বীরাঙ্গনা থেকে মুক্তিযোদ্ধা তাদের যুদ্ধের শেষ কোথায়

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

শান্তা মারিয়া

দৃশ্য এক: পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জেরা করছে একজন বন্দী মুক্তিযোদ্ধাকে। বীভৎস কায়দায় নির্যাতন চালাচ্ছে তার উপর। কিন্তু অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা কিছুতেই পরাজয় স্বীকার করছেন না। শত নির্যাতনেও তার সহযোদ্ধাদের নাম পরিচয় কিছুতেই প্রকাশ করছেন না তিনি। দেশ স্বাধীন হলো। শত্রুশিবির থেকে মুক্ত হয়ে নিজের পরিবারের মধ্যে ফিরলেন তিনি। তার সন্তান এবং পরবর্তিতে তাদের সন্তানরাও অহংকার করে তাকে নিয়ে। কারণ, তিনি ছিলেন জাতির একজন বীরসন্তান।

দৃশ্য দুই: পাকিস্তানি শিবিরে আটক এক নারী। তিনি তার ঘরে আশ্রয় দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। গোপনে খবরও পৌঁছে দিয়েছিলেন মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটিতে। বীভৎস কায়দায় নির্যাতন চলছে তার উপরেও। কিন্তু তিনি কিছুতেই সেই মুক্তিযোদ্ধাদের নাম পরিচয় প্রকাশ করছেন না। বিজয়ের পর শত্রুশিবির থেকে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন তিনিও। কিন্তু তাকে গ্রহণ করা হলো না পরিবারের মধ্যে। কারণ, তিনি নারী। তার অপরাধ তিনি ধর্ষিত হয়েছেন। কেউ তার পরিচয় দিতে চাইলো না। তিনি পরিবারের লজ্জা, সমাজের লজ্জা।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা মনে রাখতে হবে যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশাল অংশ ছিল গেরিলাযুদ্ধের। আর গেরিলাযুদ্ধ মানেই জনযুদ্ধ। যেখানে নারী পুরুষ সকলের সম্মিলিত অংশগ্রহণ অত্যাবশ্যকীয় একটি শর্ত।

একাত্তরে পাকিস্তানিরা যে বাঙালি নারীদের ধর্ষণ ও হত্যা করেছে তারা কিন্তু চাইলে নিজের জীবন বাঁচাতে পারতেন, বাঁচতে পারতেন চরমভাবে আহত হওয়া ও দুর্বিষহ নির্যাতন থেকে। তারা যদি পাকি সৈন্যদের সঙ্গে হাত মিলাতেন বা স্বেচ্ছায় তাদের সঙ্গে সম্পর্কে যেতেন তাহলে কিন্তু তারা আহত বা নিহত হওয়া থেকে বেঁচেও যেতে পারতেন। কিন্তু নারীরা তা করেন নি। শতনির্যাতনেও কেউ নিজের মুক্তিযোদ্ধা স্বামী, পুত্র, ভাই এবং অন্যদের ধরিয়ে দেননি। যারা নিজের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন, যারা তাদের জন্য ক্যাম্পে খবর পৌঁছে দিয়েছেন, তাদের জন্য খাদ্য সরবরাহ করেছেন এবং যারা অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছেন তারা নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কাজগুলো করেছেন। তারা কি গেরিলাযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নন? তাহলে তারা মুক্তিযোদ্ধা খেতাব পাবেন না কেন?

বীরাঙ্গনা থেকে মুক্তিযোদ্ধার সম্মানে উন্নীত হতে এই নারীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে চারদশক। তারপরও সকলে এই সম্মান এখনও পাননি। বীরাঙ্গনাদের একটি বিরাট অংশ এখনও মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাননি। তারা কি বীরত্বে, আত্মত্যাগে কারও চেয়ে কম?

