দুনিয়া কাঁপানো মহাযজ্ঞ

প্রকাশ | ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

উপল বড়ুয়া

দেখতে দেখতে অপেক্ষার শেষ দিনটি ফুরিয়ে গেল। অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসানের পর আজ থেকে শুরু হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞ- ২১তম ফুটবল বিশ্বকাপ। এবারের টুর্নামেন্টের আয়োজক দেশ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া। পাঁচ মহাদেশের বাছাই পর্ব পার হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বের টিকিট পেয়েছে ৩১টি দেশ (স্বাগতিক রাশিয়া ছাড়া)। এই ভাগ্যবান দলগুলো আট গ্রুপে ভাগ হয়ে লড়াই করবে বিশ্বসেরার শিরোপার জন্য। পরে প্রথম রাউন্ডে পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে থাকা ১৬ দলকে নিয়ে শুরু হবে রবিন রাউন্ড। দ্বিতীয় রাউন্ডে পা ফসকালেই যে কারো কপালে জুটতে পারে ঘরে ফেরার টিকিট। এমনটা হোক তা কোনো দলই চাইবে না। তাই প্রথম থেকেই কৌশল ও সাবধানতাকে পুঁজি করে পা ফেলবে দলগুলো। অন্তত চাইবে ১৬ জুলাই লুঝনিকি স্টেডিয়ামটা আলোকিত করতে।

চার বছর পর পর বিশ্বকাপ শুরু হলে বাঙালিরা বিভক্ত হয়ে পড়ে দুই ভাগে। ফুটবল বিশ্বের দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে নিয়ে শুরু হয় কথার লড়াই। সেই লড়াইয়ে কখনো কখনো এসে হাজির হয় চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, ইতালি কিংবা নতুন পরাশক্তি স্পেনের সমর্থকরা। বাদ পড়ে না ফ্রান্স-ইংল্যান্ডের ভক্তরাও। ফুটবল এমনই এক যজ্ঞ, যেখানে ছোকরা থেকে বুড়োরাও প্রিয় দলের জয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে। বিদায়ে হয় অশ্রুসিক্ত।

এরই মধ্যে মস্কোর ফুটপাত থেকে শুরু করে আকাশচুম্বী ভবনগুলো ভরে উঠেছে ৩২টি দেশের রঙিন পতাকায়। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচটি হবে ৮০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতা সম্পন্ন লুঝনিকি স্টেডিয়ামে। আর রাতে স্বাগতিক রাশিয়া মুখোমুখি হবে এশিয়ার দল সৌদি আরবের বিপক্ষে। আগে উদ্বোধনী ম্যাচ খেলার নিয়ম ছিল ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের। ২০০২ জাপান-দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বকাপ থেকে ফিফা নিয়মটি সংস্কার করে। এবার রাশিয়া সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েছে স্বাগতিক হওয়ার সুবাদে।

আজকের ম্যাচে আয়োজক দেশ হিসেবে এগিয়ে আছে রাশিয়া। তবে সদ্য ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে স্বাগতিকদের থেকে তিন ধাপ ওপরে আছে সৌদি আরব। প্রীতি ম্যাচে হুয়ান আন্তনিও পিজ্জির শিষ্যদের বিপক্ষে পরীক্ষা দিতে হয়েছিল গত আসরের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকেও। ম্যাচটা তাই সহজ হবে না স্তানিস্লাভ চেরচেশভের দলের জন্য। শক্তির বিচারে দুই দল প্রায় সমান। সৌদিকে জয় পেতে থাকিয়ে থাকতে হবে আল নেসার ফরওয়ার্ড মোহাম্মদ আল শাহলাউয়ির দিকে। অন্যদিকে লোকোমোটিভ ফরওয়ার্ড আলেক্সেই মিরানচুক জ্বলে উঠলে প্রতিপক্ষের জন্য দিনটা হবে দুঃস্বপ্নের মতো। সেই সঙ্গে তাদের গোলপোস্টের অতন্দ্রপ্রহরী অধিনায়ক আইগোর আকিনফিভ তো আছেনই। গত ব্রাজিল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মাতিয়েছিলেন পিটবুল, জেনিফার লোপেজের মতো বিশ্ব সংগীত তারকারা। এবার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হবে উইল স্মিথ ও নিকি জ্যামের টুর্নামেন্টের অফিশিয়াল থিম সং ‘লিভ ইট আপ’ দিয়ে। তাদের সঙ্গে নাচবে ৫০০ নৃত্যশিল্পী ও জিমনেস্টরা। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনের সামনে বসে উপভোগ করতে পারবেন এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি। তাছাড়া রবি উইলিয়ামসের মতো পপ তারকারাও থাকবেন এই অনুষ্ঠানে। আজ রাশিয়া তাদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নৃত্য, সুর এবং সংগীতে স্বাগত জানাবে পুরো বিশ্বকে।

এবার রাশিয়া বিশ্বকাপে দর্শক হয়ে থাকতে হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই পরাশক্তি ইতালি ও নেদারল্যান্ডকে। দীর্ঘ ৬০ বছর পর বিশ্বকাপের টিকিট পায়নি চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি। অন্যদিকে তিনবারের রানারআপ ডাচদের কপালেও জুটেছে একই ভাগ্য। সেই সঙ্গে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের ৯ নাম্বার দল চিলিকেও থাকতে হচ্ছে দর্শক হিসেবে। তাছাড়া চোট ও ফর্মহীনতার কারণে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত দলে জায়গা হয়নি অনেক কিংবদন্তি ফুটবলারদের। যার ফলে রাশিয়া বিশ্বকাপে দেখা যাবে না অনেক তারকা খেলোয়াড়দের। সেই দীর্ঘ তালিকায় আছেন আজ্জুরিদের গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন, সুইডিশ ফরওয়ার্ড জøাতান ইব্রাহিমোভিচ, আলেক্সিজ সানচেজ, আঁতুর ভিদাল, আরিয়েন রোবেন, গ্যারেথ বেল, দানি আলভেজ, সার্জিও রোমেরো, অ্যালেক্স অক্সলেড-চেম্বারলিন, মাউরো ইকার্দি, লেরয় সানে, করিম বেনজেমা, ফ্রাঙ্ক রিবেরি, জো হার্ট, আলভারো মোরাতা ও জার্মানদের বিশ্বকাপজয়ী গোলদাতা মারিও গোটশে।

রাশিয়া বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পাওয়া প্রত্যেকটি দলের যোগ্যতা আছে বিশ্বকাপ জয়ের। তবে সবার আগে ফেভারিট হিসেবে নাম আসবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডের মতো দলগুলোর। বিশ্বকাপে এই দেশগুলোর ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনেক পুরনো। বিশ্বকাপের শিরোপা ও ম্যাচ জয়ের পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে এগিয়ে আছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশগ্রহণকারী দেশটি এই নিয়ে পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। এবার দলটি বিশ্বকাপ খেলবে স্বদেশি কোচ টিটের অধীনে। দলে আছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার নেইমার, ফিলিপ্পে কুতিহনহো, গ্যাবিয়েল জেসুস, মার্সেলোর মতো তারকা ফুটবলাররা। ঘরের আসরে ব্যর্থ হলেও এবার হেক্সা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপে এসেছে সেলেকাওরা।

অন্যদিকে তাদের চিরশত্রু আর্জেন্টিনা তেমন একটা সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। গ্রুপ পর্বেও পেয়েছে ক্রোয়েশিয়া, সেনেগালের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। তবে বিশ্বকাপে এলেই জ্বলে উঠে দলটি। গত আসরের রানারআপ দলও তারা। বিশ্বকাপে লা আলবিসেলেস্তেরা খেলবে স্বদেশি কোচ জর্জ সাম্পাওলির অধীনে। টানা ৩২ বছর ধরে বিশ্বকাপ জিততে পারেনি আর্জেন্টিনা। এবার তারা সেই অভাব ঘুচানোর স্বপ্ন দেখছে লিওনেল মেসিকে ঘিরে। মেসি কেবল আর্জেন্টিনার নয়, বিশ্ব ফুটবলেরও শ্রেষ্ঠ তারকা। এই বার্সেলোনা ফরওয়ার্ড গত মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩২ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। তাছাড়া দলটিতে আছেন সার্জিও আগুয়েরো, গঞ্জালো হিগুয়েন, পাওলো দিবালার মতো ফরওয়ার্ড। যারা মুহূর্তের মধ্যে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারেন প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ।

২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল জার্মানি। এবারও ফেভারিটের তকমা নিয়ে রাশিয়া এসেছে জোয়াকিম লোর শিষ্যরা। বলতে গেলে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে কুলীন দল হচ্ছে জার্মানি। আটবার ফাইনাল খেলে চারবার বিশ্বকাপ জিতেছে দেশটি। দলে আছেন বিশ্বকাপের স্বাদ পাওয়া মেসুত ওজিল, টনি ক্রুস, থমাস মুলার, ম্যানুয়েল ন্যুয়ারদের মতো তারকা ফুটবলার।

এবারের বিশ্বকাপে শিরোপার আরেক দাবিদার হচ্ছে স্পেন। তবে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, ইস্কো, সার্জিও রামোসদের মাঠে নামার আগে শুনতে হয়েছে একটি দুঃসংবাদ। রিয়াল মাদ্রিদের সঙ্গে ৩ বছরের চুক্তি করায় প্রধান কোচ হুলেন লোপেতেগিকে পদচ্যুত করেছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন। লোপেতেগির অধীনে টানা ২০ ম্যাচ অপাজিত ছিল স্পেন।

সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সেরও রয়েছে এবারের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা। আঁতোয়ান গ্রিজম্যান, উসমান ডেম্বেলের নিয়ে গড়া দলটি এই মুহূর্তে আছে দারুণ ছন্দে। সম্ভবনার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না গ্যারেথ সাউথগেটের ইংল্যান্ড ও র‌্যাঙ্কিংয়ের তিন ও চার নাম্বার দল পর্তুগাল এবং বেলজিয়ামকেও।

এবারের বিশ্বকাপে খেলবে ৩২ দেশের মোট ৭৩৬ জন ফুটবলার। তাদের মধ্যে তারকাখ্যাতিতে এগিয়ে আছেন মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার, ইনিয়েস্তা, মোহাম্মদ সালাহ, হ্যারি কেন, হামেস রদ্রিগেজরা। দলের প্রাণভোমরাও তারা। গত মাসে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা পর্তুগিজ উইঙ্গার রোনালদোর এটি চতুর্থ বিশ্বকাপ। কিছু দিন আগে সিআর সেভেন রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে জিতেছেন চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। আর নেইমার ব্রাজিল দলে ফিরেছেন সদ্য চোট কাটিয়ে। তবে ফিরেই খুঁজে পেয়েছেন পায়ের জাদু।

অন্যদিকে মেসিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছুই নেই। বিশ্বের এই শ্রেষ্ঠ ফুটবলারকে বলা হয় ফুটবলের খুদে জাদুকর। এবারের বিশ্বকাপে নতুন এক তারকাকে দেখবে দর্শক। তিনি হচ্ছেন সালাহ। যার একক নৈপুণ্যের ওপর ভর করে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে এসেছে মিসর। আর গত বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতা রদ্রিগেজকে এখনো ভুলে যায়নি ফুটবলপ্রেমীরা।

অভিজ্ঞদের পাশাপাশি মাঠ মাতাবেন তরুণ তুর্কিরাও। সেই সঙ্গে উদ্ভব হবে নতুন ফুটবলারদের। সেই তালিকায় আছেন গ্যাব্রিয়েল জেসুস, মার্কো আসানসিও, রদ্রিগো বেনটাকুর, আলবার্ট গুডমুন্ডসন, উসমান ডেম্বেলে, আশরাফ হাকিমির মতো ফুটবলার। ওাশিয়া বিশ্বকাপে কেবল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নয়, খেলোয়াড়দের লড়তে হবে বর্ণবাদের বিপক্ষেও। বিশ্বকাপ চলাকালীন রাশিয়ায় গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে বর্ণবাদ ইস্যু। যে বিষয়ে দেশটির কুখ্যাতি রয়েছে বিশ্বজোড়া। গত মাসে সেন্ট পিটার্সবার্গে এক প্রীতি ম্যাচে এক দল রুশ দর্শক কয়েকজন ফরাসি ফুটবলারকে ‘বানর’ বলে বর্ণবিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেছিলেন। তবে রাশিয়ার আয়োজক কমিটি সতর্ক থাকছে যাতে কোনো ধরনের বিদ্বেষের মুখোমুখি না হতে হয় অংশগ্রহণকারী ফুটবলার ও সমর্থকদের। মাঠে ও মাঠের বাইরে বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য বা আকার ইঙ্গিত যে মোটেই বরদাশত করা হবে নাÑ এমন হুশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

রাশিয়া বিশ্বকাপে ভিন্ন দেশের হয়ে পাঁচজন আর্জেন্টাইন কোচকে দেখা যাবে ডাগআউটে। তাছাড়া আরো নতুন রেকর্ডও তৈরি হবে মাঠে। এই আসরে ছয়টি গোল করলে স্বদেশি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছুঁয়ে ফেলবেন মুলার। এবারের বিশ্বকাপের পর আর দেখা যাবে না কিংবদন্তি চার ফুটবলার ইনিয়েস্তা, টিম কাহিল, হাভিয়ের মাশ্চেরানো ও রাফায়েল মার্কেজকে।

প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিটি বিশ্বকাপে নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় দর্শকরা। এবারও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। প্রথমবারের মতো দর্শকরা বিশ্বকাপে দেখতে পাবে ভিডিও অ্যাসিসটেন্ট রেফারি (ভিএআর)। এই ভিএআর দিয়ে নিষ্পত্তি হবে ম্যাচের যেকোনো বিতর্কিত বিষয়ের। যার ফলে এবারের বিশ্বকাপ প্রবেশ করছে একটি ঐতিহাসিক যুগে।

"