ভ্রমণ। পর্ব ২

মেঘ-পাহাড়ের সাজেক ভ্যালি

প্রকাশ | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

অপর্ণা খান

সাজেকের সাম্পারি রিসোর্টে পৌঁছে মন ভালো হয়ে গেল। কটেজের ভেতরটা খুব সুন্দর। কাঠের মেজ, চারদিকে বাঁশের দেয়াল, ওপরে টিনের চাল, অ্যাটাচ বাথরুমÑ সবকিছু আছে, শুধু গিজার ছাড়া। ওখানে সন্ধ্যার পর মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। নেটওয়ার্ক নেই। সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্নÑ এমন নিরিবিলি জায়গাই খুঁজছিলাম। ঠান্ডা জলে স্নান সেরে বারান্দায় বের হলাম। পাশের কটেজে হেনা আপা ও সাখাওয়াত ভাই। দেখি, সাখাওয়াত ভাই বারান্দায় ছবি তুলছে। আমাকে দেখেই বলল, ওইভাবেই দাঁড়িয়ে থাকুন, ছবি তুলব। তার প্রিয় ফটোগ্রাফি। যেখানেই যান ছবি তোলায় মগ্ন থাকেন। তার বউ এবং ফুল পাখি প্রকৃতির ছবিই বেশি তোলেন। মাসে দু-তিনবার হেনা আপাকে নিয়ে কোথাও না কোথাও ফটোগ্রাফি করতে নিয়ে যান। সুখী দম্পতি।

আমরা ফ্রেশ হয়ে মনটানা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। ভীষণ ভিড়। দেখে মনে হলো, খাবার ভালো হবে। আমাদের গ্রুপে ছিল বিশ বাইশ জন। তার মধ্যে হাঁটার গ্রুপে নয়জন, বাকিদের সঙ্গে ওখানেই পরিচয় হলো। কামরুল নামে আমার একজন ভক্ত গিয়েছিল। যে যেখানে জায়গা পেলাম খেতে বসলাম, সত্যি খুব টেস্টি খাবার। বন মোরগ সবজি ডাল ভর্তা অসাধারণ। রেস্টুরেন্টে ঢোকার মুখেই দেখলাম, কয়লার চুলায় মোটা কাঁচা বাঁশের মধ্যে কিছু একটা রান্না হচ্ছে। জিগ্যেস করতেই বলল, ব্যাম্বো বিরিয়ানি ও চিকেন। বাঁশের মধ্যে সব কিছু দিয়ে কয়লার চুলায় পোড়ানো হয়। গাইড শাকিলকে ডেকে বললাম, আমরা রাতে এইটা খেতে চাই। ও রাজি হলো।

খাওয়ার পরে রেস্টুরেন্টের বাইরে বসে আড্ডা ও সেলফিবাজি করছি। সবাই বাঁশের কাপে চা খেলাম। আড্ডা ও খাওয়া শেষ হতেই বের হলাম কংলাক পাহাড়ে ওঠার অভিযানে।

তখনও বেশ আলো ছিল, বিকাল তিনটে বা একটু বেশি। কিছু দূর চান্দের গাড়িতে গিয়ে হাঁটতে হবে। আমরা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠছি। অনেক লোক হাঁটছে, কেউ ফিরে আসছে, সবার হাতে বাঁশ সাপোর্ট হিসেবে। কিছু দূর গিয়ে রেস্ট নিতে হচ্ছে, বেশ কষ্ট, একেবারে ৩০০ তলা উঠতে হবে। আমি হাল ছেড়ে দেওয়ার মানুষ নই। এরমধ্যে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো, আবার থেমেও গেল। এভাবেই অসাধ্য সাধন করে একেবারে চূড়ায় পৌঁছলাম।

উঠে দেখি, ওখানেও দোকানপাট। চা বিস্কুট ডাব ফল সবই আছে। ওপর থেকে আরো সুন্দর ভিউ। কিছু সৌন্দর্য কাছে গিয়েই দেখতে হয়, বোঝানো যায় না। মেঘ একেবারে হাতের নাগালে। আকাশ যেন খুব কাছে। চারদিকে সবুজ বনান্ত। কোথাও উঁচু কোথাও নিচু। আলো কমে আসছিল। আমরা খানিকটা সময় কাটালাম মুক্ত নির্মল বাতাসে।

নামতে নামতেই আলো আরো কমে গেল, খুব দ্রুত পা চালিয়ে এগোচ্ছিলাম। এরমধ্যে ঝুম বৃষ্টি। আশপাশে কোনো শেলটার নেই। অনেকটাই ভিজে গেলাম সবাই। কর্দমাক্ত রাস্তা বেশ পিচ্ছিল। খুব রিস্কি ছিল হাঁটা, কিন্তু উপায় নেই। কিছু দূর যেতে একটা রিসোর্টের মতো চোখে পড়ল, দৌড়ে সেখানে আশ্রয় নিলাম। আমি ও পারু আপা আধভেজা। রিসোর্টে কাউকে দেখতে পেলাম না, অনেকটা ভুতুড়ে বাড়ির মতো। আমরা দোতলায় উঠলাম। দোতলার বারান্দায় প্রকৃতির খেলা দেখছি। যখন প্রকৃতি দেখি, তখন কথা বলতে ভালো লাগে না। শুধু চুপ করে বসে থাকি। টিনের চালে প্রচ- শব্দে ঝুম বৃষ্টি। কতকাল পড়ে এমন একটা সন্ধ্যাÑ অনুভব করছিলাম। আমার যেন মনে হচ্ছে, নাইবা থামুক এ বৃষ্টি। এখানে এমনি করে বসে থাকি আজ রাত, ক্ষতি কী? এ অনন্ত সৌন্দর্যের কাছে নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল।

