জঙ্গি

গুম খুন ও নিখোঁজ রহস্যে জঙ্গি নির্মূলের সাফল্য ম্লান

প্রকাশ | ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে বিদায় নিল আরো একটি বছর। শুরু হলো ইংরেজি দিনপঞ্জির নতুন বছর ২০১৮। অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, চড়াই-উৎরাই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও আনন্দ-বেদনার সাক্ষী ছিল বিদায়ী বছরটি। একের পর এক জঙ্গি হামলা, গুম-নিখোঁজ আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যকর সব হত্যাকান্ড উদ্বেগ ছড়িয়েছে দেশে-বিদেশে। গেল বছর সারাদেশে সবচেয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল গুম-খুন ও রহস্যজনক নিখোঁজ এবং ‘মুক্তিপণহীন’ অপহরণের ঘটনা। বছরজুড়ে ৫৬ জন রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। এভাবে আস্ত একটি মানুষ হঠাৎ ‘লাপাত্তা’ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকেই সন্দেহের তীর ছিল স্বজনদের। তবে এদের মধ্যে মাত্র ১২ জন ফিরে আসাটাও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও নিখোঁজ এসব লোকের ফিরে আসায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো ভূমিকা ছিল না।

এদিকে, গেল বছরের শুরুতেই কিশোর গ্যাংস্টারদের হাতে খুনোখুনিতে অভিভাবকদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এরপর মার্চে মাত্র তিন মিনিটে ব্যাংকার স্ত্রীকে খুন, নভেম্বরে কাকরাইল ও বাড্ডায় পরপর দুটি জোড়া খুনে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয় দেশব্যাপী। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই জঙ্গি অভিযান। গেল বছর ১৮টি জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে ৩৮ জঙ্গি নিহত এবং দুই শতাধিক জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশান হামলার পর গত দেড় বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জঙ্গিদের পেছনেই ছুটতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এই সময়ে সারা দেশে অন্তত ৩০টি ছোট-বড় অভিযান চালায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে পাঁচ শিশু ও ছয় নারীসহ ৭১ জঙ্গি নিহত হয়।

গেল বছর দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন। আর সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনা ও উদ্বেগের প্রধান কারণ ছিল নিখোঁজ, গুম ও অপহরণের মতো বেদনাদায়ক ঘটনা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, গেল বছরটি ছিল জঙ্গিবাদ নির্মূলের বছর। তাদের দাবি, জঙ্গিরা তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে, এখন তারা সংগঠিত হয়ে বড় ধরনের কোনো নাশকতা চালাতে পারবে না। তবে ২০১৮ সালটি জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবিলায় তাদের জন্য আরো চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে।

অপরদিকে লোকমুখে আলোচনা ছিল একের পর এক নিখোঁজ, গুম, অপহরণের ঘটনা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছাত্র, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিক কেউই বাদ যাননি গুম-অপহরণের তালিকা থেকে। ভিকটিমরা নিখোঁজ, গুম, নাকি অপহরণের শিকার এই নিয়েও চলেছে বিতর্ক। তালিকায় স্থান পাওয়া কেউ কেউ ইতোমধ্যে ফিরে এসেছেন নীরবে, কারো কারো ফেরা নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। তবে না ফেরার তালিকাটাই দীর্ঘ। এদের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়েও অসন্তুষ্ট গুম বা অপহরণ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার। বিদায়ী বছরে কোনো মাসে একজন আবার কোনো মাসে একাধিক ব্যক্তি গুম, অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের কাউকে তুলে নেওয়া হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে, কেউ হঠাৎ করেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন স্বজনদের কাছ থেকে। এসব নিয়ে মানবাধিকার সংগঠন, রাজনীতির বিরোধীপক্ষ মাঝেমাঝে সরব হলেও আদতে তার তেমন প্রভাব পড়েনি। একটি ঘটনা ভুলতে বসার আগেই ঘটেছে আরেকটি ঘটনা। তবে বছরের শেষের দিকে এসে এসব অপহরণ বা গুমের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার তথ্য মতে, ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত অপহরণের ঘটনা ঘটেছে ২০৯টি। এর মধ্যে ১৬৭ জন পুরুষ, ৩১ জন নারী এবং ১১ জন শিশু অপহরণের শিকার হয়েছে। গত ১০ বছরে এ ধরনের ৫৪৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি নিখোঁজ হয়েছেন, যার মধ্যে ৩৯৭ জনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর চলতি বছরের ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিখোঁজ হয়েছেন ৫৬ জন, যাদের ৩৯ জনের এখনও খোঁজ মেলেনি। ফিরে এসেছেন বা পাওয়া গেছে মাত্র ১২ জনকে। অন্যদিকে বিএনপি দাবি করছে, ২০০৭ সাল থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত তাদের দলের ২০২ নেতাকর্মী গুম হয়েছেন।

