পুরনো বিমান, যান্ত্রিক ত্রুটি, শিডিউল বিপর্যয়

বেসরকারি বিমান খাত : দেখার কেউ নেই

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ১০:৪২ | আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৮, ১১:৪৫

প্রতীক ইজাজ

গতকাল নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের ইউএস বাংলার যে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে অর্ধশত মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে; সেই বিমানটি ১৭ বছরের পুরনো। বোম্বাইডার ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনচালিত এই বিমানটি রানওয়ের বদলে এয়ারপোর্টের একটি ফুটবল মাঠে আছড়ে পড়ে। সঙ্গে সঙ্গেই সেটিতে আগুন ধরে যায়।

ধারণা করা হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মহাপরিচালক সঞ্জীব গৌতমের মতে, বিমানটি যখন রানওয়েতে নামার চেষ্টা করছিল তখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। রানওয়ের দক্ষিণ দিক বিমানটিকে অবতরণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু বিমানটি নামছিল রানওয়ের উত্তর দিক থেকে। এই ভুল দিক দিয়ে নামতে গিয়েই দুর্ঘটনা ঘটে। তবে কী কারণে পাইলট বিমানবন্দর কন্ট্রোল রুমের ওই নির্দেশনা পালন করেননি তা জানা যায়নি।

এমনকি এর আগে এই বিমানটিই দেশের ভেতর আরেকবার দুর্ঘটনার মুখে পড়েছিল। ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে ঘাসের ওপর পড়ে। বিমানটি রানওয়ের এক প্রান্তে ইউটার্ন নিয়ে যখন পার্কিং বে-তে আসছিল তখন একটি চাকা আটকে যায়। সে সময় যদিও কোনো নিহতের ঘটনা ঘটেনি; কিন্তু আড়াই বছর পর সেই একই বিমানের কারণে এক মর্মন্তুদ দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হলো অর্ধশত যাত্রীকে।

বিমান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরনো বিমান দিয়ে কোনো মতে যাত্রী বহন করছিল ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ। প্রথমবার দুর্ঘটনার পর তারা নামমাত্র এক সংবাদ সম্মেলন করে দায় সারে। কিন্তু বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ বা বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ওই ঘটনার সঠিক কোনো তদন্ত করেনি। উল্টো গত চার বছরে এই বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষ অভ্যন্তরীণ রুটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি পেয়েছে।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, যশোর, সৈয়দপুর, কক্সবাজার, বরিশাল—এই সাতটি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। অভ্যন্তরীণ গন্তব্য ছাড়াও আন্তর্জাতিক রুটে তারা নেপালের কাঠমান্ডু, ভারতের কলকাতা, ওমানের মাসকাট, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, সিঙ্গাপুর এবং ব্যাঙ্কক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে দোহা ও দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে তারা। এমনকি আগামী ৩ এপ্রিল থেকে চীনের গুয়াংজুতে সপ্তাহে তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করার কথা রয়েছে এদের। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে আটটি বিমান রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মনের অভিযোগ পুরনো। সেবার মান তলানিতে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচলে শিডিউল বিপর্যয় বহুদিন ধরে চলছে। বিশেষ করে এই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র মতে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স ২০১৪ সালের ১৭ জুলাই প্রথমে যশোর-ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ এসব রুটে দৈনিক ৩২টি ফ্লাইট চলাচল করছে। এ ছাড়া সাতটি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট চালু করেছে এই এয়ারলাইন্স। উড়োজাহাজের তুলনায় রুটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফ্লাইট শিডিউল প্রায়ই বিপর্যয় ঘটছে।

বিশেষ করে বেশিরভাগ বিমানগুলোই পুরনো হওয়ায় কারিগরি ত্রুটি বেড়েছে। যাত্রী বোঝাই করে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে উড়াল দেওয়ার পর আকাশেও উড়োজাহাজে মাঝে মাঝে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি বিমানবন্দরের র‌্যাম্প থেকে যাত্রীদের উঠিয়ে ট্যাক্সিওয়ে কিংবা রানওয়েতে গিয়ে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ায় শেষপর্যন্ত পাইলট ফ্লাইট টেক-অপ (উড়াল) করার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় গত ৫ মার্চ। একইভাবে এর আগের দিন সকালে প্রায় দুই ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকা থেকে যশোরের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া একটি ফ্লাইটও যাত্রী নিয়ে আকাশে কারিগরি ত্রুটির কবলে পড়ে। ফ্লাইটটি মাঝপথ থেকে আবার ঢাকায় ফিরে আসে। সম্প্রতি ঢাকা-কলকাতা-ঢাকা রুটেও শিডিউল অনুযায়ী ফ্লাইট চলাচল করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এমনকি আরেকটি বেসরকারি সংস্থা নভো এয়ারের ফ্লাইটের শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে এই এয়ারলাইন্সটি যাত্রা শুরু করে। এর উড়োজাহাজের সংখ্যা পাঁচটি। দৈনিক পাঁচটি অভ্যন্তরীণ রুটে তাদের ১৬টি ফ্লাইট চলছে। এই এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজের ওপরও কারিগরি ত্রুটি ভর করেছে। ফলে বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট বিলম্বিত হচ্ছে।

শুধু এ দুটি বেসরকারি এয়ারলাইন্সই নয়; দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিমান খাতে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে বহু বছর ধরে। বিশেষ করে বেসরকারি বিমান খাত দেখার কেউ নেই। বেসরকারি বিমান খাতে হেলিকপ্টারের চাহিদা ও ব্যবহার যতটা বেড়েছে এর সংশ্লিষ্ট লোকবল সেভাবে বাড়েনি। হেলিকপ্টার চালনায় পাইলট ও প্রকৌশলী হিসেবে মূলত বিমানবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্তরাই নিয়োগ পেয়ে থাকেন। আর তাই প্রয়োজনের তুলনায় পাইলট ও প্রকৌশলীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। মূলত বিশেষজ্ঞরা ছয়টি সমস্যাকে বড় করে দেখছেন। এগুলো হলো— রানওয়ে, হ্যাঙ্গার, ট্যাক্সিওয়ে, নেভিগেশন, ট্রাফিক সিস্টেম ও পুরনো বিমান।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এয়ারলানইন্স বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমোডর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, একটি বিমান চলাচলের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের অনেকগুলো ফ্যাক্টর যুক্ত থাকে। এর একটিতে ঝামেলা হলে বিধ্বস্ত হতে পারে। একটি বিমান চালনার সঙ্গে বিমানের কারিগরি দিক, পাইলটের দক্ষতা ও বাইরের আবহাওয়া ঠিক থাকতে হয়। এর যেকোনো একটি ব্যত্যয় হলে দুর্ঘটনা ঘটে।

বিমান দুর্ঘটনার জন্য বেশকিছু কারণ থাকে। দেখতে হয় বিমানটির কারিগরি দিক ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হয়েছে কি না। ইঞ্জিনিয়ারিং দিক ঠিক আছে কি না। পাইলট কতটা দক্ষ ও মনোযোগী। ফ্লাইং পরিবেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঝড়ো আবহাওয়ায় পড়তে পারে। এর কোনো একটি ফ্যাক্টর যদি ঠিকমতো কাজ না করে, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে টেক অফ ও ল্যান্ডিংয়ের কয়েক মিনিট সময় খুবই স্পর্শকাতর। অধিকাংশ দুর্ঘটনা হয় এই সময়ে। বিশেষ করে বিমানগুলোর দিকে নজর দিতে হবে— উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোন দেশে তৈরি হচ্ছে, কতটা উন্নত উপকরণ ও প্রযুক্তি তাতে ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্স ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয় সর্বপ্রথম ১৯৯৬ সালে। বেসরকারি খাতে যাত্রীবাহী অ্যাভিয়েশন ব্যবসার ২০ বছরের যাত্রায় এ পর্যন্ত মোট ৯টি এয়ারলাইন্স কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পায়। তবে অপেশাদারি মনোভাব, পুরনো উড়োজাহাজ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনার পরিকল্পনা, অ্যাভিয়েশন ব্যবসায় অনভিজ্ঞতা, দুর্বল পরিচালনা, প্রতিকূল সরকারি নীতিসহ নানা প্রতিকূলতায় কৈশোর পেরুনোর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ছয়টি এয়ারলাইন্স। চালু থাকা রিজেন্ট, নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও এদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

বেসরকারি এয়ারলাইন্সের সংকট কী— জানতে চাইলে বিমান খাত বিশেষজ্ঞরা বলেন, এয়ারলাইন্সগুলো বিমান রক্ষণাবেক্ষণে খরচ করতে চায় না। পুরনো বিমান দিয়ে কোনো মতে যাত্রী বহন করে। এসব বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষের বিমান মেরামত বা সংস্কারের জন্য বিমানবন্দরে কোনো হ্যাঙ্গার নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিদেশে বিমান মেরামত করতে হয়। এমনকি উড্ডয়নের আগে ছোটখাটো সমস্যা দেখা দিলেও বিমানবন্দরে সেগুলো মেরামত করতে পারেন না।

উড়োজাহাজ আমদানি নিয়েও সমস্যা রয়েছে—জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ সিভিল অ্যাভিয়েশনের ক্ষেত্রে ২০ বছর পুরনো যাত্রীবাহী, ৩০ বছর পর্যন্ত পণ্যবাহী ও ৩৫ বছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ বিমান আমদানির অনুমতি দিয়ে একটি আদেশ জারি আছে। কিন্তু আমদানি নীতিতে বা কোনো এসআরও দ্বারা পুরনো উড়োজাহাজ আনার ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা বা প্রজ্ঞাপন নেই। ফলে জটিলতা এড়াতে বেসরকারি বিমান কর্তৃপক্ষ পুরনো বিমান দিয়েই ফ্লাইট পরিচালনা করে।

এমনকি দক্ষ পাইলট ও বিমান সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণের সুযোগ কম বলেও জানান বিশেষজ্ঞরা। তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কমার্শিয়াল পাইলট ৬০০ জন। লাইসেন্সড ইঞ্জিনিয়ার আরো কম। একাডেমিক দুর্বলতা আছে। আমাদের অ্যাভিয়েশন সেক্টরে বিশ্ববিদ্যালয় নেই। প্রশিক্ষণের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নেই। বিমানের একটি ট্রেনিং ফ্যাসিলিটি আছে, কিন্তু সেটি না থাকার মতোই।

পিডিএসও/তাজ