বইমেলা ও লিটলম্যাগ

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০

জোবায়ের মিলন

বাংলায় লিটলম্যাগ আন্দোলনের কালক্রম মোটেই ছোট নয়। দীর্ঘ এবং বলিষ্ঠ আন্দোলনের পথ ধরে এ জনপদে লিটলম্যাগ নিজের অবস্থান স্থির করেছে পোক্তভাবে। বাংলাদেশ অঞ্চলে ‘মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ও সুচরিত চৌধুরী প্রথম লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করেন ‘সীমান্ত’ (১৯৪৭-৫২)। তারপর ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’, আবদুল আলীম চৌধুরী ও আহমদ কবির সম্পাদিত ‘যান্ত্রিক’, সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’সহ তুখোড় কিছু লিটলম্যাগ আত্মপ্রকাশ করে মধ্যবিত্ত, নব্যনাগরিক জীবনের ও বুর্জোয়া মানবতাবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটান লেখাগুলোতে। ষাটের দশকে লিটলম্যাগ আরো জোরালো হয়। আন্দোলন আরো তুঙ্গে ওঠেÑ ‘সেড জেনারেশন’, ‘স্বাক্ষর’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘ছোটগল্প’, ‘সাম্প্রতিক’, ‘স্পার্ক জেনারেশন’, ‘কিছুধ্বনি’, ‘রৌদ্রের রঙ’, ‘সুন্দরম’ প্রভৃতি আধুনিকতাবাদী লিটলম্যাগ মাথা তুলে দাঁড়ায়। প্রথার সঙ্গে প্রথারিরোধীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তর্কে লিপ্ত হয়। একদিকে বাণিজ্যিক অন্যদিকে অবাণিজ্যিক চিন্তা, দর্শনের যুদ্ধাংদেহী চলা শুরু। প্রথাকে ভেঙে তৈরি হয় নতুন প্রথা। আশির দশক, নব্বইয়ের দশক থেকে লিটলম্যাগ আন্দোলনকে ধারণ করে প্রকাশিত হয়ে চলছে বহু লিটলম্যাগ।

১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম বর্ধমান হাউস (বর্তমানে বাংলা একাডেমি)-এর সামনে চিত্তরঞ্জন সাহা ৩২টি মূলধারার বই মাটিতে চটের ওপর সাজিয়ে বইমেলার গোড়াপত্তন করেন। আজকে সেই বইমেলা ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ নাম নিয়ে বিশ্বেও বইপ্রেমীদের কাছে পরিচিত। এই বইমেলা লম্বা সময় মূলধারা বই বুকে নিয়ে সময় পারি দিলেও লিটলম্যাগ পাশ কেটে হেঁটেছিলÑ অবজ্ঞা না হলেও অনেকটা অবহেলায়। অবহেলা না হলেও বলা যায় লিটলম্যাগ আন্দোলনকারীদের অমনোযোগিতায়, সংঘবদ্ধতার অভাবে। এখন বইমেলা আর লিটলম্যাগ অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত।

বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে বইমেলায় অতীতে লিটলম্যাগ কিছুটা বিক্ষিপ্ত থাকলেও ২০০১ সালের দিকে কবি ও লিটলম্যাগ আন্দোলনকারী ওবায়েদ আকাশ তার ‘শালুক’ ও অন্য দু-একজন বাংলা একাডেমির বহেড়া তলায় লিটলম্যাগ নিয়ে নিঃসঙ্গভাবে বসতে শুরু করেন। এরপরের বছর থেকে নজর আসে আরো আরো চোখ। মেলায় লিটলম্যাগ কেন নয়? এমন প্রশ্ন নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। কথায়, আলোচনায় আসে একুশে গ্রন্থমেলায় লিটলম্যাগ নয় কেন? নিজ উদ্যোগে ধীরে ধীরে মেলায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। লম্বা ও কঠোর আন্দোলনের ফলে ২০০৬ সাল থেকে বইমেলায় বাংলা একাডেমির সংশ্লিষ্টতায় সংযোজিত হয় লিটলম্যাগ কর্নার। সময়ের পরিক্রমায় একুশের গ্রন্থমেলায় বহেড়া তলায় ভরে ওঠে লিটলম্যাগ স্টল; জমে ওঠে লিটলম্যাগের লেখক, পাঠক ও পক্ষপাতিত্বদের কলরবে। ক্রমে বহেড়া তলায় যেমন লিটলম্যাগ স্টল সংখ্যা বাড়তে থাকে, তেমন পাঠকের সংখ্যা ও আন্দোলনকারীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। পাঠকের কাছে বার্তা পৌঁছে যেতে থাকে লিটলম্যাগের। নতুন প্রজন্ম জানতে থাকে লিটলম্যাগের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ উদ্দেশ্য ও উদ্দেশ্য।