সর্বশেষ গত ২৬ ডিসেম্বর সকালে ব্যাংকের শ্যামলী শাখা থেকে গুলশানে যাওয়ার পথে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন ব্র্যাক ব্যাংকের শ্যামলী শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাইমুল ইসলাম সৈকত। পরদিন তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় জিডি করা হয়। এখনো সৈকতের কোনো খোঁজ পায়নি পুলিশ। রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বর এলাকায় তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন। দেড় বছর ধরে তিনি ব্র্যাক ব্যাংকে চাকরি করছেন। এদিকে, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান বিমানবন্দর থেকে বিদেশ ফেরত মেয়েকে আনতে গত ৪ ডিসেম্বর বিকেলে ধানমন্ডির বাসা থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। তিনি এখনো ফেরেননি।

মজার বিষয় হচ্ছে, নিখোঁজ কিংবা অপহরণের শিকার কারো জন্যই কোনো ধরনের মুক্তিপণ চাওয়া হয়নি। কয়েকজন লোক গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে নিয়ে যায়; এরপর একটি বাড়িতে আটকে রাখে এবং একদিন আবার গাড়িতে করে রেখে যায়Ñনিখোঁজ হওয়ার পর ফেরত আসা সবার বক্তব্যই এ রকম। সর্বশেষ ফেরত আসা শিক্ষক মুবাশ্বির হাসান সিজার ও সাংবাদিক উৎপল দাসসহ নিখোঁজ বা অপহরণের পর আবার ফিরতে পারা ব্যক্তিরা এর বাইরে তেমন কিছুই বলছেন না। তথ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদন্ত করতেও বলছেন না কেউ। আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও নিজে থেকে তদন্ত করছে না। এমনকি মুখ খুলছে না উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনরাও। প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার স্বস্তি থাকলেও আবারও হারানোর শঙ্কা আছে তাদের মধ্যে।

এ বছরের আলোচিত কয়েকটি ‘নিখোঁজ’ ঘটনা : এ বছরের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হন। তবে নিখোঁজ হওয়ার চার মাস পর গত ২২ ডিসেম্বর তিনি ফিরে আসেন। পুলিশের দাবি, তিনি পালিয়ে ছিলেন। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ছুটি কাটাতে ঢাকায় এসেছিলেন কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ইশরাক আহমেদ (২০)। গত ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে ধানমন্ডির স্টার কাবাবে খেতে গিয়ে নিখোঁজ হন। চার মাস হয়ে গেলেও মেলেনি তার সন্ধান।

৭ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাস নিয়ে রাজধানীর আইডিবি ভবনে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান সিজার। সেই থেকে নিখোঁজ ছিলেন তিনি। অনেক জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গত ২১ ডিসেম্বর বনশ্রীর বাসায় ফিরে আসেন এই শিক্ষক।

