স্মরণকালের মন্দার কবলে দেশের তাঁতশিল্প

পুঁজি হারিয়ে অনেকেই পথে বসেছে

প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

আরিফ খাঁন, বেড়া (পাবনা)
ama ami

স্মরণকালের মন্দার কবলে পড়েছে দেশের তাঁতশিল্প। দেশে বিদেশে তাঁতবস্ত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় পাবনা অঞ্চলের তাঁত মালিকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উৎপাদিত তাঁতবস্ত্র বিক্রিতে অব্যাহত লোকসানে মালিকরা তাঁত কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পুঁজি হারিয়ে অনেকেই পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। হাজার হাজার তাঁত শ্রমিক বেকার হয়ে পবিার পরিজন নিয়ে কষ্টে জীবন যাপন করছেন।

তাঁত কারখানা মালিকরা বলছেন, এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে তাঁত শিল্প এবং এ শিল্পের সাথে জড়িতরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদেশে রফতানি এবং দেশে চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁত বস্ত্রের বাজার দর প্রতিদিন নি¤œ মুখি হচ্ছে। সরকারিভাবে পদক্ষেপ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এ অবস্থা আরো প্রকট আকার ধারন করবে। তারা বলছেন, এখন সকল শ্রেণীপেশার নারীরা সালোয়ার কামিজ বেশী ব্যবহার করায় শাড়ীর ব্যবহার কমে গেছে। আর এতেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁত কারখানা মালিক ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, দেশে বিদেশে তঁাঁতবস্ত্রের চাহিদা কমে যাওয়ায় তাঁতে উৎপাদিত শাড়ী লুঙ্গীর বিক্রি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। উৎপাদিত পণ্য লোকসানে বিক্রি করে তাঁতিরা পুজি হারাচ্ছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক তাঁতিরা চরম বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন। ঋণ পরিশোধ ব্যর্থ হয়ে অনেকেই তাঁত বিক্রি করে পোষাক শিল্পে, কেউবা মাটি কাটা শ্রমিক আবার কেউ রিক্সা চালকের কাজ নিয়েছেন। কেউ কেউ পুঁজি হারিয়ে বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে পাবনা অঞ্চলের প্রায় অর্ধেক তাঁত বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে ঋণগ্রহিতারা তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। তাঁত বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই তাঁতের কাঠ জ্বালানি হিসেবে, লোহা ভাঙ্গড়ীর দোকানে বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের পাবনার সাঁথিয়া বেসিকসেন্টার সূত্রে জানা গেছে, পাবনা তাঁত সমৃদ্ধ জেলা হিসেবে পরিচিত। জেলার সাঁথিয়া, সুজানগর, বেড়ায় উপজেলায় তাঁতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। ২০০৩ সালের তাঁত বোর্ডের জরিপ অনুযায়ী হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা ৫৫ হাজার এবং বিদ্যুত চালিত পাওয়ারলুমের সংখ্যা প্রায় ২২ হাজার। এই তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত রয়েছে প্রায় দেড় লাখ নারী- পুরুষ। এছাড়া অনান্য ব্যবসা ও পেশার লোকজন তাঁতশিল্পের উপর নির্ভরশীল। তাঁত শিল্পকে কেন্দ্র করে শাহজাদপুর ও আতাইকুলায় কাপড়ের হাট গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে এবং কাপড় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আতাইকুলা ও শাহজাদপুর হাটে প্রতি সপ্তাহের চারদিন (দিনরাত মিলে) কাপড় বিক্রি হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাপড় ব্যবসায়ী ও দোকান মালিকরা এই হাটে এসে শাড়ী, লুঙ্গি ক্রয় করে থাকেন। প্রতিহাটে ভারতে শাড়ী ও লুঙ্গি রফতানি হয়ে থাকে। প্রতি হাটে ব্যাংক ও নগদসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেন হতো। বর্তমানে কাপড় ক্রয়-বিক্রয়, রফতানী ও ব্যাংক লেনদেন অর্ধেকের কমে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে খেলাপী ঋণের সংখ্যা বাড়ছে। বেড়ার রাকশা গ্রামের নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন তাঁত মালিক জানান, পুঁজি হারিয়ে তাঁত বিক্রি করে দিয়ে রাতের আধারে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি। এলাকায় এক সময় প্রচুর দাপট ছিলো। অনেক দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করেছি। এখন নিঃস্ব হয়ে মানসন্মানের ভয়ে বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়েছি। বেড়ার হাতিড়াগাড়া গ্রামে ৫টি কারখানায় প্রায় ২০০ তাঁত বন্ধ রয়েছে।

তাঁতী শফিকুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ৪০ বছরের ব্যবসা জীবনে এমন ভয়াবহ অবস্থা কোনদিন দেখিনি। কাপড় বিক্রি করে শ্রমিকের মজুরীর টাকাই জোগাড় হচ্ছেনা। গুদামে লাখ লাখ টাকার কাপড় মজুদ হয়ে আছে। জমি বিক্রি করে বাংকের সুদের ১৬ লাখ টাকা দিয়েছি। মোট ৩০৪ টি তাঁতের মধ্যে মাত্র ৯৫টি তাঁত চালু রেখেছি।

রফতানিকারক নিত্যনন্দ রায় বলেন, শুল্কমুক্ত হওয়ায় তিন বছর আগে ছয়টি রফতানীকারক প্রতিষ্ঠান আতাইকুলা ও শাহজাদপুরের হাট থেকে প্রতি সপ্তাহে চার লাখ পিচ শাড়ী ও লুঙ্গী ভারতে রফতানী করতো। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে কাপড় রফতানী হতো। গত ৩ বছর ধরে ভারতের রাজ্য সরকার ছয় শতাংশ শুল্ক আরোপ এবং ভারতে বাংলাদেশে ডলারের মূল্যমানে ব্যবধানের কারণে রফতানীর পরিমান অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া না হলে এই পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ আকার ধারন করবে।

আতাইকুলা হাটের একাধিক বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপক জানান, গত তিন বছরের অনুপাতে বর্তমানে লেনদেন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। বেশিরভাগ তাঁতমালিকরা শুধু লুঙ্গি তৈরি করে থাকেন। অন্য কোন কাপড় তারা তৈরি করেন না। সে কারণে বাজার মন্দা হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে। উৎপাদিত কাপড় কমমূল্যে, বাকিতে এবং চেকের মাধ্যমে বিক্রি করায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে পারছেন না। সে কারণে খেলাপী ঋনের সংখ্যা বাড়ছে।

"