নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের বাইরে বৃহৎ খাতে এবারই প্রথম বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। নেপালে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে এ বিনিয়োগ করা হবে। এ ব্যাপারে আগামী শুক্রবার নেওয়া হবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত। দেশটির কোন কোন জায়গায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে পারবে, ওইদিন নেপালের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে তা জানানো হতে পারে। এ ব্যাপারে আজ বুধবার থেকে কক্সবাজারে ২ দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের ৩ দিনের বৈঠক শুরু হচ্ছে।

বিদ্যুৎ সচিব ড. আহমদ কায়কাউস গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা বলছি বার বার। শুধুমাত্র ভারত নয়, আশপাশের দেশগুলো থেকে বিদ্যুৎ আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনার এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে যে স্টিয়ারিং কমিটি করা হয়েছে সেই কমিটির এটি দ্বিতীয় সভা। এর মাধ্যমে এরই কার্যক্রমগুলো আরো সুদৃঢ় হচ্ছে এবং আরো জোরদার হচ্ছে।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, নেপাল-বাংলাদেশ যৌথ স্টিয়ারিং কমিটি গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম বৈঠক করে। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় নেপালের কোন কোন জায়গায় বিনিয়োগ সম্ভব, সে বিষয়ে দুই দেশের কারিগরি কমিটি প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কোন পথে বাংলাদেশে আনা যায় সে বিষয়েও প্রতিবেদন দেবে। বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার তিন দিনব্যাপী যথাক্রমে টেকনিক্যাল কমিটি, ওয়ার্কিং কমিটি ও স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠক করবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবেশী দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। এরপর থেকেই বিদ্যুৎ বিভাগ প্রতিবেশী দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছিল। জলবিদ্যুৎকে বলা হয়, সব থেকে কম দামে উৎপাদিত নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ। নেপালে অন্তত ৩০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে। বিনিয়োগ করার পাশাপাশি ভারতীয় কোম্পানি জিএমআরের মাধ্যমে নেপাল থেকে আপাতত ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। সফল হলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। নদী ও পানিসম্পদ বিজ্ঞানী ড. আইনুন নিশাত মনে করেন, ভুটানের প্রকল্পে বাংলাদেশ অংশীদার হতে পারলে আঞ্চলিক সহযোগিতা তথা অভিন্ন নদ-নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিরাট দিকনির্দেশনামূলক কাজ হবে। বিশেষত বিবিআইএন (বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল) ফ্রেমওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত বিদ্যুতের আঞ্চলিক গ্রিড স্থাপন করা সম্ভব হবে। তার মতে, নেপালের কশী নদীতে বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করে বর্ষার পানি ধরে রেখে সারা বছর সাশ্রয়ী জলবিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারে। তবে প্লান্ট স্থাপনে বিপুল বিনিয়োগ যৌথভাবে বাংলাদেশ ও নেপাল করতে পারে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি প্লান্ট স্থাপন করে ভুটান তার প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ভারতে রফতানি করছে। একইভাবে তারা বাংলাদেশেও রফতানিসহ বিনিয়োগের অংশীদারত্বে আগ্রহী।

এদিকে বছর কয়েক ধরেই ভুটানের কুড়ি ও সংঘর উপনদীর মিলিত স্থানে দার্জিলং বা রোপতাসন পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এক হাজার ১২৫ মেগাওয়াট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার এ প্রকল্পে বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটান যৌথভাবে বিনিয়োগ করলে অভিন্ন নদী অববাহিকায় পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের এক মডেল হবে। যে মডেল ব্যবহার করে নেপাল, ভুটান ও ভারতের অন্য নদীগুলোতেও অনুরূপ প্রকল্প স্থাপন করা যেতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এ মডেলেও অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় ও উপকার বণ্টনের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে। পাশাপাশি উজানে নির্মিত জলাধারে পানি ধরে রাখার কারণে ভাটির নদীগুলোতে শুকনো মৌসুমে পানিও বাড়বে।

বাংলাদেশ-নেপাল যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের আহ্বায়ক বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব ফয়জুল আমীন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এখনও নেপালের তরফ থেকে আমাদের জানানো হয়নি কোন কোন জায়গাতে আমরা কেন্দ্র নির্মাণ করতো পারবো। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে নেপাল বিষয়টি আমাদের জানাবে।’ তিনি বলেন, এর বাইরেও ভারতীয় কোম্পানি জিএমআর-এর কাছ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির আলোচনা হচ্ছে। এ বিষয়ে এখনও ট্যারিফ (দাম) নির্ধারণে আলোচনা করছে পিডিবি এবং জিএমআর-এর মধ্যে। জিএমআর এবং পিডিবি ঢাকায় ট্যারিফ নির্ধারণী বৈঠক করলেও তা সফল হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের মহাপরিকল্পনাতে বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এজন্য ভারত ছাড়াও নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

এছাড়া, ভারত থেকে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পা রয়েছে।

 

"