বকেয়া রাজস্ব আদায়

হালখাতা করবে এনবিআর

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, সব ধরনের বকেয়া রাজস্ব আদায়ে আগামী ১৫ এপ্রিল রাজস্ব হালখাতা করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। প্রতিটি কর অফিসে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে হালখাতা। বকেয়া কর পরিশোধকারীদের প্রণোদনার (ইনসেনটিভ) পাশাপাশি মিষ্টিমুখ করানো হবে। এছাড়া আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে করপোরেট কর হার কমানোর ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা চলছে। একইসঙ্গে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর আরো কমানো এবং রফতানিতে বর্তমানে দেওয়া সব ধরনের প্রণোদনা অব্যাহত রেখে কীভাবে রফতানি আয় বাড়ানো যায় সে চেষ্টা করছে সরকার। এছাড়াও কীভাবে সহজে ব্যবসা করা যায়, সে ধরনের উদ্যোগ থাকবে। তবে এসব ক্ষেত্রে সরকার ও নীতির ধারাবাহিকতা জরুরি।

গতকাল এনবিআর মিলনায়তনে অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া এসব তথ্য জানান। এনবিআরের কার্যালয়ে এই আলোচনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পলিসি রিসার্স ইনস্টিটিউটের (পিআরই) চেয়ারম্যান জায়েদী সাত্তার, নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ এবং প্রাইস অ্যান্ড ওয়াটার হাউস কুপারসের ম্যানেজিং পাটনার্স মামুন রশিদ।

এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী ১৫ এপ্রিল সারা দেশে ‘রাজস্ব হালখাতা ও বৈশাখী উৎসব’ পালন করা হবে। কিছু উপহার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। যারা বকেয়া রাজস্ব পরিশোধ করবেন তাদের জন্য কিছু ইনসেনটিভেরও ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বকেয়া করের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। অনাদায়ী বিপুল এই রাজস্বের সঙ্গে বিভিন্ন মামলা জড়িয়ে আছে। তবে মামলা ছাড়া ঠিক কী পরিমাণ বকেয়া কর পাওনা রয়েছে এর সঠিক তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, অনাদায়ী অনেক ভ্যাট ও ট্যাক্স আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো বছরের পর বছর ধরে আনাদায়ী। করদাতারা কর ফাঁকি দেওয়া ও বিলম্বিত করার সুযোগ খুঁজে। কেউ কেউ আছে ট্যাক্স ধার্য হওয়ায় মামলা করে রাখে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান কর ফাঁকি দিয়ে দেশ ছেড়েও চলে যায়। বর্তমানে যেসব মামলা বিচারধীন আছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে বকেয়া কর পরিশোধের আহ্বান জানান তিনি। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো, এ বছর ভালো এবং প্রগতিশীল একটি বাজেট দেওয়া। এতে নতুনত্ব, জনকল্যাণ, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে কর বৃদ্ধি এবং উন্নয়নের নিয়ামকগুলো ইতিবাচকভাবে উল্লেখ থাকবে। তার মতে, দেশে করপোরেট কর বেশি। তাই এই কর কমানোর ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা চলছে। বিষয়টি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীও এ ব্যাপারে কিছু চিন্তা ভাবনা করছেন বলে উল্লেখ করে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর আরো কীভাবে কমানো যায়, সে বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। কতটুকু কমানো হবে সে বিষয়টি এখনই বলা যাচ্ছে না। শেয়ারবাজারে প্রণোদনা দিতে এ খাতের করও বিবেচনায় রয়েছে। তবে নতুন কোম্পানির শেয়ার অফলোড এবং কর অব্যাহতি সুবিধা কীভাবে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা পেতে পারে, তাও নিশ্চিত করতে হবে। এনবিআর চেয়ারম্যান আরো বলেন, বাংলাদেশের মতো পৃথিবীর কোনো দেশে শেয়ারবাজার এভাবে উঠানামা করে না। বাংলাদেশে ব্যাপক মাত্রায় উঠানামা করে। এতে বুঝা যায় বাজারে কারসাজি (গ্যাম্বলিং) হচ্ছে। তিনি বলেন, তামাক পণ্য নিরুৎসাহিত করছে সরকার। এক্ষেত্রে পণ্য সহজলভ্য হলে মানুষ ধূমপান বন্ধ করবে না। তাই কর বাড়িয়ে পণ্যের দাম বাড়াতে হবে। মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, সরকার রফতানি আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে রফতানি খাতে বর্তমানে যেসব প্রণোদনা আছে, তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি গার্মেন্ট খাতসহ অন্যান্য নতুন খাতগুলো কীভাবে প্রণোদনা দেওয়া যায়, সে ব্যাপারেও আলোচনা চলছে। এবারের বাজেটেও দেশীয় শিল্পে সুরক্ষা থাকবে। মোটরসাইকেলের রফতানি কীভাবে বাড়ানো যায়, সেক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, এফডিআই বাড়াতে দেশে প্যাকেজ সুবিধা রয়েছে। এছাড়াও বিশ^ব্যাংকের রিপোর্ট অনুসারে ব্যবসা সহজ করতে কাজ চলছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সব নিয়ম-কানুন মেনে কাজ করতে হবে। আয় বাড়াতে অটোমেশন কার্যক্রমের শুরুর চেষ্টা চলছে। এই অটোমেশন সম্পূর্ণ হলে ভ্যাট ও ট্যাক্স বাড়বে বলে জানান তিনি। প্রাক-বাজেট আলোচনায় গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাজেটে যে ধরনের সংস্কার হওয়া দরকার, গত কয়েক বছর পর্যন্ত তা হয়নি। সে কারণে কর জিডিপি অনুপাত বাড়েনি। জিডিপির অনুপাতে এখনো দেশে কর আদায় ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এই কর আদায় উচ্চ মধ্যম আয় এবং উচ্চ আয়ের দেশের তালিকায় যাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, এরপরও এবারের বাজেটে কিছু সংস্কার আনা উচিত। যেমন চলতি অর্থবছরে করপোরেট কর হার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে। আগামীতেও এটি ২ শতাংশ কমিয়ে আনা উচিত। এভাবে পর্যায়ে কমিয়ে ৫ বছরের মধ্যে করপোরেট ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। এতে রাজস্ব আয়ে বড় ধাক্কা আসবে বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন, বিভিন্ন খাতে কর আদায়ে বৈষম্য রয়েছে। মোবাইল কোম্পানির ক্ষেত্রে করের হার ৪৫ শতাংশ। এতে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে না। সম্পদের করের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে। একজন গ্রাহক ছোট একটি অ্যাপার্টমেন্ট কিনলে তাকে উচ্চ হারে কর দিতে হয়। কিন্তু যার বাড়ি আছে, সেই বাড়িওয়ালাদের কার্যকর কর নেই। এতে সুশাসনে বিঘিœত হয়। ন্যূনতম কর সীমা বেশি বাড়ানো হলে তা ইতিবাচক হবে না। এছাড়াও রাজস্ব বাড়াতে কর প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হতে হবে। পাশাপাশি কর অটোমেশন এবং নজরদারি বাড়াতে হবে। তার মতে, ভ্যাট অটোমেশন এখনো কার্যকর হয়নি। এর সঙ্গে আইনের দোহাই দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো আইনের সঙ্গে অটোমেশনের সম্পর্ক নেই। ১৯৯১ সালের আইন দিয়েও ভ্যাট অটোমেশন করা যায়। তিনি বলেন, ব্যক্তি খাত থেকে কর আদায় বাড়াতে হবে। তামাক পণ্যে কর আদায়ের বিষয়টি পুনর্বিন্যাস করা জরুরি। গত বছর ৮০ শতাংশ বাজার নিম্ন দামের সিগারেটের দখলে ছিল। বর্তমানে তা কমে ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। বিড়িকে দাম বাড়ানোর ভেতরে রাখতে হবে। কারণ ভোগ কমাতে মূল্য বাড়ানোর বিকল্প নেই।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, শিল্প সুরক্ষার সঙ্গে রফতানি আয়ের সম্পর্ক রয়েছে। তাই দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে হবে। তার মতে, ভিয়েতনাম আমাদের প্রতিযোগী দেশ। বর্তমানে দেশটির জিডিপি ২৩০ বিলিয়ন ডলার এবং রফতানি আয় ২২০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ৩৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রফতানিতে দেশটি এগিয়ে গেছে। তাই আমাদেরও রফতানি আয় বাড়ানোর প্রতি জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ কর কমানোর বিধান রয়েছে। কিন্তু গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে কমানো হয়েছে মাত্র ৫ শতাংশ। এতে অন্যরা বাজারে আসার ক্ষেত্রে উৎসাহিত হচ্ছে না। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে শেয়ারবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। ফলে এ খাতকে এগিয়ে নিতে হলে বাজেটে প্রণোদনা দিতে হবে। এক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ও তালিকার বাইরে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যে করে আরো পার্থক্য দরকার। বর্তমানে শেয়ারবাজারে বাইরে থাকা কোম্পানিগুলোর কর ৩৫ শতাংশ এবং শেয়ারবাজারের কোম্পানির কর ২৫ শতাংশ। এই কর আরো কমিয়ে ২০ শতাংশ করা উচিত। এতে ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত হবে। এছাড়াও কোম্পানিগুলোর ওপর বহুমুখী কর বসানো হয়েছে। বিশেষ করে কোম্পানির লভ্যাংশ থেকে বিনিয়োগকারীরা যে টাকা আয় করে সেখানে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর অব্যাহতি রয়েছে। এই সীমা আরো বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করতে হবে। তিনি বলেন, বিদেশি কোম্পানিগুলো রয়েলিটি, টেকনিক্যাল ফি এবং লাইসেন্স ফি বাবদ প্রতি বছর বড় অঙ্কের খরচ দেখায়। কিন্তু কোন আইনের ক্ষমতাবলে তারা এই খরচ দেখায় তা পরিষ্কার নয়। বিষয়টি পরিষ্কার করা উচিত।

কর ও পরামর্শ সেবা বিষয়ক আন্তর্জাতিক পেশাজীবী সেবা প্রতিষ্ঠান প্রাইজ ওয়াটার হাউস কুপারস প্রাইভেট লিমিটেডের (পিডব্লিউসি) কৌশলগত অংশীদার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মামুন রশীদ বলেন, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে বিনিয়োগের মহাযজ্ঞ দরকার।

"