 

বৃষ্টি কমে আসতেই কাঠের দোতলা সিঁড়ি দিয়ে কর্দমাক্ত পথ ধরে হাঁটছি। খুব রিস্কি ছিল, ভাবছিলামÑ পড়ে গেলে যাচ্ছেতাই কা- হবে। যাহোক, আধভেজা হয়ে যখন গাড়িতে পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের অন্ধকার ছুঁঁই ছুঁই। খুব কাছেই আমরা রিসোর্টে চলে এলাম। পিচ্ছিল রাস্তা পেরিয়ে অনেকটা নিচে আমার সেই স্বপ্নের কটেজ, রাতে একা থাকব ভাবতেই ভালো লাগছিল। কটেজে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গড়িয়ে নিলাম। গলা ছেড়ে গাইলামÑ আমি আজ আকাশের মতো একেলা। হঠাৎ মনে হলো, আচ্ছা এমন জঙ্গলের ভেতর পাহাড়ের ওপরে সাপটাপ নাই তো! রাতের বেলা কাঠের মেঝ, বাঁশের দেয়াল, অন্ধকার ঘরÑ ভাবতেই ভয় ভয় করতে লাগল। আমি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে নীরু আপাদের রুমে গেলাম। ওরা এক রুমে পাঁচজন, বেশ মজা করছে। নাচ গান গল্পে মেতে আছে।

আসলে নীরু আপা যেখানে যায় বেশ মাতিয়ে রাখে। অদ্ভুত একটা কারিশমা আছে, যা সবার থাকে না। জম্পেশ আড্ডা দিচ্ছিলাম। টিনের চালে তখন টিপটিপ বৃষ্টি। এরই মধ্যে রাতের খাবারের ডাক পড়ল। পাশেই মনটানা রেস্টুরেন্টে ব্যাম্বো চিকেন বিরিয়ানি ও বারবি কিউ খাওয়ার আইটেম। বাঁশের মধ্যে কয়লার চুলায় রান্না হচ্ছে। সত্যি খুব ভালো খেতে। স্পেশাল আইটেম ওদের ওখানকার। কেউ সাজেক গেলে খেতে ভুলবেন না। আমাদের খাওয়া শেষ হতেই মুষলধারে বৃষ্টি। এমন প্রলয়ঙ্কারী বৃষ্টি অনেক দিন দেখি না। সব যেন ধুয়ে মুছে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হলো, বুলবুলের দাপট এদিকে আসছে এবার। আমাদের বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। জলের ধারা রেস্টুরেন্টের ভেতরে ঢুকে পড়ছে। অনেকক্ষণ পর একটু বৃষ্টি কমলে দৌড়ে গাড়িতে উঠে কোনোরকম কটেজে ফিরি।

সে এক দারুণ ঝড় জলের রাত। আমার কেন যেন বেশ ভালো লাগছিল। একটু পরেই একা হয়ে যাব এবং ওমন একটা কটেজে রাত কাটাব ভাবতেই আনন্দ হচ্ছিল। বন্ধুরা বলল, তুই একলা থাকবি? ভয় করবে না? বললাম কিসের ভয়? তোমরা নিশ্চিত মনে ঘুমাও, আমার এটাই ভালো লাগা। মুখে যাই বলি, ঘরে ঢুকে একটু ভয় ভয় করতে লাগল। ঘুমের ওষুধ খেলাম। দরজা-জানালা ভালো করে আটকালাম। কিন্তু অদেখা অজানা ভয় পেয়ে বসল। চারদিকে অন্ধকার, পাশের হেনা আপাদের কটেজও দেখা যাচ্ছে না। টিনের চালে তখনও বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ। মনোনিবেশ তখন সেই দিকে। ক্রমশ আমি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছি সেই শব্দের সঙ্গে।

কী অদ্ভুত, কত দিনের ইচ্ছা পূরণ হলোÑ পাহাড়ের ওপরে বাঁশের তৈরি টিনের চালের ঘরে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাবার। প্রচ- শীত করছিল। লেপ গায়ে দিয়ে গাইছিÑ মনো মোর মেঘের সঙ্গী। আমি লীন হচ্ছি ধীরে ধীরে বৃষ্টির সঙ্গে। অপূর্ব অসাধারণ সে অনুভূতি। কখন ঘুমিয়েছিলাম ঠিক জানি না। সকালে ঘুম ভাঙতেই মনে হলো, ইশ! আজ চলে যেতে হবে। আর একটা দিন থাকতে পারলে বেশ হতো।

 

"