বই আর ভালোবাসা

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

সোহেল নওরোজ

বই এবং ভালোবাসা দুটো একই বর্গীয় শব্দ। এই মিলটা হয়তো ব্যাকরণগত ও নিছক কাকতালীয়। তবে বিষয় দুটোর মধ্যে বাস্তবিকই দারুণ সম্পর্ক রয়েছে। বইয়ের পৃষ্ঠায় ভালোবাসার প্রকাশ যত গভীর এবং বিচিত্রভাবে হয়ে আসছে তা বোধ করি আর কোথায় পাওয়া যায় না। একটু ঘুরিয়ে বললে বলতে হয়, ভালোবাসা ছিল বলেই এত এত কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস রচনা করা সম্ভব হয়েছে। প্রেমের আবেদনকে একেকজন একেকভাবে প্রকাশ করে থাকেন। প্রকাশের এই ভিন্নতা, অনুভূতির ব্যাপকতা, সম্পর্কের বহুমুখিতাকে নিজের মতো করে উপস্থাপন করতে গিয়েই লেখা হয়েছে এবং লেখা হচ্ছে অগণিত বই।

পৃথিবীতে বইয়ের বিষয় হিসেবে প্রেমকেই সবার ওপরে স্থান দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও অভিন্ন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। প্রতি বছর বইয়ের মেলা বসে ফেব্রুয়ারিতে। শত-সহস্র বইয়ের ভাঁজেও থাকে ভালোবাসার ঘ্রাণ। ভাষার মাসের বইমেলাতে প্রেমের গল্প-উপন্যাসই প্রকাশিত হয় সবচেয়ে বেশি।

ভালোবাসার উপকরণ হিসেবে ফুলের সঙ্গে বইয়ের জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। বইমেলার মাসেই আসে বসন্তের দিন, ভালোবাসার দিন। এ দুটো দিবস বইমেলাকে আরো বেশি রাঙিয়ে দেয়। বইমেলার ধুলো ভালোবাসার গল্প বলে, পঙ্ক্তি আওড়ায়। বাসন্তী শাড়ি, খোঁপায় গোঁজা হলদে ফুল আর গলার মালা তরুণীদের সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। পুরুষরাও পিছিয়ে থাকে না। লাল-হলুদ পাঞ্জাবি পরে জানান দেয় নিজেদের সপ্রভ উপস্থিতি। প্রিয়জনের হাতে হাত রেখে মেলা প্রাঙ্গণ মুখর করে তোলে। এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘুরে প্রিয় লেখকের বই কেনা চলে সারা দিন। লেখকের অটোগ্রাফে লিখে নেয় প্রিয় কিংবা প্রিয়ার নাম। তা পেয়ে ভালোবাসার পারদ আরও উঁচুতে উঠে যায়, খুশি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। সারা দিন ধরেই চলে এ আনন্দযজ্ঞ। এ যেন উৎসবের চেয়েও বড় কোনো উৎসব!

কেবল ভালোবাসার দিনে বইমেলার চাঞ্চল্য অন্য সব দিনকেই ছাপিয়ে যায়। যার প্রভাব পড়ে বইয়ের বিক্রিতেও। তাই অন্য দিনগুলোতে হাজির থাকতে না পারলেও লেখক-পাঠকরা ভালোবাসার দিনে ঠিকই বইমেলায় ছুটে আসেন। লেখকের অটোগ্রাফের পাশাপাশি সেলফি নেওয়ার প্রতিযোগিতাও চলে ধুমছে। প্রকাশকরাও বাড়তি রসদ পেয়ে যায় এদিন। স্টল ভরে ওঠে নানা ধরনের বইয়ে।

বইমেলায় ভালোবাসার বই প্রকাশ করার চল অনেক পুরোনো। এখনো সে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েনি। পাঠকদের চাহিদার কথা বিবেচনা করেই হোক আর ভেতরের তাড়না থেকেই হোক, ভালোবাসার কাহিনি বা আখ্যানকে গল্প-উপন্যাসে রূপ দিতে দেখা যায় অনেক লেখককেই। কবিতার শব্দে শব্দে চুইয়ে পড়ে প্রেমের আকুতি। সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে হুমায়ূন পর্যন্ত প্রসিদ্ধ কেউই বোধহয় প্রেমের গল্প বলতে বাদ রাখেননি। তবে বলার ধরনে ভিন্নতার কারণেই তা পাঠকের মনকে ভিন্নভাবে আন্দোলিত করেছে, সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। সময়ের সঙ্গে ভালোবাসা প্রকাশের ধ্যান-ধারণা বদলে গেছে। বলে গেছে লেখকের উপস্থাপনার কৌশলও। দিনে দিনে গল্প-উপন্যাস সংলাপপ্রধান হয়ে উঠছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় গতি পাচ্ছে কাহিনিতে। তবে এই বদল মূল জায়গায় কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ভালোবাসার অনুভূতি আজও সেই একই রকম আছে। প্রেমের কথা বদলে গেলেও সুর অবিকৃত রয়ে গেছে।

অন্যান্যবারের মতো এবারের বইমেলাতেও প্রকাশিত বইয়ের একটা বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে ভালোবাসার গল্প-উপন্যাস-কবিতা। এ ধরনের আরো কিছু বই প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। ভালোবাসার সঙ্গে বইয়ের এই সখ্য যুগ-যুগান্তর চলতেই থাকবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম আসবে, ভালোবাসাবাসি চলবে। আরো অনেক গল্প-কবিতা-উপন্যাস রচিত হবে ভালোবাসাকে জীব্য করে। পৃথিবী প্রেমের জয়গান গাইবে। এমনই কোনো দিনে এইখানা বই বাড়িয়ে দিয়ে তখনো হয়তো প্রিয়জনকে বলবে সেই একই কথাÑ আমি তোমাকে ভালোবাসি!

 

"