আচ্ছা শোনা যাক শহীদ ভাগিরথীর কাহিনি। পিরোজপুরের এক সাধারণ গৃহবধূ ছিলেন ভাগিরথী। তার স্বামীকে পাক হানাদাররা হত্যা করে। ভাগিরথী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তিনি বিভিন্ন কৌশলে পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহ করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে সে খবর পৌঁছে দিতেন। ভাগিরথীর খবরের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধারা বেশকটি যুদ্ধে জয় পান। তারা পাকিস্তানিদের বেশ ক্ষতি করতে সক্ষম হন। পরে রাজাকাররা ভাগিরথীকে ধরিয়ে দেয় মিলিটারির কাছে। গণধর্ষণের শিকার হন ভাগিরথী। তারপর তাকে চলন্ত জিপের সঙ্গে বেঁধে টেনে হিঁচড়ে রাস্তা দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। চরম নির্যাতন শেষে তাকে গুলি করে ফেলে দেয়া হয় বলেশ্বর নদীতে। তার রক্ত মিশে যায় এই বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে। ভাগিরথীর এই জীবনদান কি কোনো অংশে কম বীরত্বের? তিনি কি বীরপ্রতীক, বীরউত্তম পদবি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না?

বীরাঙ্গনা শব্দটির অভিধানিক অর্থ বীরনারী। যুদ্ধে তাদের আত্মত্যাগকে মর্যাদা দেওয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু স্বয়ং তাদের বীরাঙ্গনা বলে অভিহিত করেন। কিন্তু বৈরী সমাজের কারণে পরে সেই শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারী। যে নারীরা পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন জীবিত ফিরে আসার পর যুদ্ধশেষে তাদের প্রাপ্য ছিল সম্মান, সেবা ও শুশ্রুষা। অথচ বৈরী সমাজের কারণে তাদের মাথার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয় একরাশ লজ্জা। বীরাঙ্গনা উপাধি তাদের অহংকার না হয়ে, হয়ে দাঁড়ায বোঝা ও কলংকতিলক। শুরু হয় তাদের অন্য আরেক যুদ্ধ। তাদের সেইযুদ্ধ যে কত কঠিন ছিল, নির্মম ছিল তা বোঝা যায় ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ বইটি পড়লে। রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষরে’ বইতেও রয়েছে বীরাঙ্গনাদের মর্মান্তিক যন্ত্রণার কথা।

পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা নারীর নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে ১৫ খ-ে প্রকাশিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে।

য্দ্ধু শেষ হওয়ার পর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বীরাঙ্গনাদের নিজের কন্যার মর্যাদা দিয়েছিলেন। সরকারী উদ্যোগে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্রও স্থাপিত হয়। তাদের ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির ব্যবস্থা হয়। হাতের কাজ শেখানোর মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য জাতীয় মহিলাসংস্থার মাধ্যমে ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। রেডক্রস এগিয়ে আসে এদের সাহায্যে। প্রচুর সংখ্যক নারীর গর্ভপাত করানোর ব্যবস্থা হয়। তাদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। এছাড়া বেসরকারী পর্যায়ে মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটি, অক্সফামসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক এনজিও তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। যত জনের সম্ভব গর্ভপাত করানো হয়। যুদ্ধশিশুদের প্রশ্নটিও তখন সামনে এসে দাঁড়ায়। যুদ্ধশিশুদের বেশির ভাগকেই বিদেশে বিভিন্ন পরিবারে দত্তক দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

পঁচাত্তর সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে। মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনাদের প্রতি অবহেলা ও সামাজিক নির্যাতন শুরু হয়। তারা চলে যান বিস্মৃতির আড়ালে। সামাজিক বৈরীতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়। রাজাকারদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের সঙ্গে সঙ্গে বীরাঙ্গনা নারীরা সমাজে একেবারে ব্রাত্য হয়ে পড়েন। কোনো কোনো এলাকায় তাদের এক ঘরে করা হয়। অনেকেই বীরাঙ্গনা পরিচয় লুকিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। তাদের ‘নষ্ট’, ‘অসতী’ ইত্যাদি বিশেষণে হেয় করা হয়। শুধু তাদের প্রতি নিপীড়নই বৃদ্ধি পায় না, বীরাঙ্গনা পরিচয় প্রকাশ পেলে তাদের ছেলেমেয়েদের বিয়েশাদি বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থা হতে থাকে। অনেক এলাকায় বীরাঙ্গনাকে ঘরে নেয়ার অপরাধে স্বামীকে গ্রাম্য শালিসের মুখোমুখি করা হয়। এবং তাদের তালাক দিতে বাধ্য করা হয়।

