শিল্পের বিকাশে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিল্পের ক্রমাগত বিকাশের ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সম্পদের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে পরিবেশে ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আবার উৎপাদিত বর্জ্যরে কারণে প্রতক্ষ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ।

বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, এখনই টেকসই উৎপাদন ও ভোগ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা দরকার। পরিবেশের ওপর পোশাক শিল্প খাতের এই নেতিবাচক প্রভাব কমাতে উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্প-কলকারখানার পানি, জ্বালানি ব্যবহার হ্রাস করে বর্জ্য নিষ্কাশন কমানো প্রয়োজন।

গতকাল শনিবার ঢাকার ব্রাক সেন্টারে একশন এইড বাংলাদেশ এবং ফ্যাশন রেভল্যুশন আয়োজিত ‘ভয়েসেস অ্যান্ড সল্যুশনস’ শীর্ষক সেমিনারে এমন কথা উঠে আসে। অনুষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য, ফ্যাশন শিল্পে টেকসই উৎপাদন এবং ব্যবহার নিশ্চিতের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য সব পক্ষকে এক জায়গায় নিয়ে আসা। অনুষ্ঠানের শুরুতে একশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির পোশাক খাত কিভাবে পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে তার ওপর একটি প্রবন্ধ উপস্থান করেন। প্রবন্ধে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য খাত ফ্যাশন শিল্প। যেটি পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী খাত। একইসঙ্গে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পানি ব্যবহারকারী খাত। অপরদিকে, শুধু এই একটি খাত থেকেই বিশ্বের ২০ শতাংশ বর্জ্য পানি এবং ১০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হয়।

প্রবন্ধে বলা হয়, শিল্প-কারখানার সব ক্ষেত্র যেমন কাটা, বয়ন, সেলাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তৈরি পোশাক উৎপাদন বায়ু, পানি এবং মাটি দূষণ করে থাকে। বেশির ভাগ কারখানা নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ায় তাদের বর্জ্য নদীতে ফেলা হয়। ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশনের এক গবেষণা মতে, প্রতি বছর পোশাক শিল্প কারখানায় পোশাক ও তুলা ধৌতকরণ এবং রঙের কাজে ১৫০০ বিলিয়ন লিটার পানি ব্যবহার করা হয়। কারখানাগুলো ব্যবহারের পর এই বিষাক্ত পানি নদী এবং খালে নিষ্কাশন করে।

এ প্রসঙ্গে ফারাহ্ কবির বলেন, ‘বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাত দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও, পরিবেশের জন্য এটি উদ্বেগজনক। পানি দূষণের ফলে একদিকে কমছে মাছের সংখ্যা অপরদিকে হ্রাস পাচ্ছে চাষের উপযোগী জমি। বেশির ভাগ স্থানীয় কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জীবিকা এখন ঝুঁকিপূর্ণ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিল্প-কারখানা হতে নিষ্কাশিত বর্জ্যরে পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। জলাশয়কে ডাস্টবিন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে করতে হবে আরো উন্নত।’

মেয়র আরো বলেন, রানা প্লাজা ধসের পর বাংলাদেশের শিল্প খাতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। তবে, অংশীদারদের মধ্যেই এখনো সচেতনতার অভাব রয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নে পোশাক শিল্পখাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে। নিজেদের দায়িত্ব না এড়িয়ে নিজেদের ব্যবহারে ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। জোর দিতে হবে গবেষণায় এবং শিক্ষাব্যবস্থায় টেকসই উৎপাদন ও ব্যবহারের বিষয় অন্তর্ভুক্তকরণে। অনুষ্ঠানের ধারণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় গত দুই দশকে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ ব্যাপক মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। অতিরিক্ত ব্যবহার এবং নগরীকরণের কারণে পুনরায় পানি সরবরাহের অভাবই হলো এর মূল কারণ। ঢাকার পানি সরবরাহের প্রায় ৮২ শতাংশই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। পানির এই বিশাল চাহিদা পূরণের জন্য, ভূ-পানির স্তর প্রতি বছর দুই থেকে তিন মিটার পরিমাণে হ্রাস পাচ্ছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যদি পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয় তবে ২০৫০ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ কমে গিয়ে ১১০ থেকে ১১৫ মিটারে নেমে আসবে।

