দেশে আয়বৈষম্য বেড়ে চলেছে : ফরাসউদ্দিন

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন, মাতৃমৃত্যুর হার ছাড়া মানব উন্নয়নের অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু দেশে ক্রমান্বয়ে আয়বৈষম্য বেড়ে চলেছে। শুধু মাথাপিছু আয় দিয়ে উন্নয়নকে বিচার করলে চলবে না। যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, তার ভাগ যেন সমাজের প্রান্তিক মানুষ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত বাংলাদেশে আয় ও ধন বৈষম্যবিষয়ক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শফিক উজ জামান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুর্শিদ, অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ ও সহসভাপতি এ জেড এম সালেহ আলোচনায় অংশ নেন। সেমিনারে অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয় বৈষম্য : সমাধান কোন পথে? শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

ফরাসউদ্দিন বলেন, বণ্টনের ন্যায্যতাসহ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে যেতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে রেখে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সোয়া এক কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় ৪ হাজার মার্কিন ডলারের ওপরে। অথচ কর দেন মাত্র ২০ লাখ মানুষ। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে কর আদায় বিশেষ করে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কার্যকর করতে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে।

ড. মইনুল ইসলাম দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা উল্লেখ করে তার প্রবন্ধে বলেন, স্বজনতোষী পুঁজিবাদের কারণে আয় বৈষম্য বাড়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পঞ্জিভূত হচ্ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে নি¤œবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রবৃদ্ধির ন্যাষ্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আয় বৈষম্য ক্রমে বাড়তে থাকার প্রবনতাকে দেশের আসন্ন বিপৎসংকেত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্য দিয়ে দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ ও পুঁজি লণ্ঠনের যাত্রা শুরু হয়। দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের মাধ্যমে গত ৪৪ বছরে দেশে লাখ লাখ ব্যবসা-নির্ভর পুঁজিপতি, মার্জিন-আত্মসাৎকারী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দুর্নীতিবাজ আমলা এবং সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধনাঢ্য ও উচ্চবিত্ত গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তিনি বৈষম্য বৃদ্ধির শক্তিগুলোকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করার জন্য রাষ্ট্রকে জনগণের স্বার্থের পাহারাদারের ভূমিকা পালনে বাধ্য করতে হবে বলে মন্তব্য করেন।

মইনুল ইসলাম বলেন, আয় ও সম্পদ বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে দুর্নীতি নিরসন করতে হবে। এর জন্য সবাইকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত সম্পদ বণ্টনের ন্যায্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রাষ্ট্রকে কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির পূজা করলে হবে না। সেই প্রবৃদ্ধি দিয়ে আসলে মানব উন্নয়ন হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, ধরুন দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হলো, কিন্তু সেটা যদি সমাজের নিচুতলায় না যায়, তাহলে এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনো লাভ নেই। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, নব্য উদারবাদী পুঁজিবাদ অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অনুষ্ঠানে বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কে এ এস মুর্শিদ সমাজে আয় ও সম্পদ বৈষম্য নিরসনে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যায়ভিত্তিক ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

"