কাতার ও ভিয়েতনামে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন মারুফ জামান। গত ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ধানমন্ডির বাসা থেকে মেয়েকে আনতে প্রাইভেট কারযোগে বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছানোর আগেই নিখোঁজ হন।

হন। সেদিন আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি তার। পরদিন রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকা থেকে তার গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। তার পরদিন বাসায় ফোন দেন মারুফ জামান। বলেন, কয়েকজন লোক বাসায় আসবে। তারা তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ ও ডেস্কটপটি নিয়ে যাবে। এরপর পরিবারের সঙ্গে তার আর কথা হয়নি। সেদিন দুপুরে তার মেয়ে সামিহা জামান ধানমন্ডি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছেন। এখনো বাড়ি ফেরেননি মারুফ জামান।

গত ১০ অক্টোবর মতিঝিল এলাকা থেকে হঠাৎ নেটওয়ার্কের বাইরে চলে যান পূর্ব-পশ্চিমবিডি ডটকম নামে একটি অনলাইন পোর্টালের সিনিয়র রিপোর্টার উৎপল দাস। নিখোঁজের কয়েক দিন পর টাঙ্গাইলের একটি হাসপাতালে উৎপলের সন্ধান পাওয়ার গুজব শোনা গেলেও সেখানে পাওয়া যায়নি তাকে। অবশেষে গত ১৯ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভুলতা এলাকায় তাকে পাওয়া যায়।

চলতি বছরের ৩ জুলাই ভোর সাড়ে ৫টায় নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন বিশিষ্ট লেখক, কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ফরহাদ মজহার। নিখোঁজের পর তাকে অপহরণের অভিযোগ করে তার পরিবার। তবে সেদিন সন্ধ্যায় ফরহাদ মজহারকে খুলনার হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধারের পর শুরু হয় আসল নাটক। দীর্ঘ ১০ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। তদন্তের এক পর্যায়ে পুলিশ জানায়, ‘ফরহাদ মজহার স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছিলেন।’ এরপর ২৮ ডিসেম্বর মিথ্যা নাটক সাজানোর দায়ে ফরহাদ মজহার-দম্পতির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে পুলিশ।

গত ২২ আগস্ট বনানী ওভারপাসের নিচে একটি মাইক্রোবাস থেকে বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী সৈয়দ সাদাত আহমেদকে অন্য একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়। গত চার মাসেও খোঁজ মেলেনি সাদাতের।

স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও বেলারুশের অনারারি কনসাল অনিরুদ্ধ রায়। ২৭ আগস্ট বিকেলে গুলশানের ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে থেকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয় তাকে। তবে আকস্মিকভাবে কোনো পুলিশি সহায়তা ছাড়া অপহরণের ৭৯ দিনের মাথায় অজ্ঞাত স্থান থেকে বাড়ি ফিরেন তিনি। তবে তিনি কোথায় ছিলেন এবং কীভাবে ফিরেছেন এ বিষয়টি এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।

২৭ অক্টোবর রাজধানী থেকে নিখোঁজ হন নবগঠিত দল বাংলাদেশ জনতা পার্টির (বিজেপি) সভাপতি মিঠুন চৌধুরী এবং এই জোটের নেতা আশিক ঘোষ। একটি কালো গাড়িতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে সাদা পোশাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে দাবি করে পরিবার। প্রায় আড়াই মাসেও মেলেনি তাদের সন্ধান।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গেল বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৩২১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪৯ জন। এদের মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে ১৩৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় মারা গেছে ৪২ জন। আর আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ১১টি সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত হয়েছে মাত্র একজন।

গেল বছরেও নারী ও শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচার চলেছে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৭৫১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে শিশু আছে ১৭০ জন। ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৪৯ জন। আত্মহত্যার শিকার হয়েছে ১১ জন। ৯৭ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টাও হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, সারা দেশে শিশু নির্যাতনের ৯৮৩টি ঘটনা ঘটেছে। ৫৭৪টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। ২৭টি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ বছরের নিচে শিশু হচ্ছে ১৩৯। আর ৭-১২ বছরের শিশু আছে ১৩৫। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১৮৭টি।

জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সীমান্তে হত্যার শিকার ১৮ বাংলাদেশি। বিএসএফের গুলিতে আহত হয়েছে ৩২ জন। তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৩৮ জনকে। এদের মধ্যে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে ১৩ জনকে। জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে ১৫১ জন। এদের মধ্যে র‌্যাবের হাতে ৩৩ ও পুলিশের হাতে ১০০ জন নিহত হয়েছে। এসবের মধ্যে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৯১ জন।

জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসবের মধ্যে সংখ্যালঘুদের ৪৫ ঘর ধ্বংস কিংবা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্দির ও বিভিন্ন প্রতিমা ভাংচুর হয়েছে ১৭৪টি। এতে ৫৭ জন আহত হয়েছে। এসব হামলায় মারা গেছে একজন।

বছরের আলোচিত হত্যাকান্ড : বছরের শুরুতেই একদল কিশোরের গ্যাংওয়ারে প্রাণ হারায় উত্তরা ট্রাস্ট কলেজের ছাত্র আদনান কবির। একই রকম ঘটনায় বছরটিতে আরো কয়েকজন কিশোর নিহত হয়। এছাড়া সম্পদ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে কাকরাইলে মা-ছেলে এবং স্ত্রীর পরকীয়ায় বাড্ডায় বাবা-মেয়ে হত্যার ঘটনায় চমকে গিয়েছিল গোটা দেশ। বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন্নেসা আরিফা, এএসপি মিজানুর রহমান, হোটেল আল আরাফাতের ব্যবস্থাপক আনোয়ার হোসেন, উদীচী নেত্রী লিজা, মাদ্রাসা ছাত্র জিদান, ব্যবসায়ী সিদ্দিক ও মনজিল হত্যাকান্ড।

ভয়ানক গ্যাং কালচারের বলি স্কুলছাত্র আদনান : ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় উত্তরায় একদল কিশোর উত্তরার ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবিরকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব কিশোর এতটাই বেপরোয়া ছিল যে, আদনানকে হত্যার জন্য বের হওয়ার আগে তারা ফেসবুকে গ্রুপ ছবি পোস্ট করে জানান দেয়। ছবিতে তাদের সবাইকে নীল রঙের পোশাকে দেখা গেছে। কারো কারো হাতে ছিল হকিস্টিক।

ঘটনার সূত্রপাত ৩ জানুয়ারি। ওইদিন উত্তরায় কিশোরদের গ্যাং ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস গ্রুপের সদস্যরা নাইন স্টার গ্রুপের গ্যাং লিডার রাজুকে ১৩নং সেক্টর ব্রিজের ওপর মারধর করে। প্রতিশোধ নিতে ৫ জানুয়ারি আজমপুর ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায় নাইন স্টার গ্রুপের সদস্যরা বিগ বসের গ্যাং লিডার ছোটনকে আক্রমণ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ডিসকো বয়েজ ও বিগ বস গ্রুপের সদস্যরা রাজুকে মারতে যায়। তাকে ধরতে না পেরে নাইন স্টার গ্রুপেরই অপর সদস্য আদনান কবিরকে ধারালো অস্ত্র ও হকিস্টিক দিয়ে পিটিয়ে মারে তারা। পরে চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকান্ডে জড়িতরা ধরা পড়ে।

মাত্র ৩ মিনিটে ব্যাংকার স্ত্রীকে খুন : গেল বছরের ১৬ মার্চ সেন্ট্রাল রোডে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে ইডেন কলেজের সাবেক ছাত্রী ও যমুনা ব্যাংক কর্মকর্তা আরিফুন নেছা আরিফাকে কুপিয়ে হত্যা করে তার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন। হত্যাকান্ডের আগে-পরের দৃশ্য ধারণ করা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আরিফাকে খুন করতে মাত্র তিন মিনিট সময় নিয়েছিলেন রবিন। ঘটনার আট দিন পর ধরা পড়ে আসামি। পরে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন।

ছিনতাইকারীদের হাতে খুন এএসপি মিজান ও ছয় বছরের শিশু : হাইওয়ে পুলিশের সহকারী কমিশনার (এএসপি) মিজানুর রহমান তালুকদারকে খুনের ঘটনাটিও বিদায়ী বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। ২১ জুন রাজধানীর মিরপুর বেড়িবাঁধের বিরুলিয়া ব্রিজ থেকে প্রায় ৫০০ গজ উত্তরে ঢাকা বোর্ড ক্লাবের সামনে থেকে এই পুলিশ কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে তদন্তে জানা যায়, সাধারণ মানুষ ভেবে মিজানকে প্রাইভেট কারে তুলে নেয় ছিনতাইকারীরা। পুলিশ জানার পর তাকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে যায়।

অপর ঘটনাটি গত ১৮ ডিসেম্বরের। বড় ছেলে আলামিনের চিকিৎসার জন্য সপরিবারে শরীয়তপুর থেকে ঢাকায় আসেন শাহ আলম গাজী ও আকলিমা বেগম। ভোরে তারা সদরঘাটে নামেন। রিকশায় করে শনিরআখড়ায় যাচ্ছিলেন। রিকশা দয়াগঞ্জ মোড়ে পৌঁছলে ছিনতাইকারীরা চলন্ত অবস্থায় আকলিমার কাছ থেকে ব্যাগে টান দেয়। এতে আকলিমা ও তার ছয় বছর বয়সী ছেলে আরাফাত নিচে পড়ে যায়। গুরুতর আহত শিশুটিকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। গত ২৩ ডিসেম্বর ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারী রাজীবকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় রাজীব। অপরদিকে ছিনতাইকারীদের আস্ফালন হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এর কয়েক দিন পরই রাজধানীতে সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। ওই অভিযানে ৫৬ ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার করা হয়।

সম্পদের দ্বন্দ্বে মা-ছেলেকে গলা কেটে হত্যা : গেল বছরের অন্যতম আলোচিত হত্যাকান্ডগুলোর মধ্যে একটি ছিল কাকরাইলে নিজ বাসায় মা শামসুন্নাহার করিম ও ছেলে সাজ্জাদুল করিম শাওনকে গলা কেটে হত্যা। ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় কাকরাইলের পাইওনিয়র গলির ৭৯/১ নম্বর বাসায় এ হত্যাকান্ড ঘটে। এ ঘটনায় শামসুন নাহারের স্বামী আবদুল করিম ও তার তৃতীয় স্ত্রী শারমিন আক্তার মুক্তা এবং মুক্তার ভাই আল আমিন জনিকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা তিনজনই জোড়া খুনের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে করিমের অধিকাংশ সম্পত্তির মালিক ছিলেন প্রথম স্ত্রী শামসুন্নাহার। এই নিয়ে মুক্তার মধ্যে অসন্তোষ ছিল। তাই বোনের স্বার্থ বিবেচনায় শামসুন্নাহারকে হত্যার পরিকল্পনা করে মুক্তার ভাই জনি।

বাড্ডায় পরকীয়ার বলি বাবা-মেয়ে : কাকরাইলে মা-ছেলে খুন হওয়ার ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই ৩ নভেম্বর রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় খুন হন বাবা জামিল শেখ ও তার নয় বছরের মেয়ে নুসরাত আক্তার জিদনী। পুলিশের তদন্তে জানা যায়, জামিলের স্ত্রী আরজিনা বেগম ও তার পরকীয়া প্রেমিক শাহীন মল্লিক পূর্বপরিকল্পিতভাবে দুজনকে খুন করেন। গ্রেফতারের পর দুই আসামিই হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

"