রিজিয়া রহমান তার রক্তের অক্ষরে বইতে দেখিয়েছেন কিভাবে একজন বীরাঙ্গনাকে সমাজের বৈরীতার মুখোমুখি হয়ে শেষ পর্যন্ত ঠাঁই নিতে হয় পতিতা পল্লীতে।

যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাকে বলা হতে থাকে ‘সম্ভ্রম হারানো’ বা ‘ইজ্জত হারানো’ নারী। যদিও সুস্থভাবে চিন্তা করলেই বোঝা যায় যিনি ধর্ষণের শিকার তিনি কোনোভাবেই ‘সম্ভ্রম হারানো মানুষ’ নন। কারণ, তিনি তো কোনো অপরাধ করেননি। বরং সম্ভ্রম হারিয়েছে তার ধর্ষক। যে কিনা গুরুতর অপরাধে অপরাধী। কিন্তু সমাজের অসুস্থ চিন্তার ফলে ভিকটিমকেই সম্ভ্রম হারানো হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে ফেলা হয়।

বাংলাদেশের জনযুদ্ধে নারীর অবদান কারও চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। যে নারীরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন রণাঙ্গনে, যারা গোপন খবর পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে, যারা খাবার রান্না করে দিয়েছেন, যারা নার্সিংয়ে ছিলেন, যারা নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের তারা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। এরা না থাকলে এই গেরিলাযুদ্ধে আমাদের জয়লাভ সম্ভব হতো না।

মুক্তিযুদ্ধে বাংলার তিন লাখ নারী পাকিস্তানি সৈন্য এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে নির্মমভাবে। এরা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের এই যুদ্ধাহতনারীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন অবিলম্বে। এজন্য সরকারি পর্যায়ে প্রতিটি গ্রামে নারীযোদ্ধাদের তালিকা করা দরকার। যুদ্ধাহত নারীদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি এবং প্রাপ্য সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। যুদ্ধাহত নারীর সন্তানদেরও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সুযোগ সুবিধা দিতে হবে। এলাকায় সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাদের সংবর্ধনাও সম্মাননার আয়োজন করতে হবে। তাহলে যুদ্ধাহত এসব নারীরা সামাজিক সংকোচ ও লজ্জা অতিক্রম করে সামনে আসতে পারবেন। তারা আমাদের লজ্জা নন, তারা আমাদের গৌরব। এ সত্যটি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সমাজে।

সেই সঙ্গে রাজাকার আলবদরসহ সকল মানবতা বিরোধী অপরাধীর তালিকাও সম্পূর্ণ করা দরকার। রাজাকার আল বদররাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছিল আমাদের নারীদের।তারা নিজেরাও ধর্ষক, লুটেরা এবং হত্যাকারী। এরাই এক সময় বাঙালি নারীদের ‘গনিমাতের মাল’ আখ্যা দিয়ে পাকিবাহিনীর ধর্ষণকে বৈধতা দিতে চেয়েছিল। এইসব অপরাধীদের বিচার এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মানবতা বিরোধী অপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত নারীদের প্রতি জাতির ঋণশোধের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে হবে দ্রুত।

ধর্ষক হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বাঙালি নারীদের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। ক্যাম্পে, বাংকারে,বন্দীশালায় সে ভয়াবহ নির্মম যুদ্ধ নারীকে মৃত্যুর দ্বার প্রান্তে নিয়ে গেছে। প্রাণও হারিয়েছেন অসংখ্যজন। যারা অসীম জীবনী শক্তিতে প্রাণে বেঁচে গেছেন পরবর্তিতে তাদের যুদ্ধ চালাতে হয়েছে বৈরী সমাজের সঙ্গে। এই যুদ্ধ এখনও থামেনি। সকল বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমেই সে যুদ্ধে বিজয়ী বেশে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব এই নারীদের।

 

"