গল্প

নিরাবয়ব

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২০, ০০:০০

দীন মোহাম্মদ

ইয়াকুব আলীকে নিয়ে গল্প লেখা যায় কি না অথবা লেখা হলে গল্পের কোনো চরিত্র হয় কি না, তা নিয়ে অনেক দিন ভেবেছি। ইয়াকুবের জীবন-মৃত্যু একেবারেই সাদামাটা অথবা বলা যেতে পারে গয়রহ। ৩০ লাখ শহিদের মধ্যে একজন ইয়াকুব। ইতিহাসের পাতায় তার নাম নেই। চরিত্র চিত্রণ নেই। ইয়াকুব একটি সংখ্যা। যে সংখ্যা নিয়ে আমরা বিজয় দিবসে, স্বাধীনতা দিবসে, আরো কত কী দিবসে বক্তৃতা দিই; তবে সেই বক্তৃতায় শহিদের সংখ্যা থাকে, নাম থাকে না, এমনকি যিনি বক্তৃতা দেন তার কোনো আবেগ থাকে না, গলার স্বরে বেদনার সুর ফুটে ওঠে না।

ইয়াকুব আলী বুদ্ধিজীবীও ছিলেন না। বুদ্ধিজীবী হতে হলে যতগুলো শ্রেণি বা ধাপ পেরোতে হয়, তার প্রথম ধাপ পেরোতেই বাবা তাকে বলেছিল, ‘বাবা রে, অনেক ত পড়া অইলো, আমি যে আর পারতাছি না। অহন থাইক্কা তুই আমার লগে খেতে লাইগ্যা যা।’

ইয়াকুব বুঝতে পেরেছে তার আর ওপরের ক্লাসে পড়ার সুযোগ হবে না। এই গ্রামে এরচেয়ে বেশি পড়ারও সুযোগ নেই। ওপরের ক্লাসে পড়তে হলে যেতে হবে শহরের স্কুলে। তা-ও আবার তার বাড়ি থেকে পাঁচ মাইল। শহরের স্কুলে কত খরচ! পোশাক, জুতা, বই, স্কুলের ফিস; তা যে সম্ভব নয় তার বাবার পক্ষেÑ ইয়াকুব বুঝতে পেরেছিল। বলল, ‘বাবজান, আমার বড় আশা ছিল শহরের স্কুলে ভর্তি হব। কিন্তু কী আর করা!’

তারপর থেকেই ইয়াকুব একজন পুরোদস্তুর দিনমজুর। তবে তার একটা বাতিক ছিলÑ সন্ধ্যার পরে গঞ্জে যাওয়া, গোপাল ডাক্তারের চেম্বারে রাখা দৈনিক পত্রিকা পড়া, তারপর হাসু মহাজনের দোকানে বসে রেডিওতে বিবিসি শোনা। ঝড় হোক, বৃষ্টি হোক তার এই অভ্যাস কোনো দিন ত্যাগ করেনি।

পত্রিকা পড়তে পড়তে এবং রেডিওর বিবিসি অনুষ্ঠান শুনতে শুনতে ইয়াকুবের কাছে হাল-জমানার সব খবর ছিল নখদর্পণে। মওলানা ভাসানী বক্তৃতায় কী বলেছেন, শেখ সাহেব কী বলেছেন, আইয়ুব খান কী করতে যাচ্ছেনÑ ঘটনার পরম্পরা তার এমন গাথা হচ্ছিল সে এখন বলতে পারে আগামীকাল কী হতে যাচ্ছে।

দেশে তখন চারদিকে হট্টগোল। আইয়ুব খানকে গদি থেকে নামাতে হবে। শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা। আইয়ুব খান তাকে জেলে পুরে রেখেছে। এত ঘটনার মধ্যেও রেডিও পাকিস্তানের খবর শুনলে মনে হয়, দেশে শান্তির নহর বইছে। অথচ বিশ^বিদ্যালয়, কলেজে সব জায়গায় মিছিল আর মিছিল।

গ্রামের মানুষ রেডিও বিবিসি শুনতে পায় না। কোনো পত্রিকাও গ্রামে আসে না। পত্রিকা পড়ার লোকজনও কম। কিন্তু দেশের গরম বাতাস তারা টের পায়। কিছু জানতে হলে তারা ইয়াকুবের দ্বারস্থ হয়। এখন অনেকে তাকে ডাকে বিবিসি ইয়াকুব আলী।

ইদানীং তার আরেকটা বাতিক হয়েছে। সকালে শহরে চলে আসে। কলেজ প্রাঙ্গণে, রথখোলার মোড়ে প্রায় দিনই বড় বড় সভা হয়। সভা শেষে মিছিল হয়। মিছিলের অগ্রভাগে থাকে ইয়াকুব। তার গলার স্বর অনেক উঁচু। সে সেøাগান তোলে জয়বাংলা।

নেতানেতৃরাও এখন ইয়াকুবকে চেনে। মিছিল শুরু হলে তাকে সবাই সামনে ঠেলে দেয়। সে বুক ফুলিয়ে সেøাগান তোলে। ইয়াকুব এখন আর অজানা-অচেনা অজ পাড়াগাঁয়ের মানুষ নয়। শহরে সব মানুষের একজন পরিচিত মুখ। রাজনীতির ময়দানে তুখোড় কর্মী। বড় নেতা, পাতি নেতা সবার কাছে তার খুব কদর। মিছিল হলে ইয়াকুব ছাড়া চলে না।

দুই বছর পরেই শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। পাকিস্তানিরা এ দেশ ছাড়বে না। বাঙালিরাও তাদেরকে দেশে রাখবে না। রাতের আঁধারে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাঙালি নিধনে ঢাকায় নেমে পড়ে। বিবিসির খবরে বলেছে, একরাতেই নাকি ৫০ হাজার নিরীহ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে। মানুষজন ঢাকা থেকে পালিয়ে আসছে। ট্রেনে, নৌকায়, কেউবা হেঁটে। সঙ্গে বৌ-ছেলে-মেয়ে। তার গ্রামেরও দুটি পরিবার আগে ঢাকায় বসবাস করত। বড় চাকরি করত। গ্রামে তাদের কোনো দিন আসতে দেখেনি ইয়াকুব। তারা তিন দিন হেঁটে গাজীপুর হয়ে গ্রামে এসে পৌঁছেছে। ইয়াকুব এদের দেখতে গিয়েছিল। একটা মেয়েকে দেখে তার খুব মায়া হলো। মোমের মতো চেহারা। এত পথ হেঁটে এখন সে শয্যাশায়ী।

সারা দেশ দখলে নিয়ে ফেলেছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সঙ্গে যোগ দিয়েছে ঘাপটি মেরে থাকা এ দেশীয় দোসর। ইয়াকুব এখন নিজ গ্রামে। তার প্রিয় শহর অবরুদ্ধ। তবে সে গোপনে খবর পেয়েছে পাশের গ্রামের কয়েকজন পালিয়ে গেছে ভারতে। সেখানে ট্রেনিং চলছে। ট্রেনিং শেষে অস্ত্র নিয়ে তারা যুদ্ধে নামবে।

ইয়াকুব চিন্তা করে, সে কোনো দিন মফস্বল শহর ছেড়ে বাইরে যায়নি। ভারতে কীভাবে যেতে হবে, যোগাযোগের ব্যবস্থা কী, সে কিছুই জানে না। ভারত যেতে হলে আবার টাকার দরকার। তার বাবার যে অবস্থা, এক টাকাও পাবে না। বাবা যে রাজি হবে, তারও নিশ্চয়তা নেই।

এক রাতে সে খবর পায়, পাশের গ্রামের নজরুল যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাতেই নজরুলের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। নজরুল তাকে বলে, ‘ভয় নেই, আমরা এখান থেকে তাড়াইল চলে যাব, রাতে একজনের বাড়িতে থাকতে হবে। সকালে নৌকায় ইটনা। ইটনা থেকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর। তারপর হেঁটে...। ইয়াকুব মন দিয়ে শোনে। বলে,

: তবে যে অনেক টাকার দরকার। আমার কাছে আছে মাত্র ১০ টাকা।

: অসুবিধা নেই। আমার কাছে টাকা আছে, কাল সকালে চলে আসিস।

তার আর সকালে আসা হয়নি। যুদ্ধে যাওয়ার প্রবল তাড়না নিয়ে সে বাড়িতে আসছিল। একটা প্রচন্ড জেদ আর ঘৃণা তার বুকের ভেতর অনুভব করছিল। বিবিসির খবরে সে শুনেছে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদের গুলি করে হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, অনেক মেয়েকেও তারা ধর্ষণ করেছে। যদি সে যুদ্ধে যেতে পারে, যদি তার হাতে একটা অস্ত্র থাকে, একটা পাকিস্তানি সৈনিক সে হত্যা করতে পারে; তবে তার জীবন সার্থক হবে। বড় রাস্তায় একটু এগোতেই সামনে পড়ে তিনজন। সবারই হাতে বন্দুক। ইয়াকুব বুঝতে পেরেছে এরা রাজাকার। নাকডাঙ্গার কালভার্ট পাহারা দিচ্ছে। ওকে দেখে একজন চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘রোখো, হট যাও’। তিনজন তিনপাশে এসে দাঁড়ায়,

: কিয়া নাম হ্যায়?

: ইয়াকুব আলী।

: এতনা রাত মে কাহা সে আয়া?

: পশ্চিমপাড়া গিয়েছিলাম দরকারি কাজে।

একজন তার নিজের গোঁফে তা দেয়। বন্দুক ইয়াকুবের বুক বরাবর ধরে বলে,

: মালুম হোতা হ্যায়, এই আদমি দুষ্কৃতকারী হ্যায়। বলে অন্যজনের দিকে তাকায়।

: হতে পারে। চল বসের কাছে নিয়ে যাই।

ইয়াকুবের দুহাত পেছনে নিয়ে আড়াআড়ি করে বেঁধে ফেলে। তাকে হালের বলদের মতো খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে শহরের ক্যাম্পে নিয়ে আসে।

ইয়াকুব বুঝতে পারছে না এরা উর্দুতে কথা বলে কেন? একজনকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। তাকে শহরে দেখেছে বড় বাজারে কুলির কাজ করতে।

শহরে ঢুকতেই নদীর পাড়ে একটা পাটগুদাম। এখন গুদামে পাট নেই। এটাকে মিলিটারি ক্যাম্প বানানো হয়েছে। ক্যাম্পের সামনের গেটে আসতেই একজন চিৎকার করে বলে উঠল, ইয়ে কৌন হ্যায়?

: দুষ্কৃতকারী। একজন উত্তরে বলল।

: ভেতরে নিয়ে যাও।

গুদামের এক কোণে একটা খুঁটির সঙ্গে ইয়াকুবকে বেঁধে ফেলল। তার খুব পানির তেষ্টা পেয়েছিল। সে পানি তাদের কাছে চাইবে কি না, এমন সময় একজন আর্মি তার সামনে এসে দাঁড়াল,

: কিয়া নাম?

ইয়াকুবের ভেতর থেকে একটা শব্দ বের হলো, ইয়াকুব আলী।

: মুসলমান হ্যায়? ইয়াকুব মাথা নত করে।

: কাপড়া তোলো।

একজন রাজাকার তার লুঙ্গি খুলে।

: ইয়ে মুসলমান আদমি হ্যায়। কিঁউ জয়বাংলা বলতা হ্যায়?

ইয়াকুব চুপ করে থাকে।

: বাতাও, পাকিস্তান জিন্দাবাদ। ইয়াকুব কোনো শব্দ করে না। তার মনে হচ্ছে, সে যেন শূন্যে ভাসছে। সেখানে সাদা সাদা মেঘ। নিচে বাড়িঘর, সবকিছু সবুজে ঢাকা।

: এই বেডা চুপ কইরা আছছ ক্যান? বল পাকিস্তান জিন্দাবাদ।

ইয়াকুব এবার চুপ করে থাকে না। ভেতরের সব শক্তি নিয়ে চিৎকার করে ওঠেÑ নেহি। আর্মি এত বড় বেয়াদবি দেখে চুপ করে থাকতে পারি না। সে সজোরে তার পায়ের বুট দিয়ে লাথি মারে ইয়াকুবের থুতনি বরাবর। তার মাথা পেছন দিকে হেলে পড়ে। থুতনি ফেটে অঝোরে রক্ত ঝরতে থাকে বুক বেয়ে।

ইয়াকুব যেন আবার শূন্যে ভাসছে। নিচে বিরাট মিছিল। সামনে তার প্রিয় নেতা। সবাই সেøাগান তুলছে জয়বাংলা, জয়বাংলা। ইয়াকুব তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সেøাগান তোলে, জয়বাংলা, জয়বাংলা।

তারপর একটা গুলির শব্দ। সামনে-পেছনে শুধুই দ্যাখে সে অন্ধকার।

আজও অন্ধকারে আছে ইয়াকুব আলী। তার কোনো নাম নেই। সে এখন আছে একটি সংখ্যায়। সংখ্যাটি ৩০ লাখ।

 

"