এছাড়া পোশাক শিল্পের বর্জ্য হতে নির্গত মিথেন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। পোশাক প্রক্রিয়াকরণে ব্যবহৃত রাসায়নিক রং মাটির সঙ্গে মিশে ভূপৃষ্ঠ এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করে।

কিউটেক্স সল্যুশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাহুরা খানম বলেন, বর্জ্য নিষ্কাশন শুধু পরিবেশ দূষণই করছে না বরং জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি করছে। বর্তমানে গড়ে অধিকাংশ কারখানার জ্বালানি দক্ষতা মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। শিল্পকারখানার এই নেতিবাচক প্রভাব রোধে সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প-কারখানাগুলোর ভালো উদ্যোগগুলো সমন্বয়ের অভাবে সঠিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

বিজিএমইএ’র সদ্য নির্বাচিত পরিচালক শরীফ জহির বলেন, কাঁচামাল দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করলে বর্জ্যরে পরিমাণ আরো কমিয়ে আনা সম্ভব। পানি ও জ্বালানি ব্যবহার কমিয়ে এনে বর্জ্য নিষ্কাশনের হার হ্রাস করার লক্ষ্যে আরো কাজ করা জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এক্ষেত্রে ভালো উদ্যোগগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া জরুরি। পরিবেশবান্ধব মেশিন ব্যবহারসহ ভালো উদ্যোগগুলো প্রচারের মাধ্যমে অংশীদারদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই সমস্যার সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

বিজিএমইএ’র সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান জানান, বর্জ্য নিষ্কাশনের পরিমাণ কমিয়ে আনতে আমরা কাজ করছি। এজন্য কর্মচারী ও শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। এজন্য আরো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ দরকার।

ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম বলেন, সমমানের বিকল্প খাতের অভাবে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছর এই শিল্প খাতের ওপর নির্ভর করেই বাংলাদেশকে এগোতে হবে। বিজিএমইএ টেকসই পণ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কার্যক্রমে গুরুত্ব দিচ্ছে। উৎপাদনের সঙ্গে ব্যবসায়িক চাহিদার সমন্বয় ঘটাতে হবে। একইসঙ্গে, পরিবেশ রক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করবে এই সংগঠন।

ফ্যাশন রেভল্যুশনের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর নওশীন খায়ের, সবার আগে সবার মানসিক পরিবর্তন জরুরি। সম্প্রতি অনেক নতুন ব্র্যান্ড টেকসই উৎপাদন এবং ব্যবহারে উৎসাহী হচ্ছে।

ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমরান রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচিত তাদের নীতিমালায় টেকসই উৎপাদন ও ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া। এখন পর্যনমশ ফ্যাশন শিল্প নিয়ে নীতিমালা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত তথ্য উপাত্ত নেই। তাই আরো বেশি গবেষণার প্রয়োজন।

পরিবেশ অধিদফতরের মহাপরিচালক ড. সুলতান আহমেদ দিনব্যাপী এই আলোচনার দ্বিতীয়ভাগে বলেন, দেশের কারখানাগুলোর পরিবশবিষয়ক তদারকি ব্যবস্থাপনা আছে। তবে তদারকির জন্য যথেষ্ট লোকবল নেই। আমাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনা। একইসঙ্গে দরকার সবার মানসিকতার পরিবর্তন।

আয়োজকরা প্রবন্ধে বলেন, বর্তমানে সমস্ত শিল্প কর্মসংস্থানের ৪৫ শতাংশই হয় পোশাক এবং টেক্সটাইল খাতে, যা মোট জাতীয় আয়ের ৫ শতাংশ। দেশে রফতানি আয়ের ৭৮ শতাংশ আসে এই খাত থেকে। এই খাত, যেখানে কাজ করছে দেশের ৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, তার পরিচালনার ফলে পরিবেশের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব, তা বিবেচনা করে এই শিল্পকে টেকসই করার প্রতি মনোযোগ দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর তাই এই সেমিনার এ আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি প্লাটফর্মের সূচনা করা হয় যেখানে ফ্যাশন শিল্প খাতের অংশীদাররা তাদের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে কথা বলবেন এবং অভিজ্ঞতার আলোকে প্রাপ্ত সমাধান তুলে ধরবেন।

 

"