খেলাপি ঋণ উদ্ধার

ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি

প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিঃসন্দেহে খেলাপি ঋণ। এ ঋণ আদায়ের জন্য বিদ্যমান বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে খুবই অকার্যকর এবং দীর্ঘসূত্রতা সাপেক্ষ। এ জন্য জরুরি প্রয়োজন হলো তিন বছরের জন্য একটি খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা। একই সঙ্গে খেলাপিদের সামাজিকভাবে বয়কটের পাশাপাশি তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘ব্যাংকিং খাত নিয়ে উল্টাপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন : ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করুন’ শীর্ষক বৈঠকে উপস্থাপিত প্রবন্ধে এসব বক্তব্য তুলে ধরা হয়। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। সুজন সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহীম খালেদ, অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক এমডি আবু নাসের বখতিয়ার, অধ্যাপক আবু সাঈদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

প্রবন্ধে বলা হয়, অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, তিনি আর খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে দেবেন না। তিনি মন্দ ঋণ রাইট-অফ করার পদ্ধতি সহজ করে দিয়েছেন, যাতে ক্লাসিফাইড লোনের এ শিথিল পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিভিন্ন ব্যাংক ‘মন্দ ঋণ রাইট-অফ করা’ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়। রাইট-অফ করা মন্দ ঋণ বাড়ার মানেই হলো এর ফলে ক্লাসিফাইড লোন ওই পরিমাণ কম দেখানো যাবে। তিনি মন্দ ঋণ আদায়ের জন্যে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ২ শতাংশ ঋণ প্রাথমিক কিস্তিতে পরিশোধ করে যে ১০ বছরের সময় দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন, সে সুবিধা নিয়ম-নিষ্ঠ ঋণ ফেরতদাতারা পান না। কিন্তু, এ ধরনের পরিবর্তন খেলাপি ঋণ সমস্যাটিকে আড়াল করার পন্থা হলেও মন্দ ঋণ আদায় করার কোনো নিষ্ঠাবান প্রয়াসের মাধ্যমে জোরদার করার লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো ঋণখেলাপিদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত দরদ দেখিয়ে উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে চলেছেন।

প্রবন্ধে আরো বলা হয়, বিগত ২০১৪-১৯ মেয়াদের সরকারের সময়েও খেলাপি ঋণের অবস্থা সংকটজনক থাকা সত্ত্বেও কোনো রহস্যজনক কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠনের ইস্যুটাকে বারবার এড়িয়ে গেছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতা গ্রহণের ৯ মাস অতিক্রান্ত হলেও এখনো তিনি কমিশন গঠনের ঘোষণা দেননি, কিন্তু কেন। এতদিনে তার বোঝা উচিত যে অর্থমন্ত্রীর টোটকা দাওয়াই দিয়ে খেলাপি ঋণের ক্যানসার সারানো যাবে না। দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের অবস্থা ভালো নয়। যার মূল কারণ খেলাপি ঋণ। এমন অবস্থায় প্রয়োজনীয় বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সুপারিশ করার জন্য অবিলম্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন গঠন করার দাবি জানানো হয়।

দেশে ব্যাংক ঋণ নিয়ে একটা পাতানো খেলা চলছে দাবি করে প্রবন্ধে অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, সমস্যার প্রকৃত রূপটি সরকার, ব্যাংকার এবং ঋণখেলাপি সবারই জানা আছে। সমস্যার সমাধানের উপায় সম্পর্কেও এ তিন পক্ষের সবার স্পষ্ট ধারণা আছে। কিন্তু, জেনেশুনেই সমাধানের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে, এখনো দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা রয়ে গেছে রাঘববোয়াল ঋণখেলাপিদের কাছে আটকে থাকা বিপুল খেলাপি ঋণ। এ ঋণখেলাপিদের প্রায় সবাই ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, মানে যারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন যে তারা তাদের ঋণ ফেরত দেবেন না। কারণ, তাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং আর্থিক প্রতাপ দিয়ে তারা শুধু ব্যাংকিং খাত নয় দেশের সংসদকেও দখল করে ফেলেছেন।

এক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানানো হয়, গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের ৬১ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যবসায়ী। তাদের সিংহভাগই ব্যাংকের মালিক-পরিচালক। দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সমস্যা নিঃসন্দেহে খেলাপি ঋণ। এ ঋণ আদায়ের জন্য বিদ্যমান বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশে খুবই অকার্যকর এবং দীর্ঘসূত্রতা সাপেক্ষ। এখন সুপ্রতিষ্ঠিত যে, এ দেশের রাজনীতি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি কালচারকে লালন করে চলেছে। তাই, সংশোধনও শুরু করতে হবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে। এজন্য জরুরি প্রয়োজন হলো তিন বছরের জন্য একটি খেলাপি ঋণ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করে প্রত্যেক ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণখেলাপিকে চূড়ান্ত বিচারে দ্রুত শাস্তির আওতায় আনা।

"