ধর্ম

বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতা এবং মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব

মুহাম্মদ এনামুল হক আজাদ

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৬, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

বর্তমানে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূখ- পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে আছে। কিন্তু এগুলোর মধ্যে ফিলিস্তিন সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। কারণ, ফিলিস্তিন কেবল একটি মুসলিম ভূখ-ই নয়, বরং একটি পবিত্র ভূমি, আর মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মুকাদ্দাস হচ্ছে এই ফিলিস্তিনের প্রাণকেন্দ্র। কোনো স্থানের পবিত্রতার মর্যাদা দুধরনের হতে পারে। যথাÑসত্তাগত পবিত্রতা ও আরোপিত পবিত্রতা। কোনো জায়গাকে কেবল ঐশী নির্ধারণের মাধ্যমেই সত্তাগত পবিত্রতার অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। অন্যদিকে কোথাও ইবাদতের জন্য মসজিদ তৈরি করা হলে তা আরোপিত পবিত্রতার অধিকারী হয়।

অকাট্যভাবে প্রমাণিত যে, সাধারণভাবে ফিলিস্তিন ভূখ- এবং বিশেষভাবে বায়তুল মুকাদ্দাস প্রথমোক্ত অর্থে পবিত্রতার অধিকারী। কারণ, কাবা ঘর যেভাবে আল্লাহ্র নির্দেশে নির্মিত হয়, সেভাবে মসজিদুল আকসাও এর চল্লিশ বছর পরে নির্মিত হয়।Ñমুসলিম শরিফ

এ ছাড়া আল্লাহতায়ালা বায়তুল মোকাদ্দাসের চতুষ্পার্শ্বস্থ এলাকাকে বিশেষভাবে বরকতময় করেছেন বলে কোরআনে বলা হয়েছে। এ ছাড়া ও অন্যান্য দলিল-প্রমাণ থেকেও প্রমাণিত যে, সাধারণভাবে সমগ্র ফিলিস্তিনই পবিত্র ভূমি, তবে বায়তুল মুকাদ্দাস বিশেষ পবিত্রতার অধিকারী। অতএব, মক্কা ও মদিনার ন্যায় ফিলিস্তিনের প্রতি যে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র ইমানি দায়িত্ব রয়েছে এটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তাই ফিলিস্তিনি ভূখ-ের ওপর জায়নবাদী ইসরাইলের জবর দখল মেনে নেওয়া তো দূরের কথা, এমনকি তার একাংশের ওপর কথিত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়েও অপর অংশের ওপর জায়নবাদী ইসরাইল রাষ্ট্রকে মেনে নেওয়া মুসলমানদের ইমানি দাবির বরখেলাফ।

এখানে আরো উল্লেখ্য, হজরত রাসুলে আকরাম (সা.)-এর নবুওয়তপ্রাপ্তির সময় থেকেই মুসলমানদের জন্য বায়তুল মুকাদ্দাস পবিত্র স্থানরূপে পরিগণিত ছিল এবং এর হারাম এলাকা (মসজিদুল আকসা, যদিও তখন সেখানে কোনো ভবন বা গৃহ ছিল না) ছিল মুসলমানদের প্রথম কিবলা। পরবর্তীকালে কিবলা হিসেবে কাবা ঘর নির্ধারিত হলেও মুসলমানদের দৃষ্টিতে বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার মর্যাদা অক্ষুণœ থাকে।

কারণ, পবিত্র ভূমির পবিত্রতা একটি চিরন্তন ব্যাপার। অতএব, কেবলা না থাকার কারণে পবিত্র স্থান হিসেবে ওই ভূখ-ের সঙ্গে মুসলমানদের আত্মিক সম্পর্কে কোনোরূপ অবনতি ঘটা সম্ভব নয়। ঠিক যেমন পবিত্র মদিনা মুসলমানদের কেবলা নয়, কিন্তু তার সাথে মুসলমানদের আত্মিক সম্পর্কের কোনোরূপ ঘাটতি দেখা দিতে পারে না। তা ছাড়া হাদিসে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী ও মসজিদুল আকসায় নামাজ আদায়ের জন্য বিশেষ সওয়াবের কথা বলা হয়েছে, যা থেকে মসজিদুল আকসা তথা বায়তুল মুকাদ্দাসের বিশেষ পবিত্রতার মর্যাদা অব্যাহত থাকার বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়।

ইহুদি ও খ্রিস্টান প্রাচ্যবিদ প-িতদের অনেকে এ প্রসঙ্গে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালিয়েছেন। তারা বলেন, সুরা বনী ইসরাইলের প্রথম আয়াতে মসজিদুল আকসা বলতে বায়তুল মুকাদ্দাসকে বোঝানো হয়নি। তাদের যুক্তি, কোরআন মজিদের দৃষ্টিতে উক্ত পবিত্র ভূমি হচ্ছে ‘নিকটতম ভূমি’। কারণ, সুরা আর-রূমে পারসিকদের নিকট রোমানদের পরাজয়ের স্থানকে ‘নিকটতম ভূমি’ (আদনাল্ র্আদ্) বলা হয়েছে, অতএব, দূরতম মসজিদ (মসজিদুল আকসা) এটি নয়। দ্বিতীয় অপযুক্তি হচ্ছে এই যে, ওই সময় (মেরাজের সময়) বায়তুল মুকাদ্দাসের হারাম এলাকায় কোনো ইবাদত গৃহ ছিল না।

এর জবাব হচ্ছে, নিকটতম ভূমিতে দূরতম মসজিদের অবস্থানের মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা থাকতে পারে না। কারণ, অভিন্ন সীমান্তের কারণে ফিলিস্তিন আরব উপদ্বীপের নিকটতম ভূখ-। অন্যদিকে ওই সময় মসজিদুল হারাম থেকে সর্বাধিক দূরত্বে অবস্থিত পবিত্র স্থান ছিল শুধু বায়তুল মুকাদ্দাস; এর চেয়ে দূরবর্তী অন্য কোনো ইবাদত কেন্দ্র ছিল না, যা তাওহিদবাদীদের নিকট পবিত্র বলে পরিগণিত হতো। এমতাবস্থায় অতি গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র ভ্রমণের (মেরাজ) জন্য কেবলাকে রেখে (তখনো যা কেবলা ছিল) অন্য কোনো ইবাদত কেন্দ্রকে মধ্যবর্তী ট্রানজিট স্টেশনরূপে বেছে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

আর যদি এরূপ অন্য কোনো পবিত্র ইবাদত কেন্দ্র অন্য কোথাও থাকত এবং তাকে মেরাজের মধ্যবর্তী ট্রানজিট স্টেশনরূপে গণ্য করা হতো, তাহলে হজরত রাসুলে আকরাম (সা.) অবশ্যই তার অবস্থান ও পরিচিতি সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামকে অবহিত করতেন বা তারা জিজ্ঞেস করে জেনে নিতেন। কিন্তু এ মর্মে একটি হাদিসও পাওয়া যাবে না। এ থেকে সুস্পষ্ট যে, সুরা বনী ইসরাইল নাজিলের সময় সাহাবায়ে কেরামের নিকট ‘মসজিদুল আকসা’ অপরিচিত ছিল না।

দ্বিতীয় যুক্তি সম্পর্কে বলতে হয়, ওই সময় বায়তুল মুকাদ্দাসের হারাম এলাকায় ইবাদতের জন্য বিশেষ ‘গৃহ’ বা ‘ভবন’ না থাকায় তার ‘মসজিদ’ হওয়াতে কোনো বাধা নেই। কারণ, আরবি ভাষায় ‘মসজিদ’ মানে সিজদার জায়গা। তাই যে কোনো জায়গাই নামাজের জন্য বিশেষভাবে নির্র্ধারিত হবে আরবি ভাষায় তা-ই মসজিদ; এজন্য গৃহ বা ভবন হওয়া শর্ত নয়। এ কারণেই কাবা গৃহের চতুষ্পার্শ্বস্থ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণকে মসজিদুল হারাম (পবিত্র মসজিদ) বলা হয়, যদিও এর ওপরে কোনো ছাদ নেই।

তৃতীয়ত, হজরত রাসুলে আকরাম (সা.)-এর মিরাজ গমন প্রসঙ্গে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত এসব হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও দুটি বিষয়ে বিন্দুমাত্র মতপার্থক্য নেই। তা হচ্ছে মেরাজ গমনের মূল বিষয়টি এবং বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদুল আকসার সাখরা মোবারকের ওপর থেকে গমনের বিষয়টি।

অতএব, বায়তুল মুকাদ্দাসের পবিত্রতার বিষয়টি পরবর্তীকালের আরোপিত বলে দাবি করার পেছনে কোনো ভিত্তি নেই। ইরানের ধর্মীয় নেতা ইমাম খোমেনি এ পবিত্র মসজিদ পুনরুদ্ধারের দাবিতে রমজানের শেষ শুক্রবার আল কুদস দিবস ঘোষণা করেন।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

"