আয়তনে বইমেলার পরিসর বিস্তৃতি লাভ করলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রসারিত হয় এবং লিটলম্যাগেরও চাহিদা ও আগ্রহ প্রসারিত হলে লিটলম্যাগের পক্ষ থেকেও দাবি ওঠে পরিসর বাড়ানোর। বাংলা একাডেমি এ বছর (২০২০) বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিনের স্টল বরাদ্দ বাড়িয়ে তাদেরও স্থান দেয় বর্ধিত স্থানের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এ যে কেবল লিটলম্যাগকারীদের আন্দোলন, মেলা পরিসর দীর্ঘ করার কারণ তা নয়; লিটলম্যাগের প্রতি সাধারণ পাঠকের আগ্রহ, চিন্তা-চেতনার মিল, মানুষের পাঠাভ্যাসের বিস্তার ও মূলধারার সঙ্গে একত্রে রাখার ঐকান্তিক চেষ্টার ফল।

মেলায় গিয়ে দেখা গেল, মূলধারার স্টলের চেয়ে লিটলম্যাগ কর্নারে পাঠকের উপস্থিতি কম নয়। একান্ত আগ্রহের কারণে দু-পাঁচ পাঠকের সঙ্গে ক্ষুদ্র আলাপে এও জানা যায়, লিটলম্যাগ তাদের পাঠ ও ক্রয় তালিকায় তোলা আছে যতেœ; তারা লিটলম্যাগ কিনতে ও পাঠ করতে চান ব্যতিক্রমী পাঠের নেশায়, যে পাঠ তারা মূলধারার বইতে পান না। সত্য ও সাহসের উচ্চারণ পাওয়া যায় লিটলম্যাগে।

লিটলম্যাগের উত্থান, আন্দোলন ও ভালোর সঙ্গে বিচ্যুতিও চোখে পড়েছে। মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত দেখা যায় কোনো কোনো লিটলম্যাগ। পাঠে নেই ভিন্নধারার সুর। গতানুগতিক লেখায় পূর্ণ পাতার পর পাতা। অভিনবতা নেই বললেই চলে। নবচেতনার, চিন্তার ধারণা নেই, ভাবনার গভীরে নেই সৃজনশীলতা, নেই স্রোতের উল্টোদিকে সুউচ্চ স্বর। কেবল একটি পত্রিকা করার জন্যই যেন তাদের আগ্রহ। নিজেকে আলাদা করার জন্যই তাদের পরিশ্রম। আত্ম নাম প্রচারের জন্যই যেন তারা রাত-দিন জেগে থাকেন নিরলস। যদিও তারা গুটিকয়েক, তবু ধারণায় তাদের কর্ম প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি, বিভ্রান্ত করবে পাঠকের ভাবনাকে। তারপরও লিটলম্যাগ ও বইমেলা নিয়ে বলা যায়, মেলায় লিটলম্যাগের উপস্থিতি সরব। আশাব্যঞ্জক।

বইমেলায় লিটলম্যাগ আলাদা নয়, মেলার সঙ্গে মিলেমিশে আছে একাকার হয়ে। বাংলা একাডেমি লিটলম্যাগের সঙ্গে বিমাতার মতো মুখ ঢেকে নেই, বাংলা একাডেমির সদিচ্ছা ও ভালোবাসায়ই মেলার সঙ্গে সহোদরের মতো কাঁধে কাঁধ রেখে এক রঙে রঙিন হয়ে আছে লিটলম্যাগ চত্বর।

সময়ে বেশ ভালো করা শালুক, চিহ্ন, দাগ, কবিতাপত্র, লোক, খেয়া, অনুপ্রাণন, মাদুলি, ধমনি, কবি, চারবাক, এবং মানুষ, কালের ধ্বনি, মারমেইড, পাপড়, চিরকুট, বর্ণিল, শব্দকুঠি, লেখমালা, ব্যাটিংজোন, দাঁড়কাক, অমিত্রাক্ষর, জলধি, ম্যাজিক লণ্ঠন, কাশফুল, অনুভূতি, দৃষ্টি, বুনন, ঘাসফুল, ঘাস, গল্প, ক্ষ্যাপা, শীতলক্ষ্যা, হাইফেন, নক্ষত্র ইত্যাদি আশাজাগানিয়া। লিটলম্যাগ আন্দোলন অতীতের মিছিল ধারার মতো তার হাতের কব্জিতে শুনাম বহাল রেখে বর্তমান পেরিয়ে ভবিষ্যতের দিতে উজ্জ্বল হাঁটবে বলেই ধারণা। আজকের মেলায় যেমন লিটলম্যাগ পাঠকের পাঠসূচিতে লিখিত, আগামীতেও সে সূচি দীর্ঘ হবে বলে আওয়াজ পাওয়া যায়। প্রথাবিরোধী ভেলায় চড়ে প্রথা ভেঙে তৈরি হবে নতুন প্রথা, নব-নবচেতনার উজানে সনাতন ভেসে যাবে পিছুটান স্রোতে; উদ্ভব হবে সাহিত্যে নতুন নতুন যুগ; লিটলম্যাগ সে আন্দোলনে সচেষ্ট থাকবে, শামিল থাকবে আশায়Ñ জয় কামনা লিটলম্যাগের।

 

"