রাজধানীতে হোল্ডিং নম্বর পুনর্নির্ধারণ হয় না ২৯ বছর

বছরে ৪০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে ২ সিটি

প্রকাশ : ১১ মার্চ ২০১৮, ১৩:২৯

হাসান ইমন

গত ২৯ বছর ধরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) ভবনগুলোর হোল্ডিং নম্বর পুনর্নির্ধারণ (রি-এসেসমেন্ট) হয়নি। অথচ এ সময় নগরীর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বেড়েছে নাগরিকসেবা। উন্নয়ন হয়েছে ঢাকার সামগ্রিক চিত্র। নাগরিকসেবা দিতে ব্যয়ও বেড়েছে করপোরেশনের। কেবল বাড়েনি হোল্ডিং ট্যাক্স। ট্যাক্সের তালিকায় সংযুক্ত হয়নি ট্যাক্সযোগ্য অসংখ্য ভবন। আর পুরনো ভবনের মালিকরাও ট্যাক্স দিচ্ছেন পুরনো নির্ধারিত হারেই। ফলে হোল্ডিং ট্যাক্স বাবদ বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে করপোরেশন।

করপোরেশনের এক হিসাবে দেখা গেছে, ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে রাজধানীতে হোল্ডিং ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৪ হাজারে। এসব হোল্ডিং থেকে প্রতি বছর ট্যাক্স আদায় হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। পুনর্মূল্যায়ন না হওয়ায় বছরে আরো ৪০০ কোটি টাকা আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সিটি করপোরেশন।

করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ১৯৮০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত রাজধানীর ভবনগুলোর হোল্ডিং নম্বর গণনা হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে রাজধানীতে অসংখ্য নতুন ভবন হয়েছে। জনসংখ্যা বেড়েছে। নগরীর আয়তন বেড়েছে। পুরনো একটি ভবনের জায়গায় কোথাও কোথাও উঠেছে কয়েকটি ভবন। কেবল হোল্ডিং নম্বর গণনায় পিছিয়ে সিটি করপোরেশন। হোল্ডিং পুনর্নির্ধারণ ও গণনা না হওয়ায় এখান থেকে দুই সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

সূত্র মতে, ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে পঞ্চবার্ষিকী সাধারণ মূল্যায়ন কার্যক্রম নামে কর সমতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে সে উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয়নি। গত ২৯ বছর ধরে সে নিয়ম বন্ধ। এ সময়ের মধ্যে পাঁচতলা ভবন রূপ নিয়েছে ১০-১২তলায়। একতলা ভবন বহুতল হয়েছে। ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু গৃহ কর বাড়েনি।

জানা গেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন প্রথম ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরে হোল্ডিং পুনর্মূল্যায়ন করে। ওই সময় রাজধানীতে হোল্ডিং ছিল ১ লাখ ৭৫ হাজার। কর আইনের বিধান অনুযায়ী প্রতি ৫ বছর পর পর কর ও হোল্ডি নম্বর পুনর্মূল্যায়ন করার কথা। সে হিসাবে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর ১৯৯৩-৯৪, ১৯৯৮-৯৯, ২০০৩-০৪, ২০০৮-০৯ ও ২০১৩-১৪ পাঁচ দফা সময় পেরিয়ে গেছে। এ সময়ের মধ্যে কোনো মেয়রই হোল্ডিং পুনর্মূল্যায়ন করেনি। অবশ্য কোনো কোনো মেয়র হোল্ডিংয়ের পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু জনরোষ ও ভোটে ভরাডুবির আশঙ্কায় সে উদ্যোগ থেকে পিছু হটেছেন তারা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিস্বার্থকেও প্রাধান্য দেয়ায় শেষ পর্যন্ত পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। রাজনৈতিক স্বার্থ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে তিন টার্ম পঞ্চবার্ষিকী পুনর্মূল্যায়নের নিয়মকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

করপোরেশন কর্মকর্তারা আরো জানান, হোল্ডিংয়ের মালিক আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনে প্রতি বছর যে পরিমাণ ভাড়া পান তার ১২ শতাংশ ট্যাক্স ধরা হয়। ওই ট্যাক্সকে ৩ কিস্তি করে প্রতি ৪ মাস অন্তর অন্তর পরিশোধ করার নিয়ম। দুই ডিসিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে ডিসিসির ১০টি জোনের প্রায় ১০ হাজার হোল্ডিংয়ের নামজারি করা হয়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে হোল্ডিং পৃথক হলেও নাম পৃথকীকরণ করা হয়নি। এর পেছনে সংশ্লিষ্ট একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর অবৈধ বাণিজ্য রয়েছে। এছাড়া রাজস্ব কর্মকর্তা ও সুপারভাইজারদের অবৈধ যোগসাজশে অনেক হোল্ডিংকে কর ধার্যকরণের আওতায় আনা হচ্ছে না।

করপোরেশন জানায়, সর্বশেষ গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ১৬ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশে গৃহ কর সমতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অঞ্চল-২ ও অঞ্চল-৪ এবং উত্তর সিটি করপোরেশন তার অঞ্চল-১ ও অঞ্চল-৩ এলাকায় গৃহ কর সমতায়নের কাজ শুরু করে। গত জানুয়ারিতে উত্তর সিটি করপোরেশন কাজ শেষ করে ফেলে। দক্ষিণ সিটির কর নির্ধারণের পর শুধু চিঠি পাঠানো বাকি ছিল।

দুই সিটি করপোরেশনের কর পুনর্মূল্যায়নে সংক্ষুব্ধ হয়ে গত বছরের ২২ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে একটি রিট করেন সাইফ আলম নামের এক বাড়ি মালিক। এতে কর পুনর্মূল্যায়নের ওপর স্থগিতাদেশ দেন আদালত। এরপর গত বছরের ৭ আগস্ট আদালতের আদেশে এ স্থগিতাদেশ ওঠে। এতে আবার শুরু হয় কর সমতায়নের কাজ। স্থগিতাদেশ ওঠার পর উত্তর সিটি করপোরেশন তাদের বাকি তিনটি অঞ্চলে কর নির্ধারণের কাজ শুরু করে। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশন তাদের দুটি অঞ্চলের কর নির্ধারণ সংক্রান্ত চিঠি বাসিন্দাদের কাছে পাঠানো শুরু করে।

‘কিন্তু সে উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি’—জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সম্পত্তি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্মূল্যায়ন কার্যক্রম শুরু করলে বাড়ির মালিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে বিরূপ প্রভাব পড়ে। উদ্যোগ গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। বাধ্য হয়ে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় (এলজিআরডি) মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে আবার স্থগিত করে।

কেন হোল্ডিং পুনর্নির্ধারণ হচ্ছে না—জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেন, বড় বড় ভবন মালিক বছরের পর বছর ধরে হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করেন না। গত ২৯ বছরে হোল্ডিং গণনা না হওয়ায় অগণিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালসহ বহুতল ভবনের হাজার কোটি টাকার বেশি হোল্ডিং ট্যাক্স অনাদায়ী রয়ে গেছে। বছরের পর বছর ধরে হোল্ডিং ট্যাক্স অনাদায়ী থাকার মূলে রয়েছে সিটি করপোরেশনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং একশ্রেণির কর্মকর্তার অসাধুতা। বিভক্ত হওয়ার পরও এ অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। এ কারণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রবীন্দ্র শ্রী বড়ুয়া বলেন, দীর্ঘদিন কর না বাড়ানোর কারণে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি দুটি ভবনের ট্যাক্সের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। এ পার্থক্য দূর করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে ট্যাক্স পুনর্মূল্যায়ন স্থগিত করে দেয়। পুনর্মূল্যায়ন না হওয়ায় রাজস্ব হারাচ্ছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আগের হিসাবে ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে।

পিডিএসও/হেলাল