লাল সবুজের দেশ

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

নাহিদ হাসান রবিন

গাঁয়ের অত্যন্ত সহজ সরল এক মেয়ে রাশেদা। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও গ্রামের আরো দশটা মেয়ের তুলনায় অনেক নম্র ও বিনয়ী। বাবা কোরবান আলীর সংসারে দুই সন্তান আর স্ত্রী। সংসারে তেমন আয় রোজগার না থাকলেও ঘাড়ে ঋণের বোঝা নেই। মেয়ে রাশেদাকে পড়ালেখা শেষ করিয়ে একটা ভালো ছেলের হাতে তুলে দিতে পারলে তিনজনের সংসারটা ভালো ভাবেই চলে যাবে। রাশেদা এবার ম্যাট্টিক পরীক্ষা দিবে। ছোট ভাইটি প্রাইমারী শেষ করবে। রাশেদা গত পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে। তাই স্যারেরাও ওকে খুব ভালোবাসে। কোরবান আলী স্বপ্ন দেখে একদিন মেয়ে অনেক শিক্ষিত হবে। তার পরিশ্রম সার্থক হবে। এভাবে নানা স্বপ্নের মাঝে কোরবান আলীর দিন কাটতে থাকে।

ভাদ্র মাস। কাঠফাটা রোদ। দেশে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। শহরের দিকে গ-গোল হচ্ছে। গ্রামের লোকজন জরুরি দরকার ছাড়া শহরে যায় না। এমনকি খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া আশেপাশের গ্রামেও যায় না। কোরবান আলী মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তা করে। মেয়েটা পাশের গ্রামের স্কুলে পড়ে। দেশের যে অবস্থা মেয়েটাকে স্কুলে পাঠিয়েও স্বস্তি পায় না। তাই নিয়মিত স্কুলে পাঠায় না। দু-একদিন পর পর রাশেদা স্কুলে যায়।

সেদিন ছিল বুধবার। রাশেদা স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল। গ্রামে ঢুকে দেখে লোকজন চেঁচামেচি আর দৌঁড়াদৌড়ি করছে। একজনের কাছে জানতে পারল ওপাড়ায় বাড়ি-ঘরে আগুন লাগাইয়া দিয়েছে। রাশেদা রাস্তা ছেড়ে জমির আল ধরে দৌঁড়াতে থাকে বাড়ির দিকে। সামনে পড়ে পাকিস্তানি নরপশু। ভয়ে চমকে ওঠে রাশেদা। ওর কণ্ঠনালী শুকিয়ে যায়। কয়েকজন পাকিস্তানি বন্দুক উঁচিয়ে ধরে রাশেদার দিকে। রাশেদা চিৎকার দেওয়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলে। এরই মধ্যে গ্রামের তালেব মাতুব্বর চিৎকার করে পাকিস্তানিদের বন্দুক নামাতে বলে। রাশেদা যেন কিছুটা স্বস্তি পায়। তালেব মাতুব্বর পাকিস্তানিদের বলল- একে মারলে তো স্বাদ বুঝবেন না। মাতুব্বরের মুখে এমন কথা শুনে রাশেদার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে থাকে। কোনো কিছু বলা তো দূরের কথা; ভাবতেও পারে না।

দু’জন পাকিস্তানি রাশেদাকে নিয়ে যায় পাট ক্ষেতে। তারপর এক এক করে ওদের শরীরের ক্ষুধা মেটায়। রাশেদার চিৎকারে বাংলার মাটি, গাছ সব কেঁপে ওঠে। কেবল ওঠে না মাতুব্বর আর পাকিস্তানি নরপশুদের মন।

এরপর কি ঘটেছে রাশেদা জানে না। জ্ঞান ফিরে দেখে ওর রক্তে ভিজে আছে সবুজ দূর্বা ঘাস। অনেক কষ্টে ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি গিয়ে দেখে দরজার সামনে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় লাশ হয়ে পড়ে আছে বাবা কোরবান আলী আর ছোট ভাইটি। চিৎকার দিয়ে ঘরে ঢোকে। মেঝেতে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে আছে রক্ত মাখা মায়ের লাশ।

মাত্র চৌদ্দ-পনের বছর বয়সে এমন একটি ঘটনায় মানবিক শক্তি হারিয়ে ফেলে রাশেদা। চলে যায় নানা বাড়িতে। সেখানেও কেউ নেই। রাশেদা যেন আর কিছু ভাবতে পারে না। নানা বাড়ির পাশের এক লোকের সাথে দেখা হয়। সেখানেই আশ্রয় খুঁজে নেয়। একদিন তাদের সাথে চলে যায় যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। দীর্ঘ তিন মাস প্রশিক্ষণ নিয়ে ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি নরপশুদের উপর। একদিন দেশ স্বাধীন হয়। নিজ গ্রামে ফিরে আসে রাশেদা ও সহযোদ্ধারা। একরাতে ওরা পাকিস্তানিদের চামচা তালেব মাতুব্বরের বাড়ি যায়। ওকে ধরে নিয়ে যায় খালের পাড়ে। তারপর রাশেদা নিজ হাতে বন্দুক চালিয়ে মেরে ফেলে নরপশুটাকে। শান্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওরা ঘরে ফেরে।

সেই বাড়ি, সেই ঘর, শুধু নেই ঘরের কয়েকজন মানুষ। খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকায় রাশেদা। বাংলার বাতাসে উড়ছে স্বাধীন দেশের লাল

সবুজের পতাকা। রাশেদার মনে পড়ে সবুজ ঘাসে ওর লাল রক্ত লেগে থাকার কথা। তবুও

মনটা ভরে ওঠে- এদেশ স্বাধীন হয়েছে। জাতি ওদের রক্তের মান রেখেছে। পতাকার মাঝে

ওদের রক্তের চিহ্ন।

 

"