’ এখন সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ চলছে। যা বাজেট ঘোষণার আগে চূড়ান্ত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, জুয়েলারি শিল্প ব্যবসাবান্ধব করার লক্ষ্যে স্বর্ণ আমদানির জন্য সময়োচিত ও বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি পরিস্থিতি পত্র দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এখন এলসির মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়ার যে আবশ্যকতা রয়েছে, সেটি তাদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে শিথিল করা হয়েছে। পরিস্থিতি পত্রে আরো বলা হয়েছে, শুধু ভ্যাট নিবন্ধিত জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানই উপরে উল্লিখিত প্রস্তাবের আওতায় ‘স্বর্ণবার’ আমদানি করতে পারবে বলে বিধান করা যেতে পারে। এছাড়া মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক আইন বাস্তবায়ন হলে স্বর্ণ আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর আরোপিত হবে। বিধায় তার ওপর প্রয়োজনে স্পেসিফিক ডিউটি প্রত্যাহার করা যেতে পারে। এ অবস্থায় অর্থমন্ত্রী নোট দেন যে, ‘শুধু জুয়েলারি সমিতিই তাদের মতামত জানিয়েছে। আমি চাই, স্বর্ণ রৌপ্য আমদানি নিয়মিত কায়দায় চলবে। ব্যাগেজ রুলের আওতায় বা বাংলাদেশ ব্যাংকের ছাড়পত্র নিয়ে হবে না। শুধু এলসির মাধ্যমেই আমদানি হবে এবং ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানই তা করতে পারবে। নিয়মিত হারে মূসক আদায় হবে এবং আমদানিকারকরা রিফান্ড পাবেন এবং এবারের বাজেট প্রস্তাবেই এই নীতিমালা গ্রহণ করা হবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে সোনা আমদানিতে বাধা নেই। নিয়ম মেনে যেকোনো দেশ থেকে যে কেউ, যেকোনো পরিমাণে স্বর্ণ আমদানি করতে পারেন। কারণ আমদানি নীতিমালার ২৬-এর ২২ ধারায় সোনা, রুপা আমদানিকে উন্মুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৪৭’-এর শর্ত পূরণ করেও বিদেশ থেকে সোনা ও রুপা আমদানি করা যায়। এ ব্যবসার ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) নিবন্ধন নম্বর থাকলেই বৈধভাবে ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে মোট মূল্যের চার শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করে দেশে স্বর্ণ আমদানি করার বিধান রয়েছে। অমসৃণ হীরাও রফতানির উদ্দেশে আমদানির সুযোগ রয়েছে ব্যবসায়ীদের। এর বাইরে ব্যাগেজ রুলের আওতায় নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ আনার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশের কোনো ব্যবসায়ী সোনা আমদানি করেছেন—এমন নজির নেই। সোনা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বৈধপথে সোনা আমদানি করতে গেলে নানা ধরনের জটিলতায় পড়তে হয়। যেমন—সোনা ব্যবসায় বিনিয়োগের উৎস জানাতে হয়। তা কোথায়, কিভাবে বিক্রি করা হবে, তার নিশ্চয়তা দিতে হয়। এছাড়া আমদানি করতে হলে টাকা বিনিয়োগ করে ১৫ থেকে ২০ দিন অপেক্ষা করতে হয়। এতে শুধু সময় অপচয়ই নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম ওঠানামা করলে মুনাফার ঝুঁকি থাকে। এসব কারণে বাণিজ্যিক উদ্দেশে বৈধ প্রক্রিয়ায় স্বর্ণ আমদানিতে উৎসাহ দেখান না তারা। স্বর্ণ আমদানি করতে চাইলে প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তি নিতে হয়। তারপর আমদানি-রফতানি নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের ইমপোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (আইআরসি) সংগ্রহ করতে হয়। এরপর যেতে হয় কোনো ব্যাংকে এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার জন্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি ছাড়া কোনো ব্যাংকই এলসি খোলে না। কারণ, এলসি খোলার সময় যখন ব্যাংকে হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খুলতে হয় তখনই উল্লেখ করতে হয় আমদানি করা স্বর্ণ আসবে কিভাবে বা কোন পথে। এক্ষেত্রে আবার ইন্স্যুরেন্স করতে হয়। স্বর্ণ কোন বাহনে বা পরিবহনে আনা হবে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিতে হয়। এর নিরাপত্তা কে বা কিভাবে দেবে ইত্যাদি। সরকারি ওইসব সেবা পাওয়ার পথগুলো জটিলতাপূর্ণ হওয়ায় বৈধ পথে সোনা আমদানি করতে আগ্রহী হন না ব্যবসায়ীরা। এজন্য সহজ ও একটি যুগোপযোগী ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের দীর্ঘদিনের দাবি বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস)। এ বিষয়ে ভরিপ্রতি স্বর্ণের আমদানি শুল্ক ৩ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৫০০ টাকা করা, আমদানি স্বর্ণে আরোপিত অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (এটিভি) মওকুফ, ব্যাংকিং জটিলতা নিরসন করে এলসির মাধ্যমে স্বর্ণ আমদানি সহজ করা, গোল্ড এক্সচেঞ্জ বা গোল্ড ব্যাংক করাসহ মোট ১০ দফা দাবি রয়েছে সোনা ব্যবসায়ীদের।

সূত্র জানায়, দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশ থেকে একশ্রেণির চোরাকারবারি চোরা-চালানের মাধ্যমে এদেশে সোনা এনে সেগুলো বাজারে বিক্রি করছে। এতে সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, তিন কারণে অবৈধ পথে দেশে সোনা আমদানি হচ্ছে। সোনা আমদানি করতে হলে যে পরিমাণ কর পরিশোধ করতে হয়, সেটি ফাঁকি দিতে কেউ কেউ অবৈধ পথে সোনা আমদানি করছেন। আবার অপরাধ সংগঠিত করার জন্যও অবৈধ পথে চোরাচালানি হয়ে থাকে। কারণ, অপরাধ সংগঠনের জন্য যে টাকার প্রয়োজন হয়, সেই টাকা বৈধভাবে দেওয়ার সুযোগ নেই।

পিডিএসও/হেলাল