সনেটের নতুন দিগন্ত

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০২০, ০০:০০

মৃধা আলাউদ্দিন

জীবনযাত্রার, চিন্তা, অভ্যাস ও রুচির ক্ষেত্রে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা এক বিরাট পরিবর্তন লক্ষ করছি প্রবাসী কবি রাজুব ভৌমিকের ‘আয়না সনেট’-এর এই চতুর্দশপদী কবিতাগুলোর মধ্যে।

তার স্বাভাবিক কবিতাগুলোও দেখা (পৃথিবীর একাংশ দেখে ফেলেছেন এই কবি) ও সময়ের বিবর্তনে অতীতের মতো সীমাবদ্ধ বা সীমিত নয়। প্রেমিক-প্রেমিকার পারস্পরিক কামনা-বাসনাতে সীমিত নয় রাজুবের কবিতা। তার কবিতা পাঠকের সামনে সত্যকে অনুসন্ধানের এবং উপলব্ধির অবিরাম ভালোবাসা।

রাজুব ভৌমিকের কবিতা নতুন মানুষের জীবনে নতুন চাহিদা তৈরি এবং পরিপূর্ণ হওয়ার বারবার তাগিদ দেয়। কবিতার এই দুর্ভিক্ষের সময় রাজুব তার আয়না সনেট নিয়ে আমাদের চেতনায় ভিন্নস্বরের গান শোনালেন। আমাদের দিলেন নতুন ধানের ম ম গন্ধ। ভিন্ন স্বাদ, যুদ্ধের দামামাÑ ‘পেতে শুধু অবহেলা জন্মায় গরিব,/ক্ষেতে করে শ্রম বন্ধ্য, ফসলে মুনিব;/নিষ্ফল কপাল তার, শোষিত জীবন,/বলহীন বুকে সর্ব, লাথিতে মরণ।/গরিবের জন্ম ভবে, জন্য ভুলিবার;/পাপের কুদৃষ্টি যে, সারা জনম তার।’

রাজুব ভৌমিক কবিতার এই পারঙ্গমতার দুয়ারে, নিত্যনতুনের আখড়ায় ব্যথার পিরামিডসহ কাহারবা তালে কড়া নাড়ছেন। সমাজ-বাস্তবতা, শিল্পের সুন্দর-ষড়ৈশ্বর্য বয়ান ছাড়া তার কবিতায় সংকীর্ণ ও বোধহীনতা, সমাজের উদাসীনতা, প্রাপ্তির লোলুপতা, মেরুদ-হীনতা, দালালি মনোবৃত্তির তেমন কিছুই নেই।

রাজুব ভৌমিকের কবিতা প্রেম-ভালোবাসা, সমাজ বিপ্লবের, বিদ্রোহের, মনো-বিকাশের, রাষ্ট্র পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে আমাদের চাহিদাকে শিল্পের নান্দনিক মোড়কে উপস্থাপন করেছে। রাজুব আমাদের দিচ্ছেন পলিনড্রম কবিতার ঘ্রাণ, রমাকান্তকামারÑ বাংলা কবিতায় এ সত্যিই বিরল।

সংগত কারণেই রাজুব ভৌমিকের কবিতা ভাষাহীন অবস্থান থেকে ভাষাসূত্রশিল্পকে অবলম্বন করে নতুন দিগন্তে উপনীত হয়েছে। তাই তার কবিতা যেমন তার নিজের সৃষ্টি তেমনই পাঠকেরও। কারণ পাঠোদ্ধারের মধ্য দিয়ে পাঠক কবিতাকে নতুন করে, নতুনভাবে রচনা করেনÑ ‘সামনে সে বলে মধুতুল্য মিষ্ট কথা/পেছনে ঘটায় বিঘœ, বলিয়া অযথা/সারা দিনে বসিয়া ইন্দ্রিয় সুখাসনে/আশ্বিনে দেয় পূজা, শারদা উপাসনে।’

রাজুব ভৌমিকের কবিতায় আছে বহুমাত্রিকতা। এমন কোনো বিষয় নেই, যা নিয়ে তিনি লেখেননি। বহু দেশ ভ্রমণ করা এই কবি-পুরুষটি যখন যেখানে যা দেখেছেন, যা তার মনকে কষ্ট বা ভালোবাসার আগুনে পুড়িয়েছেনÑ তিনি তাই নিয়েই লিখেছেন।

বিদেশে থাকলেও তার মন সব সময় পড়ে রয়েছে আমাদের এই বাংলায়। তার নিজের জন্মভূমিতে। বাংলাদেশে। জন্মভূমির মায়া তিনি কখনো ত্যাগ করতে পারেননি। বাংলার আকাশ-বাতাস, তেপান্তর, নীল জোছনা, কাশবন, ধানখেত, রৌদ্র-মেঘের লুকোচুরি, মুক্তিযুদ্ধ, অসহায় সমাজের কথা, ধনী-গরিবের কথাÑ দেশের মানুষের সফলতা-অসফলতার কথা তার আয়না সনেটে উঠে এসেছে নিপুণতা এবং বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গেÑ ‘রুপালি মাছেরা, আনন্দে মাতায় নদী/অলি গানে গানে, নাচে দ্রৌপদী;/সবুজ-শ্যামল স্নিগ্ধতা, রূপসী বাংলা,/অবুঝ মনখানি, নাহি বুঝে গো জ্বালা/যতি দন না দেশে ফিরে আসিব শেষে/কঠিন মৃত্যু, বঙ্গ চিন্তায় পরিশেষে।’

রাজুব ভৌমিক বাংলা সনেটে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘বাংলা-সাহিত্য ভা-ারে নতুন কিছু জমা দেব বলে আমার এই ছোট্ট সৃষ্টিÑ আয়না সনেট। আয়না সনেট লেখার আগে আমি বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ধরনের সনেট নিয়ে প্রচুর গবেষণা করার চেষ্টা করেছি। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল একটাইÑ বিশ্বের সব ধরনের সনেট সম্বন্ধে জানা এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করা।’

বইটি বের হয়েছে অনন্যা প্রকাশনী থেকে। দাম ২০০ টাকা।

 

"