কনটেইনার জট কাটাতে চট্টগ্রাম বন্দরে তোড়জোড়

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ১২:৫৩

শরীফুল রুকন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বন্দর চত্বরে ৩৬ হাজার ৩৫৭ একক কনটেইনার রাখার ব্যবস্থা আছে। অথচ গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত বন্দরে ছিল ৩৮ হাজার ৪০৭ একক কনটেইনার। দুই হাজার ৫০ একক কনটেইনার অতিরিক্ত থাকার ফলে বন্দরে ব্যাহত হয় কার্যক্রম। নানা কারণে কনটেইনার জট আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চলমান এই সংকট কাটাতে তোড়জোড় শুরু করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, চট্টগ্রাম বন্দরের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকারী জার্মানির এইচপিসি হামবুর্গ পূর্বাভাসে বলছে, বন্দরে পণ্য ওঠানামা প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে সক্ষমতা ২০১৮ সালের আগেই অতিক্রম করবে। এই সময়ের মধ্যে নতুন টার্মিনাল কার্যক্রম শুরু না হলে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে। এতে সংকটে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর। এইচপিসি হামবুর্গ আরো জানিয়েছে, ২০১৮ সালে বন্দরের মোট সক্ষমতা থাকবে ২৩ লাখ ৭০ হাজার একক। একই বছর পণ্য ওঠানামা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২৩ লাখ ৯৮ হাজার একক।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামার বর্তমান ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি একটি পরিকল্পনা নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এরই অংশ হিসেবে ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে বন্দরের ভেতর কনটেইনার ডেলিভারি, পণ্য কনটেইনারে ভর্তি ও কনটেইনার থেকে নামানো এই তিনটি কাজ বন্দরের ভেতর থেকে সরিয়ে বে টার্মিনালে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বন্দরের ভেতর আমদানি ও রফতানি নামে পৃথক জোন থাকবে। আমদানি জোনে জাহাজ থেকে নামা পণ্য থাকবে, আর বেসরকারি ডিপো থেকে আসা পণ্য রফতানি জোনে থাকবে। এতে বন্দরের ভেতর কিছু খালি জায়গা হবে যেখানে দ্রুত গতিতে পণ্য ওঠানামা করা সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, বন্দরের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে জেটি-টার্মিনাল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু চলতি বছর বন্দরে নতুন জেটি বা টার্মিনাল যুক্ত হচ্ছে না। তাই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বন্দর সচল রাখার চেষ্টা চলছে।

তিনি বলেন, আমদানি ও রফতানি কনটেইনার পৃথক জোনে রাখলে দ্রুত জাহাজ আনলোড-লোড সম্ভব হবে। বে-টার্মিনালে আমরা বন্দরের কাজগুলো স্থানান্তর শুরু করব। এতে জেটি বা টার্মিনাল সংখ্যা না বাড়িয়েই আমরা এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ জাহাজ হ্যান্ডলিং করতে পারব। এই পদ্ধতির সুফল পেতে পেতেই আমরা বন্দরে নতুন টার্মিনাল ও জেটি পেয়ে যাচ্ছি।

কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, এ বছরের মধ্যেই ছয়টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন যোগ হবে বন্দরের যন্ত্রপাতির বহরে। আর দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অচল গ্যান্ট্রি ক্রেন সচল করার কাজ চলছে। আশা করছি মার্চ মাসের শেষে সেটি সচল হয়ে পণ্য ওঠানামায় যুক্ত হবে।

এদিকে, চলমান সংকটের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার হংকংয়ের পতাকাবাহী একটি জাহাজের তিন হাজার ৬৫৪ একক কনটেইনার ওঠানামা করে তাক লাগিয়েছে বার্থ অপারেটর বশির আহমেদ এন্ড কোম্পানি। চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে এটাই কোনো জাহাজের সর্বোচ্চ কনটেইনার ওঠানামা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় এজেন্ট এবং বার্থ অপারেটরের দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা অনুসারে বন্দরের যন্ত্রপাতি সরবরাহ পাওয়া ও অফডকের সহযোগিতায় প্রায় প্রতি মিনিটে এক কনটেইনার ওঠানামা সম্ভব হয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেছেন, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে গ্যান্ট্রি ক্রেন ছাড়াও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এর চেয়েও বেশি পরিমাণে কনটেইনার ওঠানামা করানো সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন জাহাজ জেটিতে ভেড়ার পর আমদানি পণ্যবোঝাই কনটেইনার খালাস করে রাখার জন্য জায়গা খালি রাখা, প্রয়োজন অনুসারে যন্ত্রপাতি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বার্থ অপারেটরের লজিস্টিক সক্ষমতা থাকা এবং অফডকের পূর্ণ সহযোগিতা থাকা। এসবের কোনো একটির ঘাটতি থাকলে দ্রুত ওঠানামার লক্ষ্য অর্জিত হবে না।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, বন্দরের সক্ষমতা একেবারেই বাড়েনি এ কথা বলা ঠিক নয়। তবে যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য এগিয়ে গেছে, সেভাবে বন্দরকে এগিয়ে নেওয়া, সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। জেটির দরকার ছিল ৬০টি। হয়েছে ৭টি। এর ফলে এখন বড় জাহাজে প্রতিদিন ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। এই টাকা বাংলাদেশ থেকেই তো যাচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়ীরা ভুক্তভোগী হলেও দিন শেষে ভোক্তাকেই এই টাকা দিতে হচ্ছে।

পিডিএসও/তাজ