রাজনীতি

আলোচনায় জোট রাজনীতি কৌশল না অন্য কিছু

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ, জোট গঠনের চেষ্টা, জোট ও দল ভাঙ্গা-গড়া এবং ছোট জোট নিয়ে বড় জোটের নানা কৌশলের খেলা বিদায়ী বছরজুড়ে ছিল রাজনীতিতে। মূল লক্ষ্য ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেটিকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন গুরুত্ব পেয়েছে জোট রাজনীতি; তেমনি দুই বড় দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির বাইরে তৃতীয় শক্তি গড়ার চেষ্টাও ছিল একশ্রেণির রাজনীতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মাঝে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণের আলোচনা যেমন উঠেছিল; আবার ২০ দলীয় জোট ভাঙনের আশঙ্কাও করা হচ্ছিল। ইসলামী দলগুলো বারবার ঐক্য গড়ার চেষ্টা করেছে। আবার দল ভাঙ্গার ঘটনাও ঘটেছে।

দুটি জোট অবশ্য শেষ পর্যন্ত আত্মপ্রকাশ করেছে। একটি জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ৫৮টি নামসর্বস্ব রাজনৈতিক দল নিয়ে ‘স?ম্মি?লিত জাতীয় জোট’, অন্যটি সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে সভাপতি করে চার দলের সমন্বয়ে ‘যুক্তফ্রন্ট’। অবশ্য গঠনের শুরুতেই এরশাদের জোট থেকে ২১টি দল বের হয়ে যায়। আর দফায় দফায় বৈঠক করেও শেষ পর্যন্ত ফ্রন্টে যোগ দেননি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। গঠনের আগে যতটা তোড়জোড় শোনা যাচ্ছিল, পরে এই নিয়ে রাজনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়তে দেখা যায়নি। ফলে ঠিক তৃতীয় শক্তি হয়ে ওঠা হয়নি তাদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, আগামী নির্বাচন কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করছে এসব দল-জোটের ভবিষ্যৎ। আগামী নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো হলে এসব নামসর্বস্ব দল ও জোটের নেতারা গুরুত্ব পাবেন। তবে এসব জোট ও দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা যায় না।

অবশ্য অপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মীজানূর রহমান শেলীর কাছে এই জোট ও নতুন দলের আত্মপ্রকাশ দেশে ‘অস্থিতিশীল রাজনীতির প্রতিফলন’। তিনি বলেন, এখন দেশে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চালু রয়েছে বলে মনে করা হয়, তা নির্ভেজাল, খাঁটি ও অকৃত্রিম গণতন্ত্র নয়। এখানে ঘাটতি রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সবাই সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠে। এখানে রাজনীতির কিছু নেই।

বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে ৫৮ দলীয় সম্মিলিত সামাজিক জোটের (ইউএনএ) আত্মপ্রকাশ। দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বড় জোট। অথচ সেই জোটের মাত্র দুটি দলের নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন রয়েছে। বাকিগুলো নামসর্বস্ব। এই নিয়ে বেশ হাস্যরস দেখা দেয় রাজনীতিতে। পরে অবশ্য গঠনের চার মাসের মাথায় সে জোট থেকে বেরিয়ে আসে ২১টি ইসলামী দলের জোট জাতীয় ইসলামী মহাজোট। ফলে ওই জোটের অস্তিত্ব নিয়েই সংশয় দেখা দেয়।

অপরদিকে জাতীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগির লক্ষ্য নিয়ে চার দলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে নতুন জোট যুক্তফ্রন্ট। চেয়ারম্যান করা হয় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। কো-চেয়ারম্যান করা হতে পারেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে। তবে গঠনের শুরুতেই নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। আ স ম রবের বাসায় অনুষ্ঠিত দলগুলোর বৈঠকে মান্নাকে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। ফলে দফায় দফায় বৈঠক করেও শেষ পর্যন্ত ফ্রন্টে যোগ দেননি তিনি। আগামী নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে এই জোটের রূপরেখা দেওয়ার কথা রয়েছে। এই জোট নিয়েও কিছুদিন মুখর ছিল রাজনীতি। জোট গঠনকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

নতুন দল গঠনের ঘটনাও ছিল রাজনীতিতে। জাতীয় নির্বাচনকে লক্ষ করে বিজেপি, বিএমজেপিসহ অন্তত পাঁচটি নতুন দল হয়েছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন পাওয়ার আগেই ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণাও দিয়েছে দলগুলো। সর্বশেষ অক্টোবরে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান আদিবাসী পার্টিসহ সমমনা নামসর্বস্ব অর্ধশতাধিক সংগঠন নিয়ে গঠন করা হয় বাংলাদেশ জনতা পার্টি (বিজেপি)। একই সম্প্রদায় থেকে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) নামে আরেকটি দল। দল দুটি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দেয়। যদিও নির্বাচন কমিশনে কারো নিবন্ধন নেই।

এর আগে মার্চ ও এপ্রিলে ট্রুথ পার্টি, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম) ও বাংলাদেশ জনতা পার্টি নামে তিনটি দলের জন্ম হয়। দলগুলোর প্রতিষ্ঠাতারা আগে বড় দলে ছিলেন। গুরুত্ব হারিয়ে তারা নতুন দল করেন। বিএনপি ও এলডিপি হয়ে জনতা পার্টি গঠন করেন মামদুদুর রহমান। ট্রুথ পার্টির সভাপতি গোলাম হাবিব ও মহাসচিব গোলাম মাওলা চৌধুরী জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতা ছিলেন। এনডিএমের ববি হাজ্জাজও জাপায় ছিলেন।

আবার জোট ও দল ভাঙনের ঘটনাও ঘটেছে। বিএনপির সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় দলের নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট ছাড়ে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)। পার্টির প্রধান শওকত হোসেন নীলু (বর্তমানে প্রয়াত) কিছু নামসর্বস্ব দল নিয়ে গড়ে তোলেন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (এনডিএফ)। পরে অবশ্য এনপিপি ও জোট দুটিই ভেঙে যায়। এনপিপির মহাসচিব আবদুল হাই মন্ডল নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। তিনি অচেনা কিছু সংগঠন নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স নামে আরেকটি জোট গড়েন। এর প্রধান সমন্বয়কারী হন আলমগীর মজুমদার, যিনি বিএনপি জোটের শরিক ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) ভেঙে নীলুর এনডিএফে যোগ দিয়েছিলেন। এপ্রিলে দুই ভাগ হয় প্রয়াত মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। একই সময়ে ভাঙে বিএনপির সাবেক নেতা নাজমুল হুদার গড়া কথিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (বিএনএ)। বিএনএর অধিকাংশ দল যোগ দেয় এরশাদের সম্মিলিত জাতীয় জোটে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ লেবার পার্টি ভেঙে গেছে। দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে। দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে দলের নতুন চেয়ারম্যান করা হয়েছে দু’জনকে। দুই পক্ষই গণমাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান মনোনীত করার কথা জানিয়েছে।

ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক পার্টিও দুই ভাগ হয়। কোরেশী অসুস্থ হলে দলের এক নেতা দেলোয়ার হোসেন নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। পরে কোরেশীর স্ত্রী নিলুফার পান্নাকে পিডিপির কো-চেয়ারম্যান করা হয়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সম্প্রসারণের কথাও উঠেছিল রাজনীতিতে। এই নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল ‘মনোমালিন্য’। মূলত মে মাসে ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশের ১৪ দলীয় জোটে যোগদানের প্রস্তাব নিয়ে জোটনেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জোট সম্প্রসারণের বিষয়টি সামনে আসে। এর আগে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের হয়ে নির্বাচনে অংশ নিলেও দলটির সভাপতি সৈয়দ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী জয়লাভ করতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে নিয়মিতই সরব ছিল দলটি। তবে শরিক দলগুলোর বাধার মুখে শেষপর্যন্ত সম্প্রসারণ বিষয়ে আর কোনো আলোচনা শোনা যায়নি।

আওয়ামী লীগের মহাজোট থেকে জাতীয় পার্টিকে বাদ দেওয়ার কথা শোনা গেছে। তবে দলীয় সূত্র মতে, জোট থেকে জাতীয় পার্টিকে বাদ দিতে চায় না আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সাল থেকে জাতীয় পার্টি ঐকমত্যের সরকারে আছে। নতুন জোট করলেও সরকারের সঙ্গে থাকবে জাতীয় পার্টি। বিএনপিকে ইসলামপন্থি মিত্রদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক ধরনের রাজনীতি চলেছে। এরই অংশ হিসেবে ইসলামী ঐক্যজোট এর আগে ২০-দলীয় জোট ত্যাগ করে। আবার হেফাজতে ইসলামের সঙ্গেও বিএনপির এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। অন্যদিকে, কওমি সনদের স্বীকৃতি এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের পক্ষে সরকারের অবস্থান হেফাজতকে সরকারের কাছাকাছি আনে। হেফাজত ১৪ দলীয় জোটে আসছে, শোনা গেছে এমন কথাও।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের মধ্যে নিবন্ধন নেই ১২ দলের। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল চারটি। এসব জোটবদ্ধ দলের কতগুলো নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা রাখে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। আসলে নামসর্বস্ব এসব দল চেষ্টা করছে জোটের কাঁধে ভর করে রাজনীতি করার। অন্যদিকে নামসর্বস্ব দল নিয়ে জোট ভারী করে রাজনীতি করছে বড় দলগুলো। জোটের আকার যত বড় হবে প্রতিপক্ষকে তত বেশি চাপে ফেলারও সুযোগ হবেÑএমন ধারণা থেকেই মূলত জোট গঠনের প্রতিযোগিতা হচ্ছে বলেও মনে করেন